আজ : সোমবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

কালের বিবর্তনে প্রতিকূলতার সম্মুখীন সর্ববৃহৎ কাঠের বাজার স্বরূপকাঠী

সময় : ৪:৫২ অপরাহ্ণ , তারিখ : ২১ মে, ২০১৭


আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

এম. ডি. ইউসুফ – পিরোজপুর প্রতিনিধি:পিরোজপুর জেলার সবচেয়ে সফল বানিজ্যিক কেন্দ্র ও ঐতিহ্যের কথা

বলতে গেলে শুরুতেই বলতে হয় স্বরূপকাঠীর কথা। অনেকে হয়তো আবার শুধুমাত্র

কাঠ ব্যবসায়ের জন্যই স্বরূপকাঠীর মত উপজেলাকে চিনে থাকেন। বলা যায়

স্বরূপকাঠীর ঐতিহ্য দেশ পরিচিতি কাঠ ব্যনিজ্য এলাকা হিসাবে। প্রায় ১

কিঃমিঃ বিস্তির্ন এলাকা জুড়ে স্বরূপকাঠীর কাঠ বাজার। এটিই

দক্ষিনাঞ্চল তথা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাঠের বাজার। সর্ববৃহৎ কাঠের

বাজার হওয়া সত্ত্বেও এখানে রয়েছে নানান প্রতিকূলতা। সরকারের

পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কাঠের চরের হাটে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবসায়ীরা সহজ

ও স্বল্প লভ্যাংশে ব্যাংকিং সুবিধা না পাওয়া, ব্যবসায়ী নামে দালাল চক্রের

উৎপাত, নদীপথে জলদস্যুদের আক্রমণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বৃক্ষবিনাশসহ

নানান কারণে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ কাঠ ব্যবসা ঐতিহ্য ক্রমেই বিলীনের

পথে।

আনুমানিক ১৯১৭ সালের প্রথম দিকে পিরোজপুর এলাকার তৎকালীন

বাখারগঞ্জ আওতাধীন বর্তমান স্বরূপকাঠী উপজেলায় সুন্দরবনের সুন্দরী

গাছকে কেন্দ্র করে কাঠ ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। ১৯১৮ সালের শেষদিকে

স্বরূপকাঠীর সন্ধ্যা নদীর তীর ঘেষে কালিবাড়ির শাখা খালে গাছ বেচাকেনার

উদ্দেশ্যে ভাসমান কাঠের হাট গড়ে উঠে। এসময় সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ,

পাহারী সেগুন, পশুর ও শিশু গাছসহ বিভিন্ন ধরণের গাছ ভাওয়ালীরা এ চরের

হাটে নিয়ে আসতো। সে থেকেই দেশব্যাপি স্বরূপকাঠীর এ চরের হাট

থেকে ফার্নিচারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারে জন্য হরেক রকমের গাছ

সরবহরাহ করা হত। এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৭ সালের দিকে সুন্দরবনের সুন্দরী

মরা পচাঁ গাছের পারমিট বন্ধ করে দেওয়ায় কাঠের ব্যবসায় ধস নামতে শুরু হয়

যা এখনো কাঠ ব্যসায়ীরা গুছিয়ে উঠতে পারেনি। পারমিট বন্ধ হয়ে যাওয়া

অনেক কাঠ ব্যবসায়ীরা তাদের পুঁজি গুছিয়ে নিয়ে অন্য পেশায় চলে

গেছেন।

সুন্দরী কাঠ ব্যবসায় সরকারের বাঁধা-নিষেধের পর থেকেই

স্বরূপকাঠীতে গড়ে ওঠে মেহগনি, চম্বল, রেইনট্রিসহ নানা দেশীয় কাঠের

বৃহত্তর কাঠ বাজার। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা

এসে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার কাঠ ক্রয় করে নেন উপজেলার কাঠ

মোকামগুলো থেকে। আর ক্রয়কৃত মালামাল ট্রাক, লঞ্চ, কার্গোসহ

পরিবহনযোগে ব্যবসায়ীরা নিয়ে যান স্ব-স্ব ব্যবসাস্থলে। কিন্তু রাজনৈকি

অস্থিরতায় পরিবহন সংকট, পাইকারী ক্রেতার অভাবে সরবারহকৃত কাঠ নিয়ে

প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়ছে স্বরূপকাঠী কাঠ ব্যবসায়ীরা। সময়মত পরিবহন

সংকটে গাছ বিক্রি বন্ধ থাকায় ঋনের বোজা দিন দিন ভারি হয়ে যাচ্ছে

ব্যবসায়ীদের। এ মূহুর্তে দিশেহারা হয়ে পড়ছে বিশেষ করে ছোট ছোট

নুতন ব্যবসায়ীরা। আমদানি-রপ্তানী না থাকায় কাজের অভাবে মানবেতর

জীবন-যাপন করছে স্বরূপকাঠী কাঠ চরের প্রায় হাজার খানিক শ্রমিক।

অবিরত ধারায় দেশের এ চলমান রাজনৈতিক অবস্থা অব্যাহত থাকলে চরমভাবে

ধ্বস নেমে আসবে স্বরূপকাঠীর একমাত্র বৃহত্তম কাঠ ব্যবসায় এমনটাই

ধারনা করা হচ্ছে। ফলস্বরূপ স্বরূপকাঠীর অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে

আসতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এ ব্যবসার সাথে জড়িত থাকা

সংশ্লিষ্টরা।

নানান প্রতিকুলতা থাকা সত্বেও এ উপজেলায় ছোট-বড় ২৪টি চরে

কাঠের হাট রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- স্বরূপকাঠি পাইলট

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাঠের চরের হাঠ, মুক্তিযোদ্ধা কাঠের চরের হাট,

বরছাকাঠি কাঠের হাট, ডুবির বাজার কাঠের চরের হাট, ভাইজোড়া কাঠের

চরের হাট, হাজিরপুল কাঠের চরের হাট, রাজাবাড়ীর কাঠের চর কালীবাড়ি খালে

কাঠের চরের হাট, রাজাবাড়ি কাঠের চরের হাট, পঞ্চবেকী কাঠের চর। ক্রেতার

অভাবে গাছ নিয়ে আসা গ্রাম্য ব্যবসায়ীরা স্বল্প দামে মাল বিক্রি করে বাড়ী

চলে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীসহ সবার একটাই অভিযোগ, বেচা-বিক্রি

আশানুরুপ হচ্ছে না।

স্বরূপকাঠীর এই কাঠ ব্যবসার বর্তমান হালচাল জানতে চাইলে কাঠ

ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আঃ হাকিম মিয়া বলেন, দেশের চলমান

রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে করতে বর্তমানে খুব কষ্ট

হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসা ছেড়ে জীবিকা অন্বেষনে অন্য কোন

কাজ-কর্মে চলে যেতে হবে। স্বরুপকাঠীতে কাঠ নিতে আসা ঢাকার এক

কাঠ ব্যবসায়ী জানান, বিভিন্ন কারণে এ ব্যবসায় আগের চেয়ে লাভের অংশ

কমে গেছে। এর কারণ নদীমাতৃক এলাকায় ট্রলারযোগে যাতায়াত খরচসহ

দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের আগের চেয়ে বেতন-ভাতা বেড়েছে অনেক

বেশী। এছাড়াও সুন্দবনের সুন্দরী গাছ নিলামে বিক্রি বন্ধ থাকায় দেশীয়

গাছে তেমন একটা লাভ হচ্ছে না। দক্ষিনাঞ্চলের পাথরঘাটা থেকে গাছ নিয়ে

আসা এক ব্যবসায়ি জানান, “ধার-দেনা করে প্রায় লক্ষাধীক টাকার গাছ

নিয়ে মোটা-মুটি দামে বিক্রির আশায় সাথে তিন জন শ্রমিক নিয়ে ১৫

দিন পর্যন্ত ইন্দ্রেরহাটের কাঠ চরে অপেক্ষা করছি। কিন্তু কেনা দামও না

মিলায় এখানে বসে খাচ্ছি আর ঘুমাচ্ছি। স্বরূপকাঠীর কাঠ ব্যবসায়ি

সমিতির সাধারন সম্পাদক মোঃ জিয়াউল হক বলেন, স্বরূপকাঠী উপজেলার বড়

অর্থ উপর্জনকারী মাধ্যম হল দেশব্যাপি পরিচিত এখানকার ঐতিহ্যবাহী কাঠ

ব্যাবসা। অত্র অঞ্চলের প্রায় ৭-৮ হাজার লোক এ ব্যবসার সাথে জড়িত।

স্বরূপকাঠীর চর সমিতির শ্রমিক সভাপতি মোঃ মিন্টু জানায়, গাছ মাপা,

মাল লোড-আনলোড করাসহ এখানে কাজ করে প্রতিনিয়ত একজন শ্রমিক

৪০০-৬০০ টাকা উপার্জন করে। বর্তমানে স্বরূপকাঠী কাঠ ব্যবসার শ্রমে

১২০০-১৩০০ শ্রমিক নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে।

এছাড়াও ১৩শ-১৪শ শ্রমিক এখানকার কাঠ মোকামে শ্রমিকের কাজ

করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এ ব্যবসায় জড়িত হয়ে এ অঞ্চলের

নানান লোক আজ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। মিঠাবন,

ঢাকা, সাভার, উতরাইল, নারায়নগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুর, রাজধানীসহ

দেশের নানা জায়গা থেকে ব্যবসায়িরা এসে এখান থেকে কাঠ ক্রয় করে

সরবারহ করেন দেশের সর্বত্র। দৈনিক পঞ্চাশ হাজার থেকে ষাট হাজার সিফটি

গাছ বিক্রি হয় নিয়মিত। প্রতিনিয়ত পাইকারী এবং খুচরা বিক্রি

মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি-৪কোটি টাকার কাঠ বিক্রি হয় কেবলমাত্র

স্বরূপকাঠির কাঠ মোকামে। বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে

পরিবহন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় ধস নেমে আসছে কাঠ ব্যবসায়।

এদিকে উপজেলার কাঠ ব্যবসার খ্যাতি দেশজুড়ে পরিচিত লাভ করায় এ

ব্যবসায় আকৃষ্ট হয়ে কাঠ ব্যবসার সাথে জড়াচ্ছে শিক্ষিত বেকার যুবকেরা।

তারা বহু চরাই-উতরাই পেরিয়ে চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যাংক, এনজিও

থেকে ঋন নিয়ে এব্যবসায় শুরু করে পরিবার নিয়ে অনেকটা স্বাছন্দে জীবন-

যাপন করছিল। নানান প্রতিকূলতার কারনে কাঠ বাজারে ক্রেতা না থাকায়

মহা শঙ্কায় পড়ছে তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন যুবক ব্যবসায়ী

জানায়, ঋন নিয়ে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছি। দেনার চাপে রাতে

বাসায় থাকতে পারছিনা। ক্রমান্বয়ে ভারি হয়ে উঠছে আমাদের ঋনের বোঝা।

বালিহারীর দিনমজুর মোঃ মিজান জানান, কাজ না থাকায় আমারা সারাদিন

বসে থাকি। রোজ সকালে এসে বিকালে উদাস মনে বাড়ী ফিরে যেতে হয়।

এমতবস্থায় কাজের অভাবে অনাহারে-অর্ধারে কাটছে আমাদের মত

দিনমজুরদের জীবন।

ব্যবসায়িরা সমষ্টিগতভাবে জানায়, ঋন নিয়ে ব্যবসা চালাতে এখন

আমাদের হিমসিম খেতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা , সহজ শর্তে

ঋণ সুবিধা পাওয়া না গেলে হয়তো অচিরেই ধস নামতে পারে ঐতিহ্যবাহী

স্বরূপকাঠীর সর্ববৃহৎ কাঠের বাজারে

আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Top