আজ : বৃহস্পতিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৯ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

বদরুলের যাবজ্জীবন ও আদালতের পর্যবেক্ষণ

সময় : ৫:০০ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ০৯ মার্চ, ২০১৭


সিলেটের বহুল আলোচিত কলেজছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে হত্যাচেষ্টা মামলার একমাত্র আসামি বদরুল আলমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এসময় বদরুলকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরো ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

গতকাল বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়েছে। এই দিবসেই নারী নির্যাতনের একটি আলোচিত মামলার রায় এলো। গত বছরের ৩ অক্টোবর সিলেট এমসি কলেজে পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার সময় বদরুল আলমের হামলার শিকার হন ওই কলেজের ছাত্রী খাদিজা। গুরুতর আহত অবস্থায় খাদিজাকে প্রথমে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও পরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। র্দীর্ঘ চিকিৎসার পর খাদিজা এখন সুস্থ হলেও সারাজীবন তাকে শরীর ও মনে এই ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে। পরিবারসহ দেশবাসীর দাবি ছিল অভিযুক্ত বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি। সেটি নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আরো ধাপ বাকি আছে। সেগুলো পার হয়ে বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল থাকবে- এটিই দেখতে চায় দেশের মানুষজন।

খাদিজার ওপর এই বর্বরোচিত হামলা গোটা দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে সেখানেও ওঠে এসেছে তাৎপর্যপূর্ণ অনেক বিষয়। গতকাল রায় দেয়ার সময় পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবসেই সবার সংকল্প করা উচিত নারীরাও সমাজের উন্নয়নে অর্ধেক ভূমিকা রাখছেন। তাই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকার, আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীসহ সবার দায়িত্ব। যেভাবেই হোক নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের প্রতি তাদের প্রাপ্য সম্মান দেখাতে হবে।’ এছাড়া আদালত আরো বলেন,‘সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস খাদিজা অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এক জীবন্ত কিংবদন্তী নারী। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত পাষণ্ড প্রেমিকের চাপাতির নৃশংস আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত খাদিজা দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মৃত্যুর কাছে হেরে না যাওয়া সমগ্র বিশ্ব নারী সমাজের প্রতিভূ, বিজয়িনী, প্রতিবাদকারিনী।’ রায়ে আরো বলা হয়, ‘মানবজীবনে প্রেম-ভালোবাসা চিরন্তন। প্রেম-ভালোবাসায় মিলন, বিরহ থাকবেই। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলে এমন পৈশাচিক, নৃশংস ও নির্মম হামলা মোটেই কাম্য এবং আইন সমর্থিত নয়।’

বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভাবতে হবে আরো পারিপার্শ্বিক নানা বিষয়ে। একটি অসহিষ্ণু সমাজ ব্যবস্থার দিকে কি আমরা এগুচ্ছি? কেন একের পর এক ঘটছে এসব বর্বরতা, পৈশাচিকতা। গলদটা কোথায়? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তো তাদের দায়িত্ব পালন করতেই হবে। পাশাপাশি সমাজ বিশ্লেষকদের খুঁজে বের করতে হবে সমাজে কেন বদরুলরা সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে যদি বদরুলদের সংখ্যা বাড়তে থাকে তাহলে আমরা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো? এছাড়া রায় শেষে আদালত থেকে কারাগারে নেয়ার সময় বদরুল ‘রায়ে তার কিছুই হবে না’ বলে যে দম্ভোক্তি করেছে এটাও কিন্তু শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে।

এর আগে গত রোববার দুপুরে মহানগর দায়রা জজ আদালতে খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধা রায়ের জন্য ৮ মার্চ তারিখ নির্ধারণ করেন।

গত ১ মার্চ আদালত পরিবর্তন করে সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত থেকে মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়।

এর আগে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আদালতে সাক্ষ্য দেন হামলার শিকার খাদিজা আক্তার নার্গিস। মামলায় মোট ৩৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৪ জন সাক্ষ্য দেন।

২৬ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্য প্রদানকালে খাদিজা আদালতকে বলেন, আমার শরীরের যে যে স্থানে আসামি আঘাত করেছে, সেসব জায়গায় এখনো দাগ আছে। সে আমাকে সারা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধী করেছে। আমি আসামি বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আমি বিচার চাই।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) প্রায় তিন মাস চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে নিজ বাড়ি সিলেটের আউশায় ফিরেন কলেজছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিস।

গত বছরের ৩ অক্টোবর সিলেট এমসি কলেজে পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার সময় বদরুল আলমের হামলার শিকার হন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা। গুরুতর আহত অবস্থায় খাদিজাকে প্রথমে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও পরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

স্কয়ারে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার অবস্থার উন্নতি হলে গত ২৮ নভেম্বর খাদিজাকে সিআরপিতে ভর্তি করা হয়।

অভিযুক্ত বদরুল আলম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শাবি ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক ছিলেন। ঘটনার পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ও ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বুধবার দুপুরে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলার ৩০ পৃষ্ঠার রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলেন।

এরপর কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসকে হত্যাচেষ্টা মামলায় একমাত্র আসামি বদরুল আলমকে দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারায় দোষী সাবস্ত করে সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। একই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

খাদিজার ওপর হামলার ভয়াবহতা বুঝাতে মামলার ৩৩ নম্বর সাক্ষী স্কয়ার হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক রেজউস সাত্তারের সাক্ষ্যের ব্যাখা দিয়ে আদালত বলেন, আসামি খাদিজার শরীরের ১০টি স্থানে ধারালো অস্ত্র দিযে মারাত্মক জখম করেছেন। এর মধ্যে তার মাথার ডান পাশের খুলির একটি অংশ ভাঙা পান চিকিৎসকরা। পরে তারা একাধিক অপারেশনের মাধ্যমে মাথার খুলির ওই অংশ প্রতিস্থাপন করেছেন।

আদালত রায়ে বলেন, এই ঘৃণিত অপরাধের জন্য দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারায় আসামি বদরুলের সর্বোচ্চ সাজাই প্রাপ্য। তাই তাকে এই আইনে সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলো।

আদালত বলেন, মামলার অপর দুই ধারা ৩২৪ ও ৩০৭ ধারায় যেহেতু সাজার মেয়াদ কম তাই এই ধারাগুলোয় অপরাধ প্রমাণ হওয়ার পরও তাকে আর সাজা দেয়ার প্রয়োজন নেই।

দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেত্রী, মন্ত্রী, বিচারকও নারী। তাঁরা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সফলভাবে দেশের কল্যাণে ভুমিকা রাখছেন। গার্মেন্টেস শিল্পকে নারীরাই এগিয়ে নিচ্ছেন। দেশের অর্থনীতিকে তারা সচল রেখেছেন। তাই নারীদের অবহেলার সুযোগ নেই। নারীর ক্ষমতায়নে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

আলোচিত এই ঘটনার পাঁচ মাস পাঁচদিনের মাথায় মাত্র নয় কার্যদিবসে বিচার কার্যক্রম শেষে আদালত থেকে এই রায় এলো। রায় ঘোষণার সময় আদালতের কাঠগড়ায় খাদিজার ওপর হামলাকারী বদরুল উপস্থিত ছিলেন।

গত বছরের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে গরুর মাংস কাটার চাপাতি দিয়ে খাদিজাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মনিরজ্ঞাতি গ্রামের বাসিন্দা বখাটে বদরুল।

আধাঘণ্টা ব্যাপী রায় ঘোষণাকালে আদালতে উপস্থিত ছিলেন- মামলার একমাত্র আসামি বদরুল আলম। বাদি খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রায় উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবসে খাদিজাকে নৃশংস ও বর্বরোচিতভাবে কোপানোর অভিযোগে আসামি বদরুলের যথোপযুক্ত শাস্তি নারীদের সুরক্ষায় তাৎপর্যপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আদালত বলেন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য থেকে ঘটনার সঙ্গে আসামি বদরুলের সম্পৃক্ততা অবিশ্বাস করার মতো কোনো সাক্ষ্য আমি পাইনি। উপর্যুপরি ১০টি আঘাতের ধরণ এবং আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে চাপাতি কিনে আনার ঘটনা প্রমাণ করে, খাদিজাকে খুন করার পরিকল্পনা আসামির ছিল। কাজেই আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

কলেজছাত্রী খাদিজা বেগমের ওপর যে পৈশাচিক হামলা চালানো হয়েছে তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। একের পর এক এ ধরনের অমানবিক ও পৈশাচিক ঘটনায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এর শেষ কোথায়? তনু, মিতু, আফসানা, রিশার পর এবার খাদিজার ওপর হামলা হলো। অপরাধারীরা এতোটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে তারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছে না। প্রকাশ্য দিবালোকে জনারণ্যে চাপাতির কোপে ক্ষতবিক্ষত করছে তারই পরিচিত জনকে। একি বর্বরতা। এই দুঃসাহস দুর্বৃত্তরা পায় কোত্থেকে? এদের কি রুখে দেওয়ার কেউ নেই? আইন প্রশাসন এগুলো তাহলে কী জন্য? কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না। একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণে এর প্রতিকার হতেই হবে।

এবারের শিকার কলেজছাত্রী খাদিজা। তিনি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক (পাস) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। গত সোমবার পরীক্ষা দিতে সিলেটের এমসি কলেজে গিয়েছিলেন। পরীক্ষা শেষে ফেরার সময় এমসি কলেজের পুকুরপাড়ে খাদিজাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন ছাত্রলীগের নেতা বদরুল আলম (২৬)। বদরুল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি খাদিজাকে উত্ত্যক্ত করছিলেন। ঘটনার এক পর্যায়ে লোকজন এগিয়ে এসে খাদিজাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। এই সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত সে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। বদরুলকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেয়া হয়েছে। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে মানুষজন প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ধিক্কার ওঠে এই চরম নৃশংসতা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে।

বদরুল খাদিজাদের বাড়িয়ে লজিং থাকতো। তখন থেকেই সে খাদিজাকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করতো। এ নিয়ে অনেক ঘটনাও ঘটায় সে। খাদিজার বাবা ও ভাই বিদেশ থাকায় খাদিজা আরো অসহায় হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বদরুল দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বদরুল ছাত্রলীগ নেতা। তার অপরাধকে ছাত্রলীগ ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করলেও চাপাতি দিয়ে প্রকাশ্যে কোপানোর মতো দুঃসাহসিকতার নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে তার সাংগঠনিক পরিচয়ই। এটা অস্বীকার করা যাবে না। এক্ষেত্রে বদরুলের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং খাদিজার পাশে দাঁড়িয়ে ছাত্রলীগ তাদের দায় কিছুটা মোচন করতে পারে। কারণ এ ধরনের বেপরোয়া আচরণ কিন্তু এই প্রথম নয়।

Top