আজ : সোমবার, ২১শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৬ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

আপনারা কারা ঠেকাবার?

সময় : ৩:১০ অপরাহ্ণ , তারিখ : ২৯ জুন, ২০১৭


কোন সুবাতাস নেই। বাংলা চলচ্চিত্রের বাজারে বেশ কিছু দিন ধরেই খরা। মানুষ মনে করতে পারে না কবে কোন ছবিটি বড় হিট হয়েছিল। সাম্প্রতিক বড় হিট বলতে ‘আয়নাবাজি’। সেটা সমান্তরাল শহুরে ছবি, তার দর্শক আলাদা। তাঁরা মূলত মাল্টিপ্লেক্সে যান।
বাণিজ্যিক ছবির মরা বাজারে সিঙ্গেল স্ক্রিন হলগুলোর অবস্থা সেখানে ক্রমেই পড়তি। সারা দেশে সিঙ্গেল স্ক্রিন হল-এর সংখ্যা কমছে আর কমছে। এফডিসিতে উৎপাদিত বাংলা ছবি চালিয়ে সেসব আর জিইয়ে রাখা যাচ্ছে না।
হল মালিকরা বাঁচামরার হিসেব করছেন দু’একটি ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার ছবি চালিয়ে। সেসব ছবি কতটা ভাল, কতটা মন্দ, কতটা আইনী এই বিতর্ক অনন্ত কাল ধরে চালানো সম্ভব। কিন্তু এদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের যারা রাস্তায় নেমে পেশি শক্তি প্রদর্শন করছেন, হল জ্বালিয়ে দিবেন বলে হুমকি দিচ্ছেন, তারা হয়তো ভাবতেই পারছেন না, এই ছবিগুলোই হতে পারে হলমালিকদের জন্য কিছুটা অক্সিজেন।
বস্তাপচা কাহিনী, দুর্বল নির্মাণ, সম্পাদনা সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, অনেক দিন আগেই ‘ভদ্রলোক পাবলিক’হলে যাওয়া ছেড়েছে। ফ্যামিলি নিয়ে কেউ আর যায় না সিনেমা দেখতে। ঘাম-চিটচিট শরীরে সিনেমা দেখবে মানুষ, এমন ভাবনাই এসব হুমকিদাতাদের মনোজগতে।
আসলে গোটা চলচ্চিত্র পাড়াটা পাকা-দাড়ি চুলকোনো আর খিস্তি খেউড় করা আজব শ্রেণিতে ভরে গেছে। শিল্প কাকে বলে, সিনেমা কাকে বলে এই উদ্ভট ভাবনার লোকগুলোই ঠিক করছে। তাই কোন সুস্থতা নেই কোথাও।
এই গাজাখুরি সিনেমা চালিয়ে চালিয়ে হলগুলোর ইমেজটাও হয়ে উঠেছে গাজা সেবনকারীদের হল হিসেবে। সময় এসেছে ভাবনার জগতে পরিবর্তন আনার। যৌথ প্রযোজনার ছবি, বিদেশি ছবি চালিয়ে সেই ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে হবে, হলের পরিবেশ ফেরাতে হবে। তবেই এফডিসির নির্মাতারা কিছুটা হলেও প্রতিযোগিতার সামনে পড়বে, ভাল কিছুর জন্য উদ্যমী হবে।
ঢালিউড বলা হয় ঢাকাই ফিল্ম জগতকে। কিন্তু সিনেমার ছিটেফোটাও নেই এখানে। আছে কেবল নোংরা রাজনীতি। কে কাকে বহিষ্কার করছে, কে কাকে হুমকি দিচ্ছে, এসব ছাড়া কোন গল্প নেই এই পাড়াটার। এটি এখনো পাড়া, সিনেমার জগত নয়। সেই পাড়ায় যে দু’একজন যোগ্য আছেন, প্রচেষ্টা হলো তাদের বেকায়দায় ফেলা, প্রয়োজনে ঝেটিয়ে বিদায় করা।
ঈদের ছুটি না-থাকলে কদাচিৎ লোকে ছবি দেখতে আসে। অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েও শাকিব খানই আছেন একমাত্র হেভিওয়েট তারকা, আর একটা নামও উচ্চারিত হয় না যে একটি ফিল্মের পুরো ইনিংস খেলতে পারে, দর্শক ধরে রাখতে পারে। যারা আজ যৌথ প্রযোজনার ছবির বিরুদ্ধে চিৎকার করছে তাদের ছবি মুক্তির পরে হলের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে।
এই যখন বাস্তবতা তখন চামচিকারা রাজত্ব করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরকারকে ভাবতে হবে কোন অন্যায় দাবির কাছে রাষ্ট্র নত হতে পারে কিনা। তারা নিজেরা পারবে না ভাল কিছু করতে, একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যায তাদের কারণে, আবার তারাই এই জগতে গুণ্ডারাজ কায়েম করে ভাল সব কিছুর পথ আটকে দিবে। প্রযুক্তির প্রসার ও উপযুক্ত ব্যবহার বাংলা সিনেমায় কেউ কি দেখছে?
যেসব প্রিন্টের ছবি এদেশের দর্শকরা দেখে অভ্যস্ত তারা বস-২ বা নবাব দেখে বুঝবে কতটা ঝাঁ-চকচকে হতে পারে সিনেমার ডিজিটাল প্রিন্ট।
বিদেশের বাজারতো অনেক দূরের ব্যাপার, দেশের বাজারেই ‘প্রোডাক্ট’হিসেবে এফডিসি’র সিনেমা এখনো সেই ঘুলিঘুপচির জায়গাতেই পড়ে রয়েছে। অথচ পাশের পশ্চিমবঙ্গের টালিঞ্জের ছবি লাফিয়ে লাফিয়ে কয়েকশো গুণ এগিয়ে গেছে। তফাতটা শুধুই অর্থনৈতিক নয়। অনেক বেশি শিক্ষা আর রুচির। যারা এখন ছবি তৈরী বাদ দিয়ে ছবি আটকাবার আন্দোলন করছে তাদের কাছে প্রিয় শব্দ ‘অপসংস্কৃতি’, কিন্তু নিজেদের সাংস্কৃতিক মান কোথায় সে বিচার করবে কে?
ভাল ছায়াছবির চাহিদা দিন কে দিন বাড়ছে। আমরাই জোগান দিতে বিমুখ। প্রত্যক্ষ ক্ষতি হলো হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পরোক্ষ ক্ষতিও কম নেই। যারা ভাল পরিচালক আছেন, যারা মান সম্মত কিছু করতে চান, তারা আর প্রবেশাধিকার পান না এই যখন তখন হুমকি দাতাদের রাজনীতির কারণে। প্রতিদিন অনেক সম্ভাবনাকে গলা টিপে ধরছে এই তথাকথিত রক্ষকরা।
কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না, স্বাধীনতার ৪৬ বছর ধরে চামচ দিয়ে খাইয়ে খাইয়ে এদের রক্ষা করা হয়েছে, কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের সুরক্ষা হয়নি।
ছোট পুকুর থেকে বড় পুকুরে পৌঁছতে না-পারলে বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সবার ভাল লাগার মতো ছবি তো চাই। সঙ্গে পুরনো সিনেমা হলের স্বাস্থ্য না-ফেরালে শিল্প বাঁচবে কি করে? আসুন এবার নতুন ভাবে ভাবি। আমাদের বাংলা সিনেমা নিয়ে নতুন করে মনযোগী হই। ঘরকুনো নয়, একটু বৈশ্বিক হই।
সময় এসে গেছে বদলে যাবার। সিনেমা কাকে বলে ঠিক করবে কে? মানুষ। যুগে যুগে শিল্প ভাল না মন্দ ঠিক করেছে কে? পাবলিক। যে পাবলিক আয়নাবাজি দেখে আবার ‘বেদের মেয়ে জোসনা’কে নিয়ে নাচে, সেই পাবলিক। জনগোষ্ঠিই শিল্পের সবচেয়ে বড় বিচারক। সিনেমা মানুষের। সিনেমার উৎসব মানুষের, অসাংস্কৃতিক গোষ্ঠির নয়। তাই মানুষ যখন যৌথ দেখতে চায়, হলে ভিড় করে, তখন আপনারা কারা ঠেকাবার?
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন।

Top