আজ : সোমবার, ২৯শে মে, ২০১৭ ইং | ১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

বিনিয়োগ সমস্যার প্রতিষেধক ভ্যাকসিন

সময় : ৭:৫১ অপরাহ্ণ , তারিখ : ২০ মে, ২০১৭


সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা :সামনে বাজেট। আয় ব্যায়ের বড় আয়োজন নিয়ে আসছেন অর্থমন্ত্রী। নির্বাচনের আগের বাজেট, তাই এ বাজেটে নির্বাচনী আমেজ থাকবে, তাও প্রত্যাশিত। অর্থমন্ত্রীর বাজেটে একটা জনতুষ্টির চেষ্টা থাকে, তাও বোঝা কঠিন নয়। গত আট বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশ সম্পর্কে কমবেশি সবার জানা। সরকারের দাবি প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশ ছাড়িয়েছে। তবে বিশ্ব ব্যাংক বলছে প্রবৃদ্ধি ৬.৮ শতাংশের বেশি হবে না। ৬.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও কম নয়।

কিন্তু প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কোথাও কোথাও স্থবিরতাও লক্ষ্যণীয়। দেশে বিনিয়োগ করার পরিবেশ আছে কি না, বিনিয়োগকারীরা সেই বিষয়েই সংশয়ী। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বেসরকারি বিনিয়োগের অংশ স্থবির হয়ে আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির গতিকে ত্বরান্বিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি একথাগুলো বলেছে, আঞ্চলিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (এসএএনইএম-সানেম)। বিবর্ণ বিনিয়োগচিত্রে রং ফেরাতে জরুরি ভিত্তিতে ভাবনার সময় এসেছে। দেশি বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কথাই বেশি বলছে উদ্যোক্তারা।

সরকার বড় বড় প্রকল্প করছে, বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়েছে। কিন্তু গ্যাসের অবস্থা শোচনীয় হয়েছে এবং জমি এক বড় সংকট হিসেবে রয়েছে অনেকদিন ধরেই। কিন্তু শিল্প না গড়লে কাজের সুযোগ তৈরি হয় না। কোষাগার ভরতে করের টাকা জোটে না। শিল্পের জন্য জমি বড় অন্তরায়, কিন্তু একক সমস্যা নয়। আসলে প্রতিবন্ধক হিসেবে যে ক’টি বড় কারণ রয়েছে তার অন্যতম হল লাল ফিতে। একটা প্রকল্পকে প্রস্তাব থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত নিয়ে যেতে এ দেশে যত কাঠখড় পোড়াতে হয়, সেই হ্যাপা টানতে অনেক সময় রাজি হননা বিনিয়োগকারীরা। বিপুল উৎসাহে একজন প্রবাসী বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এসে শেষ পর্যন্ত প্রায় সর্বস্ব খুইয়ে আবার ফিরে গেছেন এরকম নজির অসংখ্য। এমন নয় যে, সরকার ব্যাপারটা বোঝে না। বোঝে বলেই নানা সময় দ্রুততার সাথে বিনিয়োগ প্রস্তাবনা দ্রুততর করার কথা আনেক সময় বলাও হয়। কিন্তু কোন ভাবেই গুমোট কাটেনা।

বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করছে সরকার। কিন্তু আমাদের বিসিক শিল্পনগরীর অভিজ্ঞতা আছে। শেষ পর্যন্ত সেগুলো গোচারণভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার। কিছু কিছু কাজ দ্রুত এগিয়েও চলেছে। আমরা দেখতে চাই সরকারের দিক থেকে স্বচ্ছতার সাথে সবকিছু মানুষের কাছে উপস্থাপিত হচ্ছে। হবিগঞ্জে এবং চাঁদপুরে স্থানীয়দের যেনতেন করে উচ্ছেদ করে জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ শুভ লক্ষণ নয়। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। এগুলো হলো ব্যবসায়িক পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সমুদ্র ও স্থলবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করা, রপ্তানি বহুমুখিকরণ। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলের দক্ষ ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন।

কি পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব ছাড়পত্রের রাস্তায় হাঁটছে, সে দিকে তাকিয়ে দেখবে কি সরকার? সরকার ক্ষমতায় এসে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহ অর্থনীতির পথে বড় আশার সঞ্চার করেছিল। তার কিছু সুফলও আমরা পেয়েছি। কিন্তু বিনিয়োগের জায়গায় কেন সেই চাঞ্চল্য এলোনা, সেটা এখন খতিয়ে দেখার বিষয়। সেই উদ্দীপনা কাজে লাগিয়ে আমলাতন্ত্র ঝুলে থাকা প্রকল্প নিয়ে দ্রুত ও নির্দিষ্ট রাস্তায় হাঁটতে পারেনি বলেই বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটছেনা।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে দাতাদের সাথে মতবিরোধ বাড়ছে। তারপরও বলতে হবে অর্থনীতি এগিয়েছে ঝড়ো গতিতেই। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এই গতিকে আরো বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। গত প্রায় নয় বছর ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপি’র ২২ শতাংশে আটকে আছে। আর বিনিয়োগ না হওয়ায় এ খাতে নতুন কর্মসংস্থানও কমে আসছে আশঙ্কাজনক হারে। শুধু তাই নয়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহও সন্তোষজনক অবস্থায় নেই।

বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও অনেকাংশে দায়ী। এক ধরনের আস্থাহীনতায় কোনও উদ্যোক্তা সাহস করে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। তাই ঋণের চাহিদা না বাড়ায় ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়েনি। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়লেও সরকারি খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩ শতাংশেরও বেশি। আবার সরকারি বিনিয়োগের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে দাতাদের মাঝে। অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগে গতি আসার কথা। কিন্তু সেটা হয়নি।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াও শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আসছেন না। অর্থনীতির বহুমুখিকরণ সেভাবে হয়নি। রফতানি খাত এখনো পোশাক খাত নির্ভর।

ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারি এবং ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া আর্থিক খাতের দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। নামমাত্র সুদের হার কমিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধি সম্ভব নয়। তাই ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মস্থানের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রতিবছর ২০ লাখ নতুন শ্রমশক্তি শ্রম বাজারে ঢুকছে। এদের মধ্যে ১০ লাখ বেসরকারি খাতে যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বিনিয়োগ না বাড়ায় বেকারত্বের হার বাড়ছে।

যে প্রধামন্ত্রী কঠোর হাতে একের পর এক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন, তিনি কেন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথাগত? প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগই পারে সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিষেধক ভ্যাকসিন দিতে।

লেখক : বার্তা পরিচালক, একাত্তর টিভি।

Top