আজ : বুধবার, ২৮শে জুন, ২০১৭ ইং | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

অগ্রযাত্রার সারথি প্রয়াত নেতা হিরণ’র শূন্যতায়

সময় : ৬:১২ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ২৩ মার্চ, ২০১৭


আহমেদ জালাল:বরিশাল স্টীমারঘাটের সৌন্দর্য্য দেখে বিমোহিত হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বলেছিলেন, বরিশাল হচ্ছে প্রাচ্যের ভেনিশ। গর্বিত বরিশাল। কিছু মানুষ সূর্যের মতো উদিত হয়, মেধা, মনন আর সৃষ্টির কল্যাণে আলোকিত হয়ে ওঠে জগৎ সংসার। পৃথিবী থেকে চলে গেলেও তাদের কর্ম, সততা, জনপ্রিয়তা ও অধ্যবসায়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকেন/থাকবেন যুগ যুগ ধরে। তেমনি আলোকিত মানুষদের প্রতিনিয়তই আমরা হারিয়ে চলেছি সময়ের পরিক্রমায়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া নিয়তির এক অমোঘ নিয়ম। মৃত্যুজনিত শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবুও চিরাচরিত নিয়ম!!! রহস্যময় জগত সংসার। আওয়ামী লীগে জনপ্রিয়তা নেতাকে হারানোর বেদনা সর্বত্র তাড়া করে ফিরছে বিশেষ করে হিরণভক্তদের মাঝে। গঠণমলূক নেতা হিরণ, তিনি যে নেই কি যে অভাববোধ ভক্ত কর্মী সমর্থকরা যেন কষ্টের এক পাহার বেয়ে চলছে। নিরবে চোখের জ্বলও ফেলেন তারা। দীর্ঘ তথ্যনুসন্ধানে এসব তথ্য। বরিশালের শান্তির দূত খ্যাত অ্যাড. শওকত হোসেন হিরণ। হিরণময় জ্যোতির মনন-প্রজ্ঞা, সৃষ্টি- সোচ্চারে জাতি পেয়েছে নির্দেশনা, তরুণরা দিশা। প্রখর ও প্রজ্ঞাবান এ ব্যক্তির প্রয়াণ হলেও সমাজ,রাজনীতি,জনপ্রতিনিধিত্বে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান অতুলনীয়। এ অবদান বরিশালবাসীর অগ্রযাত্রার সারথি হয়ে থাকবে। হিরণ নেই কিন্তু তাঁর কর্মময় বরিশালবাসীর আলোর দিশোরী। প্রিয়জন হারানো শোকের কান্না। সাবেক জননন্দিত সিটি মেয়র প্রয়াত এমপি শওকত হোসেন হিরণ’র মৃত্যতে শোকে কাতর দল মত নির্বিশেষের মানুষ। এখনও গুমড়ে গুমড়ে কাঁদছে হিরণ ভক্তরা। যদিও মৃত্যু অবধারিত এবং স্বাভাবিক। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু কোন কোন মৃত্যু মানুষকে কাদাঁয়,ভাবায় অনন্তকাল। তবে মৃত্যু নিয়ে কোন ব্যক্তি বিশেষের প্রাধাণ্য থাকে না। আবার এটাও সত্য কোন কোন মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। বরিশাল অঞ্চলের পেক্ষাপটে দৃষ্টান্ত প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাড.শওকত হোসেন হিরণ। অমোঘ নিয়ম। বলা যায় অকাল মৃত্যু। হিরণ’র মৃত্যুতে মানুষ কেঁদেছে অঝোর ধারায়। অথচ তাদের অনেকে হিরণ’র সাথে রক্তের সম্পর্ক নেই। নীতি-আদর্শ সর্বোপরি নেতার জন্য অনুসারী বা শুভাকাঙ্খীদের কান্না বরিশাল প্রেক্ষাপটে সেদিন দেখা গেছে হিরন’র মরদেহ বরিশালে পৌঁছানোর পর। সেই নেতার আদরের কন্যা বধূ সাজতে যাচ্ছে। ঘটা করে আয়োজনে বর আসবে রাজকুমারের বেশে। হয়তোবা থাকবে হাজারো অতিথি। পরিবেশ হয়ে উঠবে আনন্দময়। অথচ পিতা শওকত হোসেন হিরণ সেখানে অনুপস্থিত। হিরন’র শূন্যতা শত আয়োজনেও পূরণ হবার নয় কন্যা রশনীর মনে। কারণ তারতো আদরের পিতা। এমনকি হবু বর আশিক রহমানও শ্বশুরের শূন্যতায় বিমর্ষ থাকবেন। শত চেষ্টায়ও প্রিয় নেতাকে ফেরানো যায়নি। হিরণ’র ইহকাল ত্যাগের আগে সুইডেনে পড়াশুনা’রত বড় মেয়ে রোশনী হোসেন তৃণার বিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ছোট ছেলে সাজিদ হোসেন রাফসান ঢাকার বি এ এফ শাহিন কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। দেশের রাজনীতিকরা বলেছেন, শওকত হোসেন হিরণ ছিলেন বরিশালের উন্নয়নের রূপকার। তাঁর কর্মদক্ষতা আর আন্তরিকতার কারণেই তাকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হয় এবং তিনি নির্বাচিত হন। কিন্তু ফুলটি ফেফাটার আগেই ঝরে গেগল। কারণ সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।।’ শওকত হোসেন হিরণ ছিলেন দেশ ও জাতির একজন সূর্য্য সন্তান। তিনি আমৃত্যু মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। জনগণের বিপদের বন্ধু এবং সুখ ও দুঃখের সাথী ছিলেন সংসদ সদস্য শওকত হোসেন হিরণ। প্রফেট অব নন ভায়োলেন্স মহাত্মা গান্ধী নিহতের পর শোক বার্তায় নোবেল বিজয়ী জর্জ বার্নাড শ’র উক্তি ছিল-To be too good is a dangerous things এমনটা শওকত হোসেন হিরণের বেলায়ও প্রযোজ্য।
তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বরিশালে এসে বলেছিলেন, বরিশালের সন্তান কুসুম কুমারী দাশের কবিতার চরণ ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’ উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণ এই বরিশালকে প্রাচ্যের ভ্যানিস শহরে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন।
২০১৪ সালের ২২ মার্চ শনিবার রাত ১০ টায় হিরণ বরিশাল ক্লাবের সামনে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। এবং অচেতন হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিক তাকে শের-ই- বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করেন। রাত সাড়ে বারোটার দিকে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তার মস্তিষ্কে ‘ডিকমপ্রেসিভ ক্রানেকটমি’ নামে একটি অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৪ মার্চ রাতে হিরণকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ২৫ মার্চ সকালে তার একটি অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপরও অবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় ২৭ মার্চ রাতে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনরায় অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। পরিবারের সদস্যদের সম্মতিক্রমে ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাংসদ হিরণের লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হলে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। ৩২ বছরের টানা রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে ১৯দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে ৯ এপ্রিল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে পরপারে চলে যান বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, সিটি কর্পোরেশনের সাবেক জননন্দিত সফল মেয়র এবং মহানগর আ’লীগের সভাপতি আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরণ। অর্থাৎ বরিশালের একটি উজ্জল লক্ষত্রের ছন্দপতন।
হিরণের মৃত্যুর খবর মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনতা গভীর শোকে বিমূর হয়ে পরেন। স্তব্ধ হয়ে পড়ে নগরীর কর্মচাঞ্চল্য। দলীয় নেতাকর্মী ও শুভান্যুধায়ীরা নগরীর আলেকান্দার হিরণের বাসভবনে জড়ো হতে থাকেন। চোখের জল মনের অজান্তে গড়িয়ে পড়ে বরিশালের নানা শ্রেনী পেশার মানুষের। হিরণ’র শূন্যতা অপুরনীয়। বরিশালের গর্ব এই মহান ব্যক্তির অকাল প্রয়াণে’র বিষয়টি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। কেউ কেউ দলের রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। কেউ বাকরুদ্ধ। আবার কেউ কেউ শত বাধা অতিক্রম করে আপপেট হচ্ছে। কারণ হিরণ ছিলেন বরিশাল আওয়ামী লীগকে শক্ত ভীতে দাড় করানোর কারিগর। তিনি ছিলেন সাংগঠনিক নেতা। বিএনপির দূর্গ খ্যাত বরিশালে আওয়ামী রাজনীতিকে শক্ত ভীতে দাড় করাতো স্বক্ষম হন।
শওকত হোসেন হিরণ ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর পটুয়াখালীর বাউফল এলাকার মৃত আবুল হাশেম মিয়া ও মৃত জয়নব বেগমের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন।১৯৭৩ সালে বরিশাল ল’কলেজ সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন হিরণ। তৎকালীন সময়ে তিনি জাসদ ছাত্রলীগে যোগদান করেন। ১৯৭৯ সালে জাসদ ছাত্রলীগ ছেড়ে বিএনপি’র ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হন। ১৯৮৬ সালে তিনি যুক্ত হন এরশাদের জাতীয় পার্টির সাথে। সর্বশেষ ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগাদন করেন। এরশাদ সরকারের আমলে বরিশাল সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে দুই বার জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে বরিশাল-৫ (সদর) আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েও পরাজিত হন। ২০০৮ সালের বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। তবে ২০১৩ সালের ১৫ জুন বিসিসি’র নির্বাচনে তিনি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের কাছে পরাজিত হন। অবশ্য সেক্ষেত্রে কথা উঠেছিল নিজ দলের একটি অংশ প্রকাশ্যে ও গোপনে আতাতের ষড়যন্ত্রে হিরণকে কৌশলে পরাজিত করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে তিনি বরিশাল সদর আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সাংসদ নির্বাচিত হন। পেশায় ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী শওকত হোসেন হিরণ সাউথ এ্যাপোলো মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল লিমিটেড, বেলস লিমিটেড, বেলস ফার্মা ইউনানি প্রাাইভেট লিমিটেড, অ্যাভান্স এসোসিয়েট প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান, এইচ.পি.এল ও এইচ.পি.এল শিপিং এবং সাউথ বেঙ্গল পরিবহনের সত্ত্বাধিকারী, সাউথ এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স প্রাইভেট লিমিটেড ও বেলভিউ মেডিক্যাল সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালকসহ অন্তত ১১ টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। হিরণের স্ত্রী জীবুন্নেছা আফরোজ একজন সমাজ সেবক। নগরীর রিফুজী কলোনী এলাকার ডেঙ্গু সরদার রোডের তার (নানার বাড়ী )ওহাব খানের বাড়ির ‘হিরন পয়েন্ট’ নামের বাসায় তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। হিরণ’র আসন শূন্য হলে উপ নির্বাচনে সাংসদ নির্বাচিত হন জেবুন্নেছা আফরোজ।
লেখক : আহমেদ জালাল,নির্বাহী ও বার্তা প্রধান, দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশ।

Top