আজ : মঙ্গলবার, ২৭শে জুন, ২০১৭ ইং | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

কুবিতে চূড়ান্ত পরীক্ষার পূর্বেই প্রশ্নপত্র চুরি!

সময় : ১২:২৯ অপরাহ্ণ , তারিখ : ২৩ মার্চ, ২০১৭


কুবি প্রতিনিধিঃকুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে(কুবি) কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগে

সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার পূর্বেই প্রশ্নপ্রত্র ও উত্তরপত্র চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই

সাথে পরীক্ষা শুরু আগেই ঐ পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষর্থীর কাছ থেকে পূর্ব লিখিত উত্তরপত্র জব্দ করা

হয়েছে। এতে পরীক্ষাটি বাতিল করেছে বিভাগের একাডেমিক কমিটি। প্রশ্নপত্র চুরি এবং

উত্তরপত্র আটকের ঘটনাটি বুধবার রাতে সাংবাদিকদের নজরে আসে। পরে অনুসন্ধানে বেরিয়ে

আসে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। এদিকে প্রশ্নপত্র চুরি ও লিখিত উত্তরপত্র নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে

প্রবেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দায়িত্বের অবহেলা বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

ও শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, ২০ মার্চ সোমবার কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ২০১৫-২০১৬

শিক্ষাবর্ষের ১ম বর্ষ ২য় সেমিস্টারের ‘ফিজিক্স-২’ কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষায় এ ঘটনা ঘটে।

এতে মানউন্নয়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে আসেন ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো:

সিরাজুল ইসলাম। পরীক্ষা শুরুর পূর্বে উত্তরপত্র বিতরণের সময় সিরাজুলের কাছে লিখিত উত্তরপত্র পান

পরীক্ষার কেন্দ্র পরিদর্শক। পরে লিখিত উত্তরপত্রটি জব্দ করে এবং ঐ পরীক্ষার্থীকে আটক করে বিভাগের

সভাপতির কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রায় তিন ঘন্টা জেরার পর প্রশ্নপ্রত্র এবং উত্তরপত্র

চুরির কথা স্বীকার করে লিখিত দেন আটক হওয়া শিক্ষার্থী মো: সিরাজুল ইসলাম, তার

সহযোগী মো: শাখওয়াত হোসেন এবং বিভাগের স্টাফ নির্মল চন্দ্র দাস।

বিষয়টি নিয়ে বিভাগের সভাপতি মো: মাহফুজুর রহমান জানান, সিরাজুল ইসলাম বিভাগের

স্টাফ নির্মল চন্দ্র দাসের মাধ্যমে কাজটি করেছেন। এতে সহযোগীতা করেছেন সিরাজুলের বন্ধু

মো: শাখওয়াত হোসেন। প্রশ্ন মাডারেশনের পরে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে প্রশ্ন নেওয়ার

আগে বা পরে প্রশ্নপত্র চুরি করেন বিভাগের স্টাফ নির্মল চন্দ্র দাস। নির্মল আগের দিন পরীক্ষার

উত্তরপত্র সরবারহ করলে সিরাজুল বাসা থেকে উত্তরপত্র লিখে নিয়ে এসে নির্মলকে দেন এবং পরীক্ষার

কেন্দ্রে নিয়ে আসতে বলেন। পরীক্ষা কেন্দ্রে নির্মল সিরাজুলকে উত্তরপত্র সরবারহ করার সময় বিষয়টি

কেন্দ্র পরিদর্শকের নজরে পরে। এরপর বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভার মাধ্যমে পরীক্ষাটি বাতিল

করা হয়। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শৃঙ্খলা কমিটিকে সুপারিশ করে বিভাগ।

তবে বিভাগের অভিযুক্ত স্টাফ নির্মল চন্দ্র দাসের সাথে কথা বললে তিনি জানান, ২০১৫-২০১৬

শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ড. মো: আব্দুল মালেক বিভাগের সভাপতির কক্ষে

কম্পিউটারে প্রশ্নের কাজ করেন। বিভাগের সভাপতির কক্ষের কম্পিউটার থেকে সিরাজুল ইসলাম ও

শাখওয়াত হোসেন প্রশ্নপত্র চুরি করেছেন। নির্মল যখন বিভাগের কাজে বাইরে আসেন ঠিক

তখন সিরাজুল ও শাখওয়াত অফিসের কম্পিউটার থেকে প্রশ্নপত্র চুরি করে নিয়ে যান এবং

প্রশ্নের ছবি তুলে রাখেন। কম্পিউটার থেকে প্রশ্ন চুরি এবং ছবি তুলে নেয়ার বিষয়টি

নির্মল জানতে পারলে মনস্তাত্বিকভাবে তাকে কজ্বা করে ফেলেন অভিযুক্ত ঐ শিক্ষার্থীরা। তারা

পরীক্ষার উত্তরপত্রও নির্মল চন্দ্রের কক্ষ থেকে চুরি করেন বলে জানান নির্মল। তবে কেন লিখিতভাবে

বিভাগের সভাপতির কাছে প্রশ্নপত্র চুরি করে তাদের সরবারহের করেছেন এই মর্মে স্বীকারোক্তি

দিয়েছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, শাখওয়াত হোসেনের মা বিভিন্ন সময়ে আমাকে ফোন

করেন এবং তার ছেলের দিকে খেয়াল রাখতে বলতেন। আমি যেন প্রশ্নপত্র সিরাজুলকে দেই সেই

জন্য শাখওয়াতের মা আমাকে বিভিন্ন সময়ে বলতেন। আমি কখনো রাজি হইনি।

প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র চুরি করে নেয়ার বিষয়টি যেন নির্মল বিভাগে না বলেন সেই জন্য অভিযুক্ত ঐ

শিক্ষার্থীরা নানাভাবে তাকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। তাই ভয়ে সভাপতির কাছে মিথ্যা

লিখিত দিয়েছেন বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নির্মল। এদিকে এর আগেও ঐ শিক্ষার্থীরা

বিভিন্ন সময়ে বিভাগের কম্পিউটার থেকে প্রশ্ন চুরি করেছেন বলে জানা যায়।

বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী সিরাজুলের সাথে কথা বললে তিনি বিষয়টিকে নানাভাবে

ঘুরিয়ে বলার চেষ্টা করেন। প্রথমে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার সাথে আমি একা না আরো

অনেকেই জড়িত।’ তিনি বলেন, অফিস সহকারী নির্মল চন্দ্র দাস পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে

তাকে প্রশ্নপ্রত্র এবং উত্তরপত্র সরবারহ করেছেন। পরে অবশ্য স্বীকার করেন যে, উত্তরপত্র তিনি অফিস

সহকারীর কক্ষ থেকে চুরি করেছেন। তিনি দুটি উত্তরপত্র চুরি করেছেন একটিতে লিখে

এনেছিলেন এবং ধরা পড়ার পরে আরেকটি তিনি পুড়িয়ে ফেলেছেন। তবে কম্পিউটার থেকে

প্রশ্ন চুরির বিষয়টি সিরাজুলের সহযোগী শাখওয়াত প্রথমে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার

করলেও পরক্ষণেই কথা ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে বলেন নির্মল প্রশ্ন সরবারহ করেছে। উত্তরপত্র চুরির

বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।

প্রশ্নপত্রের মত এত গোপনীয় বিষয়টি কিভাবে চুরি হল এ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। কেউ

বলছেন পরীক্ষা কমিটির সভাপতি এর দ্বায় কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারে না। পরীক্ষা কমিটির

সভাপতি প্রশ্নপত্রের মত এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করলেন না এই

নিয়ে ক্ষোভ কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে।

এ বিষয়ে পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ড. আবদুল মালেক বলেন, ‘পরীক্ষা কমিটির সদস্যরা আমাকে

এক কপি প্রশ্নপত্র প্রিন্ট করে দিয়েছেন আমি সেটা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর থেকে ছাপিয়ে

খামে ভরে সিলগালা করি। কিভাবে এই প্রশ্ন চুরি হল তা আমি জানি না।’ তবে অফিস

সহকারী নির্মল চন্দ্র প্রশ্নপত্র ছাপানোর সময় তার সাথে ছিলেন না বলে জানান তিনি।

তবে বিভাগের সভাপতি মাহফুজুর রহমান জানান, এখানে সংশ্লিষ্টদের যথেষ্ট গাফিলতি রয়েছে।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে হিসেব মত উত্তরপত্র সরবারহ করলে এবং পরীক্ষা শেষে বাকিগুলো

ফেরত নিলে এমনটি হত না। কিন্তু এখানে স্টাফরা বেশি আনেন এবং ফেরত দেওয়ার সময়ে

সঠিকভাবে ফেরত না দেওয়ার কারনে এমনটি হয়েছে। পরীক্ষার উত্তরপত্র তো বিশ্ববিদ্যালয়ের

সর্বোচ্চ একটি দুষ্পাপ্য উপকরণ। পরীক্ষার উত্তরপত্রের প্রতি এমন দায়িত্বহীনতার পরিচয়

কোনভাবেই দেওয়া যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য সচিব ও উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নুরুল করিম চৌধুরী

বলেন, ‘এই বিষয়ে আমাদের কাছে ঐ বিভাগ থেকে লিখিত অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি নিয়ে

আমরা খুব তাড়াতাড়ি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

Top