আজ : রবিবার, ১৯শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

দালালচক্রের প্রতারণায় দেশে ফেরা অনিশ্চিত সৌদি আরবে রোকেয়ার দুর্বিষহ জীবন

সময় : ৬:৫৮ অপরাহ্ণ , তারিখ : ২৮ মার্চ, ২০১৭


সৌদি আরব : আম্মা, তুমি ভাত খাইছো? ‘হু’ খাইছি, তুমি খাইছো? ‘হ’ খাইছি। জাহাঙ্গীর কই গ্যাছে? জাহাঙ্গীর পড়তাছে।…ও..ও। আম্মা তুমি কাইনদো না। আব্বা তোমারে দেশে ফিরায়ে আনবো, চিন্তা কইরো না। ..ঠিক আছে। আম্মা!..হু..। তোমার গলা এতো মোটা ক্যা?…এমনি। কাইনদো না, আব্বা তোমার লাইগ্যা সারাদিন কাইনতাছে।….তুমি কহন আইবা আম্মা…? তোমার আব্বারে কও আমারে দেশে নিতে। হে যহন নিবো…।

উপরের কথাগুলো কোনো নাটক বা সিনেমার সংলাপ নয়। সৌদি আরবে পাচার হওয়া এক হতভাগা মায়ের সঙ্গে ৫ বছর বয়সি এক শিশুকন্যার কথোপকথন। অবুঝ শিশু লাভলী তার মা রোকেয়া বেগমকে এভাবেই সান্ত্বনা দিচ্ছিল। এমন বুঝমান কথাবার্তায় ও প্রান্ত থেকে মায়ের মুখে কথা নেই। হয়তো চিৎকার করে কান্না আসছিল রোকেয়ার। কিন্তু তা না করে শুধু ফুফিয়ে ফুফিয়েই কাঁদলেন। চোখের পানিও হয়তো মুছছিলেন বারবার। অডিও রেকর্ডে কথোপকথন শুনে এমন আন্দাজ যে কেউই করতে পারে সহজে।

সংসারের সুখ আনতে দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর দুই মেয়ে সালেহা (৮), লাভলী (৫) ও ছেলে জাহাঙ্গীরকে (৬) দেশে প্রতিবন্ধী স্বামী মারফত আলীর কাছে রেখে সৌদিতে যান মোছা. রোকেয়া বেগম। এরপর থেকেই সৌদি আরবে দুর্বিষহ দিন কাটছে তার। শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার এই নারীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বিমানের রিটার্ন টিকেট বাবদ ২৫ হাজার টাকা চেয়েছিল দালাল আবু তাহের, মালেক ও জামাল গং। যারা ভাল চাকরির কথা বলে রোকেয়াকে বিমানপথে সৌদি আরবে পাঠিয়েছে। অনেক কষ্টে দালালচক্রের দাবিকৃত টিকেটের টাকা দিয়েছেন রোকেয়ার প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক স্বামী মারফত আলী। দফায় দফায় দিন তারিখ দিয়েছেন রোকেয়াকে ফেরত আনার। কিন্তু তারা সে প্রতিশ্রুতি তো রাখেনইনি। বরং দালালচক্র নানাভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে অসহায় এই মারফত আলীকে।

এর আগে গত ১৪ মার্চ‘বিএমইটির ছাড়পত্র ছাড়াই সৌদিতে যাচ্ছে নারীকর্মী’ শিরোনামে রোকেয়াকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংসারে সুখ আনতে রোকেয়া বেগমের বিদেশ যাত্রার ইতিবৃত্ত তুলে ধরা হয় এ প্রতিবেদনে। দালাল আবু তাহের, মালেক ও জামাল গং-এরা কীভাবে প্রতারণা করে বিএমইটির ছাড়পত্র ছাড়াই বিমানপথে রোকেয়াকে সৌদি আরবে নিয়ে গেছে তা তুলে ধরা হয় এই প্রতিবেদনে। যেখানে দালাল জামালসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এরপর জামাল ও আরেকজন দালাল রোকেয়ার স্বামী মারফত আলীকে ফোনে হুমকি দেয়, কেন সাংবাদিককে জানানো হলো। একইভাবে এই প্রতিবেদককেও অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে জামাল। তাদের কথাবার্তার অডিও রেকর্ড থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

স্ত্রী রোকেয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন মারফত আলী। রাজধানীর খিলক্ষেত থানায় জিডিও করেছেন। দ্বারস্থ হয়েছেন র‌্যাব-পুলিশের। যাকে যেখানে পাচ্ছেন আকুতি জানাচ্ছেন স্ত্রীকে এনে দেওয়ার জন্য। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরাও এতোদিনে মায়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। এখন আর ঠিক মতো ফোনে মাকে পাওয়া যায় না। তাই কান্নাকাটি করছে তারা। ছেলে মেয়েদের কান্নায় বুক ফেটে যায় মারফত আলীর। চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বোবা কান্নায় ধরেছে তাকে। কিন্তু দালালচক্রের মন গলছে না যেন।

মারফত আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সৌদি আরবে যাওয়ার পর থেকেই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে থাকেন রোকেয়া। একথা ফোনে তার স্বামী মারফত আলীকে জানানোর পর থেকেই স্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দালাল তাহের, মালেক ও জামাল গংয়ের দ্বারস্থ হন মারফত। রোকেয়াকে দেশে ফেরত আনতে এক পর্যায়ে বিমানের রিটার্ন টিকেট বাবদ ২৫ হাজার টাকা চান তাহের। এই তাহেরই পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে রোকেয়াকে বিদেশে ভাল চাকরির প্রলোভন দেখিয়েছিল। যার মাধ্যমে স্ত্রীকে বিদেশে পাঠান মারফত আলী। এই মারফত আলীর কথা মতো জামাল নামে (কথিত বস) এক দালালের নম্বরে ২৫ হাজার টাকা বিমানের টিকেট বাবদ বিকাশ করেন প্রতিবন্ধী রোকেয়ার স্বামী। দালাল তাহের ও জামালের সঙ্গে দিনের পর দিন কথা হয়েছে রোকেয়ার স্বামী মারফতের। রোকেয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তাদের নানা প্রতিশ্রুতি ও ২৫ হাজার টাকা চাওয়া ও প্রাপ্তির স্বীকারোক্তির কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে দ্য রিপোর্টের কাছে। সহজ স্বীকারোক্তি রয়েছে কীভাবে ঢাকাস্থ সৌদি দূতাবাসের কথিত এক কর্মকর্তার কথা বলে (মূল বস) দিনের পর দিন অবৈধভাবে সৌদি আরবে নারী ও পুরুষকর্মী পাঠাচ্ছে এই চক্র। বিমানের টিকেট বাবদ ২৫ হাজার টাকা নেওয়ার পর এই চক্র গত ৫ ফেব্রুয়ারি ও পরবর্তীতে ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রোকেয়াকে দেশে ফিরিযে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি তো রাখেইনি বরং নানাভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ অসহায় মারফত আলীর।

এদিকে দিনের পর দিন চেষ্টা করেও স্ত্রী রোকেয়াকে দেশে আনতে না পেরে নিজে যেমন ভেঙে পড়েছেন তেমনি ছোট ছেলে-মেয়েরাও মায়ের জন্য দিন দিন ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। হাজার মাইল দূরে নিদারুণ কষ্টে থাকা রোকেয়া বেগমও যেন দেশে ফেরার অনেকটা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। ইদানিং রোকেয়ার সৌদি আরবের নম্বরে কল ঢোকে না, ঢুকলেও রিসিভ হয় না। অনেক সময় ফোন রিসিভ করে কথা বলে না কেউ। সম্প্রতি স্বামী মারফতের সঙ্গে স্ত্রী রোকেয়ার কথোপকথনের অডিও রেকর্ড হাতে আসে কাছে। মারফতই তাকে কল দিয়েছেন। এই প্রান্ত থেকে স্বামী মারফত স্ত্রীকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন। বলেন, বিমানের টিকেটের টাকা দিয়েছি। ফোন ধরিস। যেকোনো সময় ফোন দিবে ওরা। ও প্রান্ত থেকে ছোট ছোট করে রোকেয়ার উত্তর-৬ মাস ধরে শুধু বলছো নিবা, নিবা (দেশে ফেরত নেবে)। কিছুই তো করতে পারলা না। আর কবে নিবা আমারে? দুই প্রান্ত থেকেই আবেগঘন কথাবার্তা। অডিও রেকর্ডে আচ করা গেল, দু’জনই কাঁদছেন ফুফিয়ে ফুফিয়ে। চোখও মুছেছেন দু’জনই হয়তো।

মারফত শুধু বললেন. ওদের (দালাল) সাথে লাইগ্যা আছি। প্লেন ভাড়াও দিলাম। মন্ত্রণালয়েও গেছি। র‌্যাব-পুলিশ, সাংবাদিকরেও জানাইছি। এহন আমার আর কি করার আছে ‘ক’?

এরপরই মারফত ফোনটা ছোট মেয়ে দেলওয়ারা ওরফে লাভলীকে দেয়। ৫ বছর বয়সি শিশু কন্যা লাভলী। স্কুলে (শিশু শ্রেণি) যাওয়া আসা করে মাত্র। মায়ের আদরে ঘুম থেকে ওঠা কিংবা রাতে ঘুমে যাওয়ার কথা যার। সেই শিশু কন্যাই দূর প্রবাসে থাকা মাকে সান্ত্বনা দেয়, আম্মা তুমি কাইনদো না। আব্বা তোমারে দেশে নিয়া আইবো।’ নিয়তির এমন বাস্তবতায় কোনো মায়ের কান্না না এসে কি পারে? রোকেয়াও হয়তো কেঁদেছেন হাজার মাইল দূর থেকে। তাই তো শিশু লাভলীর প্রশ্ন ‘তোমার গলা এতো মোটা ক্যা?’

মা-মেয়ের এমন কথোপকথনে যে কারোরই চোখে পানি এসে যায়। অসহায় মারফত আলীও হু হু করে কেঁদে উঠলেন এই প্রতিবেদকের সামনে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, স্যার আমি অসহায়, প্রতিবন্ধী। আমার ছোট ছেলে-মেয়েদের কথা ভেবে আমার বউরে দেশে আনার ব্যবস্থা কইর‌্যা দেন।

Top