আজ : শনিবার, ১৯শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ভোটের বাজেট তবুও শঙ্কা

সময় : ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ০১ জুন, ২০১৭


পদ্মা সেতুসহ ১০ মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ ও প্রতিশ্রুতি, ভ্যাট নিয়ে ব্যবসায়ীদের উৎকণ্ঠাআওয়ামী লীগ সরকারের চলতি মেয়াদের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হচ্ছে আজ। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বেলা দেড়টায় জাতীয় সংসদে এ বাজেট পেশ করবেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি হবে তার এগারোতম বাজেট।

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চার লাখ কোটির অধিক টাকার এ বাজেটের মাধ্যমে ভোটার সাধারণকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা থাকবে বলে জানিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। আর স্বাভাবিকভাবেই ভোটের বাজেট নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রত্যাশার বেলুন ফুলতে থাকে। তবে এবার সেটা চুপসে গেছে আগেভাগেই। নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি আর ব্যাংকে রাখা আমানত নিয়ে এখন উল্টো শঙ্কা দেখা দিয়েছে জনমনে। আর ব্যবসায়ীদের আশাভঙ্গ হয়েছে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর নিয়ে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরি আগামী বাজেট সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাজেটে নতুন ভ্যাট আইনের কী ধরনের প্রভাব পড়বে সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। তবে ব্যাংকে আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি পেলে এটি নিশ্চিতভাবেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে করে সাধারণ মানুষের ব্যাংকে রাখা আমানতের পরিমাণ কমে যেতে পারে। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। নির্বাচনের আগে আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের যে বাজেট আজ পেশ হচ্ছে তা বর্তমান সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারবে না বর্তমান সরকার। ভোটের আগে নতুন বাজেটে মানুষকে খুশি করার চেষ্টা রয়েছে সরকারের। প্রতিশ্রুতি ও বরাদ্দ রয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুসহ দশটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের। পদ্মা সেতু প্রকল্পে ৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে ৭ হাজার ৬১০ কোটি টাকা, মেট্রোরেল নির্মাণে ৩ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা, কাঁচপুর, মেঘনা এবং গোমতী দ্বিতীয় সেতু নির্মাণে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের জন্যই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বাজেটের আকার বড় করে মানুষকে চমকে দেওয়ার লক্ষ্যও আছে সরকারের। চার লাখ কোটি টাকার নতুন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরে ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া মধ্যবিত্তকে খুশি করতে করমুক্ত আয়সীমাও আড়াই লাখ থেকে কিছুটা বাড়ানো হবে বলে অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন। তবে সব কিছু ছাপিয়ে বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে। নতুন বাজেট কার্যকরের মাধ্যমে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করতে যাচ্ছে সরকার। যে আইন নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রবল আপত্তি রয়েছে। আইনে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের বিধান রাখা হচ্ছে। এই আইন নিত্যপণ্যের দাম এবং জীবনযাপনের ব্যয় বাড়াবে বলে মনে করে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান আইনে ১৫টি সেবা খাতে সংকুচিত হারে ভ্যাট আদায় করা হয়। অর্থাৎ এসব সেবায় ভ্যাটের হার অনেক কম। নতুন আইনে এই ১৫টি সেবার ওপরও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। বিদ্যমান আইনে প্রায় সব ধরনের ওষুধই ভ্যাটমুক্ত। নতুন আইনে ক্যান্সার, কিডনি ডায়ালাইসিসসহ জটিল রোগের কিছু ওষুধে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হলেও সাধারণ রোগে ব্যবহৃত সব ধরনের ওষুধের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। ফলে মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়বে। শুরু থেকেই ব্যবসায়ীরা নতুন ভ্যাট আইনের বিরোধিতা করে আসছেন। এমন কী ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ও এনবিআর যৌথভাবে যে বাজেট আলোচনার উদ্যোগ নেয়, সেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নতুন ভ্যাট আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথাও বলেছেন। ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে অর্থমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছিলেন, ভ্যাটের হার কমানোর কথা। ফলে ব্যবসায়ীরা ধরেই নিয়েছিলেন ভ্যাটের হার কমে ১২ বা ১৩ শতাংশ হচ্ছে। কিন্তু গত শনিবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাফ জানিয়ে দেন, নতুন আইনে ১৫ শতাংশ হারেই ভ্যাট কার্যকর হবে। ফলে ভ্যাট নিয়ে যে অসন্তোষ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছিল সেটি নিরসন না করেই বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ রেখে ভোটের এই বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের আগে সরকারের উচিত সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা। হঠাৎ করে কোনো কিছু চাপিয়ে না দিয়ে সহনীয় পর্যায়ে ধীরে ধীরে করাই ভালো। আমরা এখনো মনে করছি, অর্থমন্ত্রী ভ্যাট আইন কার্যকর করার আগে ব্যবসায়ীদের দাবি পুনর্বিবেচনা করবেন।

ভ্যাট ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে ব্যাংকে রাখা আমানত নিয়ে। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি জীবন-যাপনের ব্যয় কমিয়ে যে টাকা অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে ব্যাংকে জমা রাখেন, সেখানেও কর দ্বিগুণ হচ্ছে। জানা গেছে, আবগারি শুল্ক নামে এই কর বাড়ানোর ফলে ব্যাংক থেকে নিজের টাকা তুললেও দ্বিগুণ কর দিতে হবে। আবার ব্যাংক থেকে কেউ ঋণ নিতে গেলেও ঋণের সেই অর্থ থেকে দ্বিগুণ কর দিয়ে আসতে হবে সরকারকে। বর্তমানে সুদের হার কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো কমবেশি ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে আমানতের ওপর। বছরে গড় মূল্যস্ফীতির হারও ৫ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে মূল্যস্ফীতির হার বাদ দিলে এমনিতেই ব্যাংকে রাখা আমানতে সুদ শূন্য হয়ে যায়। এই অবস্থায় আবগারি শুল্ক দ্বিগুণ হলে আমানত ঋণাত্মক হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ আমানতকারীরা।

ডিজিটাল বাজেট : বৃহস্পতিবার বাজেট পেশের আগে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে বাজেট প্রস্তাবনা অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হবে। গত কয়েক বছরের মতো এবারও ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাৎ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে বাজেট উপস্থাপন করা হবে।

Top