আজ : সোমবার, ২১শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৬ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান৭ বছরে সর্বনিম্ন মুনাফা

সময় : ১:১৯ অপরাহ্ণ , তারিখ : ০৭ আগস্ট, ২০১৭


আমানতের সুদহার কমিয়ে দেশের ব্যাংকগুলো মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি। ২০১৫ সালেও ৯৭০ কোটি টাকার নিট মুনাফায় ছিল কার্যক্রমে থাকা ৩৩টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। গত বছর তা নেমে এসেছে ৪৭০ কোটি টাকায়। গত সাত বছরে এটিই এ খাতের সর্বনিম্ন মুনাফা।

আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড কমে যাওয়া, প্রত্যাশা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করতে না পারা এবং শেয়ারবাজারে মন্দাভাবের কারণে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে নিট মুনাফা কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খলিলুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নতুন ঋণ বিতরণে সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানই সচেতন হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে নিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ অনেক কমে গেছে।

তবে যে হারে বিনিয়োগ কমেছে, ঠিক সে হারে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমেনি। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমার পেছনে স্প্রেড কমে যাওয়াটাও ভূমিকা রেখেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে সংগঠিত জালিয়াতি ও কেলেঙ্কারির ঘটনাও মুনাফা কমার পেছনে কাজ করেছে।

তিনি বলেন, আশার বিষয় হলো, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতি হয়নি। সাধারণ জনগণের প্রচুর আমানত আমাদের কাছে আছে ও প্রতিনিয়ত সেটি বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০১৬-এর তথ্যমতে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল আয়ের বড় অংশই আসে ঋণ ও ইজারা থেকে। এছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, কমিশন ও ব্রোকারেজ থেকেও আয় করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০১৫ সালের তুলনায় গত বছর এ খাতে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা কমেছে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

আয়ের সবক’টি উৎস থেকেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর বিনিয়োগ থেকে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, নিট সুদ আয় ২০ দশমিক ১ শতাংশ, অন্যান্য পরিচালন আয় ৩০ দশমিক ২ শতাংশ এবং কমিশন ও ব্রোকারেজ থেকে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ আয় কমেছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর।

আয় কমলেও গত বছর এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় ১৭ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে এ খাতের নিট মুনাফা।
গত সাত বছরের মধ্যে ২০১৬ সালেই সর্বনিম্ন নিট মুনাফা করেছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত। ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্যমতে, ২০০৯ সালে ৪৩৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত।

এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এ খাতের মুনাফা। ২০১০ সালে ৬১০ কোটি, ২০১১ সালে ৭০০ কোটি, ২০১২ সালে ৬১০ কোটি, ২০১৩ সালে ৮০০ কোটি ও ২০১৪ সালে ৯৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফায় ছিল দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত। এর পর ২০১৫ সালে খাতটি ৯৭০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করলেও ২০১৬ সালে তা ৪৭০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

২০১০ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ইকুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। কিন্তু ছয় বছরের ব্যবধানে এ খাতে আরওই ৪ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে ২০১০ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে তা শূন্য দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

যেসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ বেড়েছে, সেগুলোর মুনাফা কমেছে বলে জানান আইডিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরিফ খান। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য হুমকি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের মন্দমানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ খুবই বেশি। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিবিড় তত্ত্বাবধান ও পর্যালোচনা দরকার। কারণ আমানতকারীদের অর্থ থেকেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ বিতরণ করে। সে ঋণ যদি খেলাপি হয়ে যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতকারীদের অর্থ কোত্থেকে দেবে? তবে ঠিক কোন কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয় কমেছে, সেটি আমার জানা নেই। গত বছর আইডিএলসিসহ ভালো অবস্থানে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬ সাল শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ২ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। অথচ এ সময়ে খাতটিতে ১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকার প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়েছে। সে হিসেবে ২০১৬ সাল শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ৫৪০ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। গত বছর শেষে এ খাতের বিতরণকৃত ঋণের ৭ দশমিক ৩ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে। ২০১৬ সাল শেষে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মোট ঋণ ও ইজারার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকা।

দেশের ব্যাংকিং খাতের আমানতের গড় সুদহার কমতে কমতে জুন শেষে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ একই সময়ে ৯ শতাংশের বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। আমানতে বেশি সুদ দেয়ায় ঋণের ক্ষেত্রেও বেশি সুদ আদায় করতে হচ্ছে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বর্তমানে ব্যাংকের স্প্রেড গড়ে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ থাকলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা ২ শতাংশেরও নিচে রয়েছে। ফলে সুদ বাবদ ব্যাংকবহির্ভূত অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানই কোনো আয় করতে পারছে না বলে জানান একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যরত ছিল ৩৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে তিনটি সরকারি ও ২০টি দেশীয় বেসরকারি কোম্পানি। বাকি ১০টি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স নিয়েছে। চলতি বছর আরো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৩টি বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। ২০১৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নয়টিরই আয় কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্রেস ট্রেস্টিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সাল শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র পাঁচটি নিরাপদ অবস্থানে (গ্রিন জোন) রয়েছে। বাকি ২১টি প্রতিষ্ঠান ইয়োলো জোন এবং সাতটি প্রতিষ্ঠান রেড জোনে অবস্থান করছে। রেড জোনে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে দেশের অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি পার করছে বলে স্ট্রেস ট্রেস্টিং প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যয়ের শিকার হওয়া তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক রয়েছে। সূত্র: বণিক বার্তা।

Top