আজ : সোমবার, ২৪শে জুলাই, ২০১৭ ইং | ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে কক্সবাজারের নিম্নাঞ্চল

সময় : ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ০৫ জুলাই, ২০১৭


গত তিনদিন ধরে কক্সবাজারের ভারি বর্ষণ চলছে। অতিবৃষ্টির তোড়ে জেলার মিঠাপানির তিন নদী চকরিয়ার মাতামুহুরি, ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী ও কক্সবাজারের বাঁকখালীতে নেমেছে পাহাড়ি ঢল।

ঢলের তীব্রতায় ভেঙে গেছে ঈদগাঁওর রাবার ড্যাম এলাকার নদীর বাঁধ। এতে প্লাবিত হচ্ছে বৃহত্তর ঈদগাঁওর জালালাবাদ, ঈদগাঁও, চৌফলদন্ডী, পোকখালী ও ইসলামাবাদ এলাকার অর্ধশত গ্রামের রাস্তা-ঘাট, বাসা-বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলের মাঠ।

ভাঙনের কবলে পড়েছে আভ্যন্তরীণ সড়কও। একই অবস্থা বিরাজ করছে কক্সবাজার শহরসহ চকরিয়া, পেকুয়াসহ বেশ কয়েক উপজেলার নিম্নাঞ্চল। ঢলের তীব্রতা বাড়তে থাকায় নামতে পারছে না সমতলের বৃষ্টির পানি। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়ছে জেলার নিম্নাঞ্চলের শতাধিক গ্রামের কয়েক লাখ মানুষ।

মঙ্গলবার সকালে অতি বৃষ্টিপাতে পাহাড়ের মাটি চাপায় মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের মোহরাকাটা গ্রামের জুমপাড়ার মনোয়ার আলম (৩৮) মারা গেছেন। বাড়ি রক্ষা করতে গিয়ে তিনি মাটিচাপা পড়েন।

এদিকে, ঢলের পানিতে ডুবে উম্মে সালমা (৭) নামের এক স্কুলছাত্রী মারা গেছে। সে ইসলামাবাদ পূর্ব ইউছুপেরখীল এলাকার আলী আব্বাসের মেয়ে ও ইউছুপেরখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

আবহাওয়া অধিদফতর কক্সবাজার স্টেশনের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, রোববার সকাল থেকেই ভারি বর্ষণ শুরু হয়েছে। এটি মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অতি ভারি বর্ষণ হিসেবে অব্যাহত ছিল। রোববার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২৩১ মিলিমিটার। এভাবে বর্ষণ আরও দুইদিন অব্যাহত থাকতে পারে।

অনেক স্থানে নদীর বেড়িবাঁধ ভাঙন শুরু হয়েছে। মেরামত সম্ভব হয়ে না উঠায় সহজে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। প্লাবিত হচ্ছে কক্সবাজার শহরের হোটেল-মোটেল জোন, ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দেরপাড়া, খরুলিয়া, দরগাহপাড়া, পোকখালীর মধ্যম পোকখালী, নাইক্ষংদিয়া, চৌফলদন্ডী, নতুনমহাল, ঈদগাঁওর মাইজপাড়া, ভাদিতলা, ভোমরিয়াঘোনা, কানিয়ারছরা, ঈদগাঁও বাজার এলাকা, কালিরছড়া, রামুর উপজেলার ধলিরছরা, রশিদনগর, জোয়ারিয়ানালা, উত্তর মিঠাছড়ি, পূর্ব ও পশ্চিম মেরংলোয়া, চাকমারকুল, কলঘর, লিংকরোড়, চকরিয়ার উপজেলার ভাঙারমুখ, ফাঁসিয়াখালী, মালুমঘাট, ডুলাহাজারা, খুটাখালী, ফুলছড়ি, ইসলামপুর ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা।

ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছৈয়দ আলম ও জালালাবাদ ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান (১) ওসমান সরোয়ার ডিপো জানান, ভারি বর্ষণে ঈদগাঁও নদীতে তীব্র বেগে ঢল নেমেছে। সোমবার ঢলের তোড়ে রাবার ড্যাম এলাকায় নদীর বাঁধ ভেঙে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টিপাত চলমান থাকায় ক্রমে বাড়ছে নদীর পানি। পূর্বে ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত সম্ভব না হওয়ায় অতি সহজে অন্য লোকালয়ে পানি ঢুকছে।

সদরের উপকূলীয় পোকখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিক আহমদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু ও মোরার প্রভাবে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানির ঢুকে বিশাল এলাকা প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে। এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে অতি বর্ষণের পানি। বাড়ন্ত পানি নিম্ন এলাকার বাড়ি ঘরে প্রবেশ করছে।

চৌফলদন্ডী ইউপির সদস্য ফরিদুল আলম জানান, পাউবোর নিয়ন্ত্রণাধীন ২৭নং স্লুইচ গেইটটি বন্ধ করে রাখায় উজান থেকে নেমে আসা পানি বের হতে পারছে না। পাউবোকে একাধিকবার তাগাদা দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় বৃহত্তর ঈদগাঁওর প্রায় অর্ধশত গ্রাম পানিবন্দি।

ইসলামাবাদের চেয়ারম্যান নুর ছিদ্দিক জানান, ভারি বর্ষণে ঢল ও বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল। ইউনিয়নের পূর্ব ইউছুপেরখীলে ঢলের পানিতে পড়ে সালমা নামে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।

মহেশখালী উপজেলা চেয়ারম্যান হোছাইন ইব্রাহিম জানান, মঙ্গলবার সকালে হোয়ানকে পাহাড়ের মাটি চাপায় এক যুবক মারা গেছেন।

চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম জানান, ঢলের পানি ঢুকে তার ইউনিয়নের শতাধিক পরিবারের বসতঘর প্লাবিত হয়েছে।

বরইতলী ইউপি চেয়ারম্যান জালাল আহমদ সিকদার জানান, পানির প্রবাহ বাড়ায় তার ইউনিয়নের গোবিন্দপুর, ডেইঙ্গাকাটা, রসুলাবাদসহ একাধিক গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।

কোনাখালী ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার ও বিএমচর ইউপি চেয়ারম্যান এসএম জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাদের ইউনিয়নে হাজারও পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

চিরিঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিন বলেন, ঢলের কারণে উপজেলার চিংড়িজোনের শত শত চিংড়ি প্রকল্প পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে মাছ ভেসে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে চিংড়ি জোনের হাজারও চাষি।

চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাফর আলম জানান, মাতামুহুরী নদীতে ঢলের তীব্রতা বাড়ায় পৌরসভাসহ উপজেলার নিমাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া-পেকুয়ার প্রায় অর্ধশত গ্রাম ঢল ও বৃষ্টির পানিবন্দি হয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে মানুষ। ঢলের পানি বাড়তে থাকায় পাউবোর ক্ষতিগ্রস্ত শহররক্ষা বাঁধ আবারও তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রানা প্রিয় বড়ুয়া জানান, পাহাড়ি ঢলের পানি ব্রিজে সরাসরি আঘাত হানার কারণে গার্ড ওয়াল ধসে পড়েছে।

উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন জানান, এলজিইডির অর্থায়নে নির্মিত গ্রামীণ সড়কসহ সৈকত সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সংস্কার করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো.সবিবুর রহমান বলেন, ভেঙে যাওয়া ও বিলীন হওয়া বেড়িবাঁধ মেরামতের কিছু কিছু বরাদ্দ মিলেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে মেরামত কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। নিম্নাঞ্চলের পানি নামতে বন্ধ স্লুইচ গেইট খুলে দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

Top