আজ : রবিবার, ১৯শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

আমরা কোথায় যাচ্ছি?

সময় : ১:৩৭ অপরাহ্ণ , তারিখ : ০৯ মার্চ, ২০১৭


সম্প্রতি ঘটে গেলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। জাতীয় সংসদে কণ্ঠ ভোটে বিল পাস হয়েছে বৈধ বাল্য বিবাহের। এর আগে বিয়ের বৈধ বয়স ছিল মেয়েদের জন্য ১৮, ছেলেদের জন্য ২১। এখন বিল পাস হয়েছে এই সর্বনিম্ন বয়সের চেয়ে কম বয়সের ছেলে-মেয়েরাও বিয়ে করতে পারবে বিশেষ বিবেচনায়।

একজন সাধারণ শিক্ষিত মানুষ হিসেবে আমার বিবেচনায় আসে না যে কী হতে পারে সেই বিশেষ বিবেচনা? এই বিলটা পাস করার উদ্দেশ্য ঠিক কী হতে পারে এবং কে বা কারা এটা দিয়ে উপকৃত হবে? যদি বলা হয়, ধর্ষণের প্রতিকারের জন্য এই ব্যবস্থা, তাহলে ব্যাপারটা আসলে হয়ে গেলো প্রকারান্তরে ধর্ষণকে উৎসাহিত করা।

একবার কল্পনা করুন, কম বয়সী একটি মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে, যার বয়স হতে পারে এমনকি দশ বার, সরকার আশা করছে, সেই মেয়ের বাবা, মা সেই পশুরুপী ধর্ষকের কাছে যেয়ে অনুনয়, বিনয় করে তাকে সেই মানসিক এবং শারীরিক ভাবে বিধ্বস্ত, অত্যাচারিত, এমনকি ট্রমার মধ্যে থাকা মেয়েটিকে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে।

এই বিয়েকে আইনগত বৈধতা দেবে এই বিল। এটাকে কী বিয়ে বলা যায়? নাকি হাত পা বেঁধে ওই বাচ্চা মেয়েটিকে একটা পশুর খাঁচায় ছেড়ে দেওয়া বলা যায়, যেখানে পশুটা তার উপরে আরও শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন চালাতে পারে আইনের আশ্রয়ে সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়? কিছুদিন আগে বিলের সপক্ষে যারা সাফাই গাইছিলেন, তারা বলছিলেন পিতার পরিচয় শিশুর জন্য জরুরি আর সেজন্যই নাকি এই আইন দরকার।

পিতার প্রয়োজন কেউ অস্বীকার করছে না, কিন্তু ধর্ষক পিতার নয়। আমরা চাই না সমাজে ধর্ষণের মাধ্যমে কোন জীবনের সূচনা হোক। ধর্ষক পিতার তত্ত্বাবধানে বড় হোক কোন শিশু। সমাজে ধর্ষণকে প্রতিহত করতে হলে তাকে উৎসাহিত করার সমস্ত পথ বন্ধ করতে হবে। সবার আগে দরকার আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন।

জানি না, কেন আজও আমাদের দেশে ধর্ষিতাকে মুখ লুকিয়ে রাখতে হয়? কেন ধর্ষিতার পরিবারকে মাথা নিচু করে চলতে হয়? তার বা তাদের কী অপরাধ? আমরা যদি এই বিতর্কিত বিলটি পাস না করে বরং ধর্ষকদের শাস্তির মাত্রা বাড়াতে পারতাম, শাস্তি গুলোকে কার্যকর করতে পারতাম, সেটা কিছুটা হলেও এই সমস্যাটা কমাত। আসলে, এখনো আমরা ধর্ষিতা মেয়েকে অপবিত্র ভাবি, তাকে বিয়ে করতে কোন ছেলে বা পরিবার স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসবে, এমন ছেলে হাতেগোনা।

ধর্ষণের কারণে কোন মেয়ে যদি সন্তান ধারণ করে, সেখানে এবরশন করার পূর্ণ অধিকার থাকা উচিৎ তার এবং সরকারি সাহায্য দিয়ে তাকে সহায়তা করা দরকার। অপরদিকে, একজন ধর্ষক ছেলে শুধু শারীরিক সুবিধার কারণে এই পুরো ব্যাপারটা গোপন রাখতে পারে। যদিও বা প্রকাশ হয়ে যায়, তার পরবর্তী জীবনে বা বিয়ে, সংসার ইত্যাদিতে এটা কোন বাঁধা হয়েই দাঁড়ায় না।

যেই ঝামেলা, ঘৃণা, অপমানের মধ্য দিয়ে মেয়েটি যাচ্ছে, তার কিছুই মেয়েটার প্রাপ্য নয়, বরং প্রাপ্য এই পশুটার। জানি, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন একদিনে আসবে না। যতদিন তা না আসে, একজন ধর্ষিতার যদি এই আশা টুকু থাকে যে আইন বা সরকার তাকে একাই জীবনে চলার মতো করে গড়ে তোলার সুযোগ দেবে, তাহলে তার এবং তার পরিবারের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যায়, তারা সাহস পাবে ধর্ষণের কথা বলতে, এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে। আমাদের সরকার এবং সমাজের দরকার তাদেরকে সেই লড়াই করার সুযোগ করে দেওয়া, তাদের পাশে দাঁড়ানো।

এই আইনের আরেকটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে অনেক দরিদ্র, অশিক্ষিত পরিবার এখন এই আইনের সুযোগ নিয়ে তাদের শিশু কন্যাকে বিয়ে দিয়ে ঘাড় থেকে বোঝা নামাবে। একবার সংসারের যাঁতা কলে পড়ে গেলে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসা, সুস্থ, সুন্দর জীবন পাওয়া বড়ই দুঃসাধ্য। অপরিণত বয়সে মা হতে গিয়ে মেয়েদের শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। মা এবং শিশুর দুজনের মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। শিশু জন্মালেও তার নানা রকম শারীরিক সমস্যা, প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে। মোট কথা, এই শিশু এবং মা জন সম্পদ না হয়ে, জনগণের জন্য, দেশের জন্য, পরিবারের জন্য বিরাট বোঝা হয়ে যায়।

অল্প বয়সে সংসার শুরু করতে গিয়ে, এই মেয়েগুলো আর শিক্ষার আলো দেখতে পাবে না। শিশুর শারীরিক, মানসিক বিকাশে একজন অশিক্ষিত, অপরিণত মা কোন ইতিবাচক ভূমিকাই রাখতে পারবে না। এই সব মায়েরা নিজের পায়ে কোন দিন দাঁড়াতে পারবে না। দেশের অর্ধেক জনশক্তিকে আর আমরা কোনদিনও কোন উন্নয়নমূলক কাজে লাগাতে পারবো না। ঘুরে ফিরে আমরা নারী, শিশুর উন্নয়নে যতটা পথ এগিয়েছি, যে সব বাধা অতিক্রম করেছি আমরা এই বিল পাস করে ঠিক ততটা পথ পিছিয়ে গেলাম। কণ্ঠ ভোট দিয়ে যেসব মাননীয় সংসদ সদস্য এই বিল পাস করেছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন `আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

লেখক : ক্যালিফোর্নিয়া প্রবাসী প্রকৌশলী, লেখক।

Top