আজ : বৃহস্পতিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৯ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

বৈষম্যকে শূন্যের কোঠায় আনতে হবে

সময় : ১:৩৫ অপরাহ্ণ , তারিখ : ০৯ মার্চ, ২০১৭


এবি সিদ্দিক:শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর মিলনে তৈরি জাইগোট একটা আশ্রয় খুঁজে। একজন নারীর জরায়ুতে তার আশ্রয় হয়। ফসল বোনার জন্য জমিনকে যেমন উর্বর করে প্রস্তুত রাখা হয়। একটা জরায়ুও তার দেয়ালকে উর্বর করে রাখে ওই নিষিক্ত জাইগোটকে আশ্রয় দিতে।

জরায়ু যদি জাইগোট না পায় তাহলে সযত্নে প্রস্তুত হওয়া দেয়ালটি ভেঙে যায়। এবং ঋতুবর্তী নারীর শরীর থেকে সেটা বর্জ্য হিসেবে বের হয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ার নাম ‘ইউটেরাস ক্রায়িং’ বা জরায়ুর কান্না। একটা প্রাণের উন্মেষ ঘটাতে শারীরিকভাবে পরিপূর্ণ একজন নারী নিজেকে প্রস্তুত রাখে। যদিও সেটা সে প্রকৃতিগত ভাবেই পায়। কিন্তু নারীকে সেটার বিরুদ্ধাচরণও করতে দেখা যায় না খুব একটা। ব্যতিক্রম থাকলেও সেটা খুব কম। সেজন্যই একজন নারী তার পূর্ণতা খুঁজে তার মাতৃত্বে।

একটা প্রাণের উন্মেষ কোথায়, কীভাবে হয়- সেটা আমাদের কমবেশি জানা। একজন নারীর মাতৃত্বের আশ্রয়ে আমাদের অস্তিত্ব ও জীবনের বিস্ময়কর যাত্রার শুরু। এই কথাটি কি আমরা জানি না? অবশ্যই জানি। কিন্তু জানা আর উপলব্ধি করা এক জিনিস নয়। নিষিক্ত জাইগোটে লুকিয়ে থাকা জেনেটিক কোডের তথ্যগুলোকে বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়ে এবং নিজের গর্ভে একজন মানব শিশু তৈরি হওয়ার শারীরিক অত্যাচার যিনি সহ্য করে যান, তিনি একজন নারী। একজন মা। এ মৌলিক সত্যটা মনে-প্রাণে উপলব্ধি করে আমরা কি জাগ্রত বিবেককে একজন নারীকে অবমাননা করতে পারি? অবশ্যই পারি না। তবুও নারীকে তার মৌলিক অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে হয়।

আমাদের তৃতীয়বিশ্বে একটা মেয়ে তার ফ্রকের দৈর্ঘ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেকে বিকশিত করার সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়। বাবার সংসার থেকে শুরু করে স্বামীর সংসার, তার কর্মস্থল, তার চলাচলে একটা বিপরীত স্রোতের সাথে তার কৌশল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। খুব কম সংখ্যক নারীই মুক্ত বাতাসে এসে প্রাণ ভরে বেঁচে থাকার নিশ্বাস নিতে পারে। নারী তার জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ নিয়ে বেঁচে থাকার এই প্রতিবন্ধকতাটা আমাদের সমাজসৃষ্ট।

মানব সমাজ তৈরি নারী আর পুরুষে। সমতার বদলে নারীর জন্য বৈষম্য ও বৈরি পরিস্থিতি তৈরির জন্য পুরুষতান্ত্রিকতা দায়ী। এই বিশ্ব কখনো নারীতান্ত্রিকতায় আক্রান্ত হয়নি। এমনটি হয়ে যদি কখনো হতো। যদি পুরুষের মৌলিক অধিকারগুলো কোণঠাসা হতো নারীতান্ত্রিকতার চক্ষুশাসনে। তাহলে হয়তো আমরাও নারীর এই পরিস্থিতিটাকে শুধু ‘বুঝতে পারা’য় সীমাবদ্ধ রাখতাম না। বরং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মায়াকান্না না করে সত্যি সত্যি সেটা উপলব্ধি করতাম। একজন মানুষকে তার মানবিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত করে তাকে শুধুই অধিকার খর্ব হওয়া নারী হয়ে উঠতে দিতাম না। আমাদের সামাজিক পরিস্থিতিতে নারী এমন এক বৈষম্যের শিকার হয়েছে যে, সে নিজেকে নারী পরিচয় দিতে হীনম্মন্যতায় ভোগে।

জাগো নিউজে নারী দিবস উপলক্ষে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তা ফেরদৌসী রহমান। সাক্ষাৎকারটির শিরোনামে তিনি বলেছেন, ‘নিজেকে নারী নয় মানুষ মনে করি’। ফেসবুকে আমার এক অগ্রজপ্রতিম লেখক (তিনি পুরুষ) স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘নারীরা মানুষ বলেই তাদের ভালোবাসি’। এখানে উল্লেখ করা নারী ও পুরুষ দুজনই তাদের মন্তব্যে ‘নারী’ শব্দটাকে খর্ব করেছেন বলে আমি মনে করি। প্রথমজন নিজেকে নারী না ভেবে মানুষ ভাবতে পছন্দ করেন। দ্বিতীয়জন নারীকে মানুষ ভাবতে ভালোবাসেন।

নারী তার ‘নারী’ শব্দ থেকে বেরিয়ে মানুষের স্বীকৃতি পেতে এতো উদগ্রীব কেন? পুরুষ তো তাদের ‘পুরুষ’ পরিচিতি থেকে মানুষের স্বীকৃতি পেতে এতোটা উদগ্রীব নয়। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক। আমাদের সমাজে নারী শব্দটার মধ্যেই আমরা অবজ্ঞা আর অবহেলার প্রতিরূপ ঢুকিয়ে দিয়েছি। নারী শব্দটা এখন এই নেতিবাচক বিশেষণে আক্রান্ত। এই মনস্তাত্ত্বিক নেতিবাচক বাধার দেয়ালটা ভাঙতে হবে। এই কাজটা শুধু নারীর নয়। ব্যাপারটা শুধু এরকম নয় যে, নারী আন্দোলন করলো, আর পুরুষ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করে দিল। যদি সেটাই হতো, তবে মানব সভ্যতার কয়েক হাজার বছর পেরিয়ে এসেও নতুন করে নারীদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে হতো না।

নারী সমাজ সংসারে তার অধিকার হারিয়েছে বলে সেটা পুনরুদ্ধারে সবার সচেষ্ট হওয়া জরুরি। নারীর এ অধিকার খর্বের ইতিহাস সভ্যতার শুরু থেকেই তৈরি। সভ্যতার সাথে মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই মানবিক হয়ে ওঠা সত্ত্বেও নারীর অধিকারের ক্ষেত্রে এই সভ্য সমাজে অনেক ঘটনা আমাদের রক্তে বয়ে চলা আদিম পাশবিকতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ধরা পড়ে। প্রতিনিয়ত পত্রিকায় নারী ধর্ষিত, লাঞ্ছিত হওয়াসহ বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হওয়ার খবর হরহামেশাই দেখতে পাই। এজন্য সামাজিক সচেতনতা অনেক জরুরি। সেটা শুরু করতে হবে নিজের ভেতর থেকেই। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে।

মানবিকতার পাল্লায় একপাশে পুরুষ ও অন্য পাশে নারিকে রেখে তার মানদণ্ডে সমতা নিশ্চিত করতে হবে। এই বৈষম্যকে শূন্যের কোঠায় আনতে হবে। অন্যথা নারী তার নারীত্ব থেকে বেরিয়ে শুধু মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার এই সংগ্রামে পুরুষ সমাজ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিহীন ‘পুরুষতান্ত্রিকতা’র নেতিবাচক বিশেষণে আখ্যায়িত হতে থাকবে।

এবি সিদ্দিক লেখক সাংবাদিক

Top