আজ : সোমবার, ২১শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৬ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

অন্ধকার ঘুচল অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের

সময় : ৩:৫৬ অপরাহ্ণ , তারিখ : ০৪ আগস্ট, ২০১৭


bdbarta24.net

যেন গুমোট একটা ঘরে বন্দি হয়ে পড়েছিল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট। বেতন কাঠামো নিয়ে ক্রিকেট বোর্ড আর ক্রিকেটারদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী তো হয়েছিল ক্রিকেটই। গত কয়েকদিনে অবশ্য আস্তে আস্তে গুমোট ভাবটা কেটে যাচ্ছিল। দু’পক্ষের দফায় দফায় আলোচনার মাধ্যমে একটু একটু করে খুলে যাচ্ছিল সংকট সমাধানের একেকটি জানালা। অবশেষে, গতকাল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) ও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এসিএ) সমঝোতার মাধ্যমে ৩৪ দিন পর আলোর মুখ দেখল পাঁচবার বিশ্বকাপজয়ী দেশটির ক্রিকেটাঙ্গন। আলোর মুখ দেখছে এই মাসে নির্ধারিত অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের বাংলাদেশ সফরও। ‘সমঝোতা না হলে বাংলাদেশ সফর নয়’_ এ রকম হুঁশিয়ারি নিয়মিতই দিয়ে আসছিলেন অসি ক্রিকেটাররা। কাঙ্ক্ষিত সেই সমঝোতা হয়ে গেছে, দু’পক্ষই সই করেছে চুক্তিতে। নয় মাস ধরে যে টানাপড়েন চলছিল, গত এক মাসে যা প্রকট আকার ধারণ করেছিল, সেটার সমাপ্তিটা হয়েছে মধুর। আপাতত তাই বাংলাদেশ সফরে আসতে আর কোনো বাধা নেই স্টিভেন স্মিথ-ডেভিড ওয়ার্নারদের। দু’পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে পাঁচ বছরের একটি নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে, যা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন হবে। নতুন এই বেতন কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন নারী ক্রিকেটাররাও। শুধু তাই নয়, লিঙ্গ সমতার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী নারী ক্রিকেটারদের বেতনের জন্য বরাদ্দকৃত ৭৫ লাখ ডলার বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ কোটি ৫২ লাখ ডলারে। উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে ঘরোয়া ক্রিকেটারদের বেতনও। আগামী পাঁচ বছরে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের অনুমিত আয়ের পরিমাণ প্রায় ১৬৭ কোটি ডলার। এই আয়ের ২৭.৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪৬ কোটি ডলার খেলোয়াড়দের দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে বোর্ড। বোর্ডের আয়ের পরিমাণ যদি আরও বাড়ে (১৯৬ কোটি ডলার পর্যন্ত), সেক্ষেত্রে বাড়তি আয়ের ১৯ শতাংশ পাবেন ক্রিকেটাররা। অন্যদিকে তৃণমূল পর্যায়ের ক্রিকেটের উন্নতির জন্য ক্রিকেটাররাও বোর্ডকে দেবেন ২৫ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সফরের আগেই যাতে সব ক্রিকেটারের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি সম্পন্ন হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে দ্রুতই। সিএ ও এসিএ দু’পক্ষেরই দাবি, স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তির ফলে লাভবান হবেন তারা। গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসিএর প্রধান নির্বাহী অ্যালিস্টার নিকোলসন জানান, শুধু লভ্যাংশ বণ্টনই নয়, ক্রিকেট সূচি ও তৃণমূল ক্রিকেটের উন্নয়ন নিয়ে করা তাদের বেশ কিছু দাবির সঙ্গে একমত হয়েছে বোর্ড। এ ব্যাপারটিকে সংগঠনের ‘নৈতিক সফলতা’ হিসেবে দেখছেন তিনি। বললেন, ‘অনিশ্চয়তা দূর করার প্রক্রিয়াটা বেশ কঠিন ছিল। ক্রিকেটাররা তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাবের পুরস্কার পেয়েছে। এ রকম অসাধারণ একতা দেখানোর জন্য আমি সত্যিকার অর্থেই তাদের সম্মান জানাচ্ছি। আলোচনার মাধ্যমে একটা ঐতিহাসিক ফল পেয়েছি আমরা।’

সিএর প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ডও ইতিহাসকেই আশ্রয় করলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যে সমঝোতায় পেঁৗছলাম, সেটা কতটা কার্যকরী, তা বিচার করবে ইতিহাস। কোনো পক্ষেরই সব চাহিদা পূরণ হয়নি। এখানে তাই কোনো এক পক্ষকে বিজয়ী বলার সুযোগ নেই। আমার মনে হয়, আমরা একটা ভালো সমঝোতায় পেঁৗছেছি। এর ফলে ক্রিকেট উপকৃত হবে, উপকৃত হবে ক্রিকেটাররাও আপাতত ক্রিকেটারদের মাঠে ফিরতে আর কোনো বাধা নেই। তবে প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকের যে খসড়া, সেটাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে আগামী কয়েক সপ্তাহজুড়ে আরও কয়েক দফা আলোচনা চলবে দু’পক্ষের মধ্যে।

মূলত, সিএর প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো নিয়েই শুরু হয়েছিল এই দ্বন্দ্বের। বিশ বছর ধরে চলে আসা বেতন কাঠামো অনুযায়ী বোর্ডের আয়ের একটা অংশ দেওয়া হতো কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা ও ঘরোয়া পর্যায়ের ক্রিকেটারদের। কিন্তু সিএর প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোয় জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের লভ্যাংশ বাড়ানো হলেও লভ্যাংশ বণ্টন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল ঘরোয়া ক্রিকেটারদের। বেঁচে যাওয়া অর্থ বোর্ড খরচ করতে চেয়েছিল তৃণমূল ক্রিকেটে। এ নিয়েই বাধে বিপত্তি। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়াটা মেনে নিতে পারেননি জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। তারা ২০ বছর ধরে চলমান বেতন কাঠামো বহাল রাখার দাবি তোলেন। কিন্তু বোর্ড নিজেদের প্রস্তাবে অনড় থাকলে জুন মাসশেষে বোর্ডের সঙ্গে নিজেদের চুক্তি নবায়ন করেননি দেশটির প্রায় ২৩০ জন ক্রিকেটার। এর ফলে কার্যত বেকার হয়ে পড়েন তারা। বোর্ডের কাছ থেকে সংকট সমাধানে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে গত মাসে নির্ধারিত দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে সরে দাঁড়ায় অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দল। হুমকির মুখে পড়ে যায় অসিদের বাংলাদেশ সফর, এমনকি নভেম্বরের নির্ধারিত ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজও। মাঝে একবার এসিএর পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রস্তাব উঠলেও সেটাকে নাকচ করে দিয়েছিল সিএ। তবে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের স্বার্থে আলোচনার টেবিলে বসে দু’পক্ষ। তিন সপ্তাহ যাবৎ দফায় দফায় আলোচনা চললেও অগ্রগতির ব্যাপারে মুখ খোলেনি কেউই। গত সপ্তাহের শেষদিকে সাদারল্যান্ড জানিয়েছিলেন, যদি এই সপ্তাহের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধান না আসে, সেক্ষেত্রে সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া পথ থাকবে না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সালিশি আদালতের প্রয়োজন পড়ল না। আলোচনার মাধ্যমেই নিরসন হলো সাম্প্রতিক অতীতে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সংকটের।

Top