আজ : বুধবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

পর্দার অন্তরালে কী ঘটছে?

সময় : ৮:৫৭ অপরাহ্ণ , তারিখ : ১৫ আগস্ট, ২০১৭


আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ঘোষণা ও রায়ের পর্যবেক্ষণে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের দেয়া বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ যখন ভিন্নমাত্রায় পৌঁছায় তখন পরিস্থিতি সামলাতে তৎপর হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীনরা। প্রকাশ্যে এবং নেপথ্যে এসব তৎপরতা শুরু করে আওয়ামী লীগ। দৃশ্যমান তৎপরতার বাইরে পর্দার আড়ালেও চলছে জোড় তৎপরতা। পর্দার অন্তরালে চলা তৎপরতা নিয়ে সকলে অন্ধকারে থাকলেও এ নিয়ে কৌতুহল রয়েছে সবার মধ্যে।
আদালতের রায় ঘোষণার পর বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে যখন সংসদ ভেঙে দেয়ার আওয়াজ তোলা হলো তখনই হঠাৎ করে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে নৈশভোজে অংশ নিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। নৈশভোজ হলেও ওই সময় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। আলোচনার পরদিন ১৪ আগস্ট সোমবার বঙ্গভবনে যান ওবায়দুল কাদের। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে রায়ের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। জানা গেছে, গতকাল সকাল ১১টায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান ছিল। তাতে অংশ নিতে গিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি। এর কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে যান ওবায়দুল কাদের। জানা গেছে, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ছাড়াও ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা এবং নেপালের রাষ্ট্রদূত চপ লাল ভূষাল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে একই সময় বঙ্গভবনে ছিলেন। গত ১২ আগস্ট শনিবার প্রধান বিচারপতির বাসায় এবং ১৪ আগস্ট রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনে রায় নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে বলে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানালেও প্রকৃতপক্ষে কি ধরণের আলাপ হয়েছে তা কোনো সূত্র থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অবশ্য গত বছর কলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা কে নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। ভারতীয় কলামিস্ট অমিত বসুর লেখা ওই নিবন্ধে বলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি করতে পারেন। অমিত বসুর ওই নিবন্ধে আরো বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণ করার সুযোগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে। এসকে সিনহাও সেই ইঙ্গিত পেয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, ১ আগস্ট থেকে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার পর দেশের মানুষের সামনে একটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আসলে কি হচ্ছে বা কি হতে যাচ্ছে?
এদিকে, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বৈঠক ন্যায়বিচারকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি দলীয় এমপি’দের দ্বারা নির্বাচিত হলেও নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানটি একটা স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করে এবং তিনি তখন রাষ্ট্রের অভিভাবকে রূপান্তরিত হন, আওয়ামী লীগের নন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বৈঠক হতেই পারে, কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক কিভাবে সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন?
রিজভী বলেন, প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের বৈঠকে আমরাই শুধু উদ্বিগ্ন নই, এ বৈঠক ন্যায়বিচারকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা কি না এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় দেখা দিয়েছে। রিজভী বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় পরিবর্তনের জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অলিম্পিক প্রতিযোগিতার ন্যায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। রায় পরিবর্তনের জন্য আওয়ামী লীগ যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে এটা বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপের সামিল। রিজভী বলেন, রায়ে পরিবর্তন আনতে চাপ দেয়া হচ্ছে বলে জনগণের মনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নির্বাহী বিভাগের নগ্ন হস্তক্ষেপ। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর আওয়ামী লীগের নেতারা যেভাবে বিচারপতিদের হুমকি ধামকি দিচ্ছেন, আবার বৈঠক করছেন, এটাকে দেশবাসী স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে করেন না। তারা বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করতে নিজেদের ঘুম হারাম করে ফেলেছেন। এটি শুভ লক্ষণ নয়।
গত ১ আগস্ট সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ বাংলাদেশের বিদ্যামান জাতীয় সংসদকে ইম-ম্যাচিউরড বলে আখ্যা দেয়াসহ রাষ্ট্র পরিচালনার নানা অসঙ্গতি নিয়ে বক্তব্য দেন। আদালত থেকে এ রায় আসার পর আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থেকে তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি। ৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর আওয়ামী লীগের নেতা ও সিনিয়র মন্ত্রিরা রায়ের বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশধোনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর উদ্ভুত পরিস্থিতিকে চক্রান্ত হিসেবে আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত ১১ আগস্ট বলেন, ‘আবার আমরা দুঃসময়ে পতিত হয়েছি। চক্রান্তের মুখে পড়েছি। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও শেখ হাসিনার অর্জনকে প- করতে ষড়যন্ত্র চলছে।’ মাঝে দুই দিনের ব্যবধানে ওবায়দুল কাদের গতকাল ১৪ আগস্ট বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে কিন্তু শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই’। ‘আকাশের কালো মেঘ বেশিক্ষণ থাকে না’ ‘অচিরেই কালো মেঘ কেটে গিয়ে হাসি দেবে সূর্য’। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন দু’দিনের ব্যবধানে এমন কি ঘটলো যে বিপদ ও মেঘ সবই কেটে গেল।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে পর্যবেক্ষণে থাকা ‘কিছু’ শব্দ বাদ দিতে আলোচনার পথ ও চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নেয়া হয়েছে সরকারে পক্ষ থেকে।
জানা গেছে, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পর্যবেক্ষণের সরকারের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো ‘কিছু’ শব্দ প্রত্যাহার করার বিষয়ে সমঝোতা না হলে দলের পক্ষ থেকে রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হবে। তবে তাতে দলের দাবি পূরণ হবে এমন নিশ্চয়তা পেতে ‘আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে’ আরো আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে সরকারের পক্ষ থেকে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাধানের চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি চাপ তৈরি করতে প্রকাশ্যে সমালোচনাও অব্যাহত রাখবে সরকার। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রসঙ্গত, ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয় গত ১ আগস্ট। এরপর সপ্তাহখানেক পর্যন্ত নীরব ছিল আওয়ামী লীগ। গত ৭ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে কঠোর সমালোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই পর্যবেক্ষণের কঠোর সমালোচনা করেন। এরপরই সরব হতে শুরু করেন প্রভাবশালী মন্ত্রীরা। দলীয় সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর দলের ভেতরে সমালোচনা ভারি হলে এ নিয়ে দলের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া প্রধান বিচারপতির কাছে তুলে ধরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
সূত্র মতে, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ওবায়দুল কাদেরের পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়। একপর্যায়ে গত বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়। প্রধান বিচারপতি শুক্রবার ঢাকার বাইরে থাকায় শনিবার রাতে উভয়ের মধ্যে বৈঠক হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে শনিবার ওবায়দুল কাদের দলের প্রতিক্রিয়া প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করেন। পরদিন তিনি আগের রাতের বৈঠকের বিষয়টি গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে কিংবা কোনো বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে কি না তা খোলাসা করা হচ্ছে না। গতকালও ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বৈঠক আরো হবে।

আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Top