আজ : মঙ্গলবার, ২৭শে জুন, ২০১৭ ইং | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ফিলিস্তিনের ইস্পাত বালিকারা

সময় : ৭:২৭ অপরাহ্ণ , তারিখ : ১১ এপ্রিল, ২০১৭


ফিলিস্তিনের গাজায় বেকারত্বের হার বিশ্বের সর্বোচ্চ – ৪২%। অবাক করার মতো হলো, কর্মক্ষম অথচ কর্মহীন বা বেকার জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৫% নারী আর ৭১% পুরুষ।

কিভাবে এটা সম্ভব হচ্ছে? হচ্ছে এ কারণে যে, গাজার নারীরা ক্রমেই সামাজিক মূল্যবোধ ভেঙ্গে ফেলছে এবং এমনসব কাজ বেছে নিচ্ছে, যা এতোদিন কেবল পুরুষরাই করতো। এভাবেই গাজার অনেক নারীই এখন পরিবারের রুটি যোগানদাতায় পরিণত হয়েছেন।

এখন শুনুন কিভাবে অপ্রচলিত কাজ করে তিন গাজান নারী নিজেদের জীবনবদলে ফেললেন।

গাজার প্রথম নারী বাসচালক

শিশুরা প্রথম প্রথম তাঁকে ডাকতো ”আঙ্কল সালওয়া”। সালওয়া যে আঙ্কল নন, আন্টি, এটা তারা ভাবতেই পারতো না। ভাববে কিভাবে, কোনো আন্টি কি কখনো বাস চালায়?

না, ফিস্তিনে অন্তত চালায় না। কিন্তু সেই প্রথা ভেঙ্গেছেন সালওয়া স্রৌর। তিনি বলেন, প্রথা ভেঙ্গেছি আমি। গাজায় আমিই প্রথম মহিলা, যে বাস চালায়।

সালওয়া তাঁর ১৯৮৯ মডেলের ভক্সওয়াগন মিনিবাসটি নিয়ে বের হন ভোর সাড়ে ৬টায়। তারপর পুরো গাজা শহর ঘুরে ঘুরে শিশুদের তুলে নেন নিজের মিনিবাসে এবং পৌঁছে দেন কিন্ডারগার্টেনে।

বলে রাখা ভালো যে, সালওয়া তাঁর বোন সাজদাকে নিয়ে ২০০৫ সালে এই কিন্ডারগার্টেনটি প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুদের আনা-নেয়ার জন্য তাঁরা প্রথমে একজন পুরুষ ড্রাইভার ঠিক করেন। কিন্তু একের পর এক ড্রাইভার বদলিয়েও অভিভাবকদের অভিযোগ শেষ হয় না। অভিযোগ হলো, ড্রাইভাররা শিশুদের সঙ্গে খুব খিটিমিটি করে আর আনা-নেয়া উভয় ক্ষেত্রেই সময় মেনে চলে না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ড্রাইভারদের ডাকা হয়। তাদের আবার নানা অজুহাত, কই, না আপা, আমি তো বাসেই ছিলাম, কই কবে দেরি হলো, না না বাচ্চাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবো? ছিঃ ছিঃ! কী যে বলেন না! – সব ড্রাইভারের একই অজুহাত। শুনতে শুনতে কান পচে যায়। অপরদিকে স্কুল ছুটির অনেক পরেও সন্তানরা বাড়ি না ফিরলে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা ফোনের পর ফোন করতে থাকেন।

সবকিছু মিলিয়ে মহাবিরক্ত সালওয়া ভাবলেন, দূর! এখন থেকে আমি নিজেই চালাবো বাস।

সেই শুরু। তার পর থেকে আজ পাঁচ বছর ধরে নিজ হাতে মিনিবাস চালিয়ে শিশুদের স্কুলে আনা-নেয়া করছেন সালওয়া।

অবশ্য ”চালাবো” বললেই যে চালানো যায়, তা তো নয়! এব্যাপারে সালওয়ার কিছু প্রস্তুতি ছিল। হাই স্কুলের ছাত্রী থাকাকালে, তার বয়স তখন ১৬, প্রায়ই নানুর গাড়ি ”চুরি” করে গাজা সিটির রাস্তায় চালিয়ে বেড়াতেন। হাই স্কুলের লেখাপড়া শেষে পরীক্ষা দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সও পেয়ে যান।

যাহোক, শিশুদের নিয়ে সালওয়ার বাস স্কুলপ্রাঙ্গণে ঢোকার পরপরই ক্লাশ শুরু হয় এবং নতুন নতুন ইংরেজি শব্দ শিখতে থাকে। বাসে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গেই ওরা সালওয়াকে ”গুড মর্নিং” বলে অভিবাদন জানায় আর পকেট থেকে একটি শেকেল (ফিলিস্তিনি মুদ্রা) বের করে দেয়।

বাসের ভেতরেও চলে ইংরেজি শেখা। যেমন, চার বছর বয়সী একটি শিশুকে ইশারায় বাসের পেছনভাগ দেখিয়ে সালওয়া যেই ইংরেজিতে বললেন, ”জাইন, গো ব্যাক”, অমনি সবাই সমস্বরে চেঁচাল, ”গো ব্যাক, গো ব্যাক”।

শিশু জাইনকে পেছনে বসতে বললেও সালওয়া কিন্তু এগিয়েই চলেছেন। তিনি বলেন, লোকজন কিন্তু একজন নারী ড্রাইভার দেখে বেশ অবাক হয়। পরে যখন আসল ঘটনা জানতে পায় তখন আমাকে খুব উৎসাহ দেয়।

গাজার প্রথম মৎস্যজীবী নারী
”ফিলিস্তিনের অদম্য এক নারী” শিরোনামে ক’দিন আগেই বিবার্তার ”রকমারি” বিভাগে ছাপা হয়েছে গাজার প্রথম মৎস্যজীবী নারী মাদলিন কুল্লাবের কথা। তাই তার বিষয়ে নতুন করে আর লেখা হলো না। গাজার ব্যতিক্রমী পেশার নারীদের তিনিও একজন। তাঁর কাজটি শুধু শ্রমসাধ্যই নয়, জীবনের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, সমুদ্রে তিন থেকে চার মাইল দূরে গেলেই ইসরাইলী নৌসেনারা কোনো কারণ ফিলিস্তিনী জেলেদের গুলী করে হত্যা করে।

প্রথম নারী কামার
গাজা বন্দরের তিন কিলোমিটারের মতো দূরে, ধূলিময় এক রাস্তার পাশে দেখতে পাওয়া যায় গাজার প্রথম নারী কামার আয়েশা ইব্রাহিমকে (৩৭)। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে গনগনে চুলার পাশে বসে হাতুড়ি চালাচ্ছেন এই মধ্যবয়সী নারী। পাশে বসে হাপর চালিয়ে মা-কে সাহায্য করছে তাঁরই কিশোরী কন্যা। এই কঠিন কাজ করে প্রতিদিন রোজগার হয় ১০ থেকে ২০ শেকেলের মতো, তা দিয়েই চলে তাদের নয় জনের সংসার।

এই কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে স্বামী অচল। অতএব আয়েশাকেই স্বামী ও সাত সন্তানের বোঝা মাথায় নিতে হয়।

প্রচণ্ড পরিশ্রমের এই কাজটি করতে গিয়ে নানা রকম শারিরীক জটিলতায় ভুগছেন আয়েশা। কিন্তু কী করা! গাজার অর্ধেক মানুষ জাতিসংঘের ত্রাণ পায়। দুর্ভাগ্য আয়েশার, সে তাও পায় না। কারণ, তারা তো শরণার্থী নয়! সূত্র : আল জাজিরা

Top