আজ : সোমবার, ৩০শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং | ১৮ই বৈশাখ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনে সাইবার সন্ত্রাসের ‘আশঙ্কা’, প্রস্তুতিহীন ইসি

সময় : ২:০৩ অপরাহ্ণ , তারিখ : ০৯ মার্চ, ২০১৭


জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের আশঙ্কা ততই বাড়ছে। বাড়ছে যেকোনো প্রক্রিয়ায় সাইবার আক্রমণ করে পরোক্ষভাবে হলেও নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা। মিথ্যা, বানোয়াট, বিকৃত বা ফটোশপে তৈরি বিভিন্ন ছবির পোস্ট দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে হেনস্তা করাসহ চরিত্রহানির মতো অঘটন ঘটার আশঙ্কাও বাড়ছে।
এমনসব আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সাইবার বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দলের নেতা এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও সাইবার বা ডিজিটাল অ্যাটাক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাবহার করে নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করা বা নির্বাচন প্রভাবিত করা ঠেকানোর জন্য এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ন্যূনতম প্রস্তুতি নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন থেকে প্রস্তুতি না নিলে, সময় চলে গেলে চাইলেও তেমন কিছু করার থাকবে না।
বিশেষজ্ঞরা উদাহরণ দিয়ে বলেন, সাম্প্রতিক রোহিঙ্গাদের নিয়ে অনলাইনভিত্তিক অপপ্রচার, রামুর বৌদ্ধ মন্দিরের ঘটনা, ব্রাক্ষণবাড়িয়া নাসিরনগরের ঘটনা সুস্পষ্ট করে দিয়েছে যে নির্বাচনের সময় ডিজিটাল সন্ত্রাসের আশঙ্কা কতোটা বেশি।
নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা, একইসঙ্গে এর অপব্যবহার এবং অপব্যবহার ঠেকাতে প্রস্তুতির অভাব ও করণীয় বিষয়ে পরিবর্তন ডটকমের কাছে বিস্তারিত ব্যাখা করেন তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার।
তিনি বলেন, মিডিয়ার সংজ্ঞাই এখন বদলে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়াই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী। আগামী নির্বাচনে ২ কোটি ভোটর থাকবে যাদের বয়স ৩৫-এর নিচে। আর সব মিলিয়ে চার কোটি ভোটার থাকবে যাদের হাতে থাকবে স্মার্ট ফোন। সেসব স্মার্ট ফোনে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত থাকবে। এর প্রভাব নির্বাচনে পড়বে না তা মনে করার কোনো কারণ নেই।
মোস্তফা জব্বার বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক ব্যবহারের প্রভাব পড়তে পারে আগামী নির্বাচনে। নিউ মিডিয়ার ভালো দিকের পাল্লা ভারি হলেও খারাপ দিকটাও থাকবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘অ্যাবিউজড’ হতে পারে। এর মাধ্যমে নির্বাচনকেন্দ্রিক অপপ্রচার বাড়বে।
এই আইটি বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘এর প্রতিরোধে আাইনগত কাঠামো খুব দুর্বল। আমাদের বর্তমান আইন ডিজিটাল সিকিউরিটি ল নয়, এটি ডিজিটাল সিগনেচার ল।’
এক্ষেত্রে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মোস্তফা জব্বার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনাররা কাগজকলমে শিখে এসেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা নিউ মিডিয়া শেখেননি।এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।’
তিনি বলেন, ‘সারা দেশে ইসির মনিটরিং করা দরকার হবে নির্বাচনের সময়, কিন্তু সে সক্ষমতা এবং যাচাই-বাছাই ও তদন্তের ক্ষমতা তাদের নেই।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি এটার তো একটা বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেছে। আমেরিকার মতো বড় দেশে নির্বাচনে সাইবার সন্ত্রাস হয়েছে। অনেকেই এ জন্য রাশিয়াকে দায়ী করছে এবং বিশ্বাসও করছে যে রাশিয়া কাজটি করেছে। যদিও রাশিয়া এটা অস্বীকার করে। নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার মতো আমাদের এখানেও সাইবার ক্রাইম হতে পারে।’
‘নির্বাচনে সাইবার অ্যাটাক ঠেকাতে যথাযথ প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আমরা এ নিয়ে আতঙ্কিত ও শঙ্কিত। এর জন্য আগেভাগেই ইলেকশন কমিশনকে প্রস্তুতি নিতে হবে, তা না হলে নির্বাচনের সময় তুলকালাম হয়ে যাবে।’
সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘ইসির এক্সপার্টদের নিয়ে বসা উচিত। ইসি বিশেষজ্ঞদের কাছে মতামত চাইতে পারে, প্রাপ্ত মতামত অনুযায়ী ব্যাবস্থা নেওয়া উচিত।’
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাফর উল্লাহ বলেন, ‘বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমার এ সংক্রান্ত তেমন কোনো ধারণা নেই। তবে এটুকু বুঝি যে, ফেসবুক, টুইটার-এসব নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার ঠেকাতে এখন থেকেই ভাবা দরকার বলে নীতিগতভাবে আমি একমত।’
দলীয় ফোরামে আলোচনা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করবেন বলেও জানান আওয়ামী লীগের এই নেতা।
এ সম্পর্কে অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ তানভীর যোহা বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবেও আগামী নির্বাচনে সাইবার সন্ত্রাস একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের ভেতর থেকে যেমন চেষ্টা করা হবে, তেমনি দেশের বাইরে থেকেও অনলাইনে নির্বাচনী অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক খবর ছড়িয়ে ফায়দা নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
জোহা বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ডিজিটাল সন্ত্রাস এখন সারা বিশ্বেই হচ্ছে। তাই নির্বাচন ঘিরে মানুষ যাতে বিভ্রান্ত না হয় তা মাথায় রেখে এসব বিষয় আমাদের আমলে নেওয়া নেওয়া উচিত।’
এই সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘আগে যেসব জাতীয় নির্বাচন হয়েছে সেগুলোতে অপ্রচার হয়েছে। ভুয়া স্টেটমেন্ট বা বার্তা ও প্রেস রিলিজ প্রচার করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে বিভ্রান্ত করার জন্য অনেক গোষ্ঠীই কাজ করে।’
তিনি বলেন, ‘অফিসিয়ালি দেশে শুধু ফেসবুক ব্যবহারকারীই প্রায় আড়াই কোটি। আর আনঅফিসিয়ালি তা আরও বেশি। ফেসবুকের এই বিশাল ব্যবহারকারীর মধ্যে কেউ যদি একটা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চায় তাহলে তা সহজে ও খুব কম খরচে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে বিভ্রান্ত করতে পারবে।’
জোহা বলেন, ‘নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এই আশংকা আরও বাড়বে। নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হবে এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করার আশঙ্কাও রয়েছে এ ক্ষেত্রে।’
এবিষয়ে ক্রাইম রিচার্স এন্ড এনালাইসিস ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মিনহার মহসিন বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে অপপ্রচার চলবে, এটা স্বাভাবিক। সেটা থেকে বেঁচে থাকার উপায় হলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করা। যদি সাইবার অ্যাটাক ঠেকাতে একটা ডেটিকেডেট টিম থাকে তাহলে ভালো হয়।’
তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে অপপ্রচার হলে সরকার রিপোর্ট করলে ফেসবুক দ্রুত আমলে নেয়।’
তার ধারণা, নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ইতোমধ্যে কিছু কিছু অনলাইনভিত্তিক অপপ্রচার শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচন যত কাছে আসবে তা আরও বেশি হতে থাকবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চেয়ারম্যান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সামনে নির্বাচন রেখে আশঙ্কা তো আছেই। আমাদের দেশে সাইবার সন্ত্রাসটা মূলত হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ঘিরে।’
দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার হচ্ছে উল্লেখ করে কমিশনকে নির্বাচন আচরণবিধিতে এ বিষয়টা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
যদিও নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম কাছে দাবি করেন, ‘নির্বাচনের সময় সাইবার ক্রাইম দেখার দায়িত্ব হলো পুলিশের। আমাদের আইনে যা আছে তার বাইরে আমরা কিছু করতে পারবো না। আইনে যা আছে আমরা সব করবো। আইনে যদি থাকে সাইবার ক্রাইমের বিষয়ে কাউকে ইসির পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া যাবে তাহলে অবশ্যই আমরা সেই নির্দেশনা দেবো। আমাদের টার্গেট হলো সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া। আর সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের যত আইন আছে সব প্রয়োগ করবো।

Top