আজ : সোমবার, ২০শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৬ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

দু’আ করা জরুরি কেন?

সময় : ২:৪১ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ২২ মার্চ, ২০১৭


ইসলাম: আমাদের অনেকেরই ধারণা আল্লাহর কাছে খুব বেশি চাওয়া যাবে না, কম কম চাইতে হবে, যাতে আল্লাহ্ অল্প চাওয়ার সবগুলোই দেয়। ধারণাটি সম্পূর্নই ভুল। বরং, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, দু’আ হলো ইবাদতের মেরুদণ্ড (তিরমিযী)। তিনি বেশী বেশী করে দু’আ করতে বলেছেন। আল্লাহ্ তাকে অধিক ভালবাসেন, যে তাঁর কাছে অধিক দু’আ করে। রাসূলুল্লাহ সা. আরও বলেছেন, তোমাদের জুতার ফিতা ছিড়ে গেলে তার জন্যও দু’আ কর (তিরমিযী)। অর্থাৎ, যত ছোট বিষয়ই হোক না কেন, সব কিছু নিয়েই দু’আ করা যাবে।

আল্লাহ্ কেন দু’আকারীকে ভালবাসেন? কারন, আল্লাহ্ ও বান্দার প্রকৃত সম্পর্ক দু’আর মাধ্যমেই প্রমানিত হয়। আল্লাহ্ আর-রাহমান, আর-রাহীম, পরম করুনাময়, অসীম দয়ালু, আল্লাহ্ আস-সামি’, আল-ক্বাদির, তিনি শ্রোতা, তিনিই কর্তা, আল্লাহ্ আস-সামাদ, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, তার কোন চাহিদা নেই। অন্যদিকে, আমরা মানুষেরা আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর দাস, আমরা আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী, তিনি না দিলে আমরা অসহায়।

দু’আর মাধ্যমে একজন বান্দা আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর প্রতি তার বিশ্বাসই প্রমাণ করে। যখন কোন বান্দা আল্লাহর কাছে দু’আ করতে হাত তুলে, তখন আল্লাহ্ তা খালি হাতে ফেরত দিতে লজ্জাবোধ করেন (আবু দাউদ), ঠিক যেভাবে কোন ভিক্ষুক হাত পাতলে আমরা তাকে খালি হাতে ফেরাতে লজ্জা পাই।

তিরমিযী শরীফের হাদিসে আছে, বান্দার কোন দু’আই ব্যর্থ হয় না। আল্লাহ্ যদি তার দু’আ না-ও কবুল করেন তবুও বান্দা লাভবান হয়, কারণ দু’আ করার জন্য সে সাওয়াব পায়। এই কথা শুনে সাহাবীরা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সা. আমরা এখন থেকে বেশি বেশি দু’আ করব। রাসূলুল্লাহ সা. উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ্ (দিতে পারেন) তার চেয়েও বেশী।

হাদিসে কুদসীতে আছে, “সমগ্র মানবজাতি এবং জ্বীনজাতি, মুসলমান ও কাফিরেরা, যদি একত্রে আল্লাহর কাছে দু’আ করা শুরু করে এবং তাদের যত চাহিদা আছে সব একত্রে চাইতে থাকে, তা-ও তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে সমুদ্রের বুকে এক ফোঁটা পানি তুল্য”। কারণ হল, আমাদের চাওয়ার ক্ষমা সীমিত, কিন্তু আল্লাহর দেওয়ার ক্ষমতা অসীম।

আমরা অনেকেই আরেকটা ভুল করি, যেটা হল আমরা শুধু বিপদে পড়লেই আল্লাহর কাছে দু’আ করি। কিন্তু, এটা ফাসেক, মুনাফিক ও কাফিরের লক্ষন। মানুষের এই আচরণটি যে আল্লাহ্ অপছন্দ করেন, তা তিনি মহাগ্রন্থ কোরআনে বহুবার উল্লেখ করেছেন। মু’মিন বান্দা ভাল-মন্দ সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে দু’আ করেন। আল্লাহ্ ‘আযযাওয়াজাল মহাগ্রন্থ কোরআনে বলেন,

আর মানুষকে যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। তারপর যখন আমি তার দুঃখ-দৈন্য দূর করি সে তার আগের পথ ধরে, তাকে যে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করেছিল তার জন্য যেন সে আমাকে ডাকেইনি। সীমালংঘনকারীদের কার্যকলাপ তাদের কাছে এভাবেই শোভনীয় মনে হয়। সূরা ইউনুস (১০:১২)

কোন সন্দেহ নেই যে শ্রেষ্ঠ দু’আ হলো কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দু’আ সমূহ। আমরা যখন আল্লাহর কাছে চাইব, তখন দুনিয়ার জন্য যেমন চাইব, আখিরাতের জন্য তার চেয়েও বেশী করে চাইব। কারণ, দুনিয়ার জীবন ক্ষনস্থায়ী ও পরীক্ষামূলক, কিন্তু আখিরাতের জীবন অনন্ত, অসীম। রাসূলুল্লাহ (সা) অধিকাংশ সময় এই বলে দু’আ করতেন যেঃ আল্লাহুম্মা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়াক্বিনা ‘আযাবান্নার। অর্থাৎ, হে আল্লাহ্! আমাকে পৃথিবীতে কল্যাণ ও পরকালের কল্যাণ দান কর এবং দোযখের শাস্তি হতে আমাকে বাঁচিয়ে রাখো। (বুখারী ও মুসলিম)

দু’আ কবুল হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো দু’আকারীর মনোযোগ ও সততা। অমনোযোগীর দু’আ আল্লাহর গ্রহণ করেন না (তিরমিযী)। এই মনোযোগ বৃদ্ধির অন্যতম উপায় হলো, অর্থ বুঝে অথবা নিজের ভাষায় দু’আ করা। কারণ, নিজের ভাষায় দু’আ করলে যে একাগ্রতা ও সততা থাকবে, অর্থ না বুঝে দু’আ করলে তা থাকবে না। একবার হাসান আল বসরী রহ. এর কাছে এক ব্যক্তি এসে দু’আ চাইলে তিনি বললেন, তুমি নিজের জন্য নিজেই দু’আ কর। কারণ, তুমি নিজের জন্য যতটা একাগ্রতা ও সততার সাথে দু’আ করবে, অন্য কেউ তা করবে না। তবে, এর মানে এই না যে অন্য কাউকে দু’আ করতে বলা যাবে না। রাসূলুল্লাহ সা. হযরত উমর রা. কে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন, যে কেউ উয়াইজ আল ক্বারনী রা. এর সাথে সাক্ষাৎ পাবে সে যেন উয়াইজ আল ক্বারনী রা.-কে আল্লাহ্র কাছে তার জন্য ক্ষমা চেয়ে দু’আ করতে বলে। (মুসলিম)

বান্দা আল্লাহর সবচাইতে কাছে থাকে সিজদারত অবস্থায়, তাই রাসূলুল্লাহ সা. সিজদারত অবস্থায় বেশী করে দু’আ করতে বলেছেন (মুসলিম)।

আসুন আমরা সবাই নিজের জন্য যেমন দু’আ করি, তেমনি করি অন্যদের জন্য। মুসলিম শরীফের হাদিসে রয়েছে, যখন কোন মুসলমান বান্দা তার ভাইয়ের জন্য তার অগোচরে দু’আ করে, তখন ফিরিশতারা বলে, “তোমার জন্যও অনুরূপ রয়েছে”। আল্লাহ্ আমাদের সকলকে দু’আর গুরুত্ব বোঝার তৌফিক দিন। জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চাওয়া থেকে বড় চাওয়া, সব কিছুর জন্য আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার মুখাপেক্ষী, এই সত্য অনুধাবন করে আমরা যেন সর্বদা সবকিছু তার কাছে চাই। দুনিয়ার মঙ্গল যতটুকু চাই, আখিরাতের মঙ্গল যেন তার চাইতেও বেশী চাই।

Top