আজ : বুধবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল : রায়ের ব্যাপারে কৌশলী সরকার

সময় : ১০:১২ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ১৫ আগস্ট, ২০১৭


আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বিশেষ করে পর্যবেক্ষণ নিয়ে কৌশলী অবস্থানে রয়েছে সরকার। এ রায়ের পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহারে (এক্সপাঞ্জ) এক দিকে চাপ এবং অন্য দিকে সমঝোতার চেষ্টা করে যাচ্ছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। তারই অংশ হিসেবে এক দিকে সরকারের নেতা-মন্ত্রী ও আইনজীবীদের কঠোর বক্তব্য ও আন্দোলন, অন্য দিকে প্রধান বিচারপতির সাথে সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ লোকদের বৈঠক ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এ দিকে গতকাল সোমবার রাষ্ট্রপতিকে রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও সরকারের অবস্থান জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সকালে রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনে এ বৈঠকের সময় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাও (এস কে সিনহা) সেখানে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ বা সরকার তেমন ভাবছে না। কিন্তু রায়ের পর্যবেক্ষণে যেসব বিষয় উঠে এসেছে তা নিয়ে আওয়ামী লীগ চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। সে জন্য রায়ের বিষয়টি বাইরে রেখে পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহারের ওপর জোর দিচ্ছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। সেই লক্ষ্যে দুইটি কৌশল নিয়ে এগোচ্ছেন তারা। এক দিকে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল জোটগতভাবে রাজপথে সভা-সেমিনারে সমালোচনা করে চাপ সৃষ্টি করবে আর অন্য দিকে প্রধান বিচারপতির সাথে সরকার সমঝোতার চেষ্টা চালাবে। প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে সমঝোতার আশ্বাস পেলেই কেবল আওয়ামী লীগ পর্যবেক্ষণ এক্সপাঞ্জ করার জন্য আদালতে আবেদন বা রিভিউ করবে। এর আগে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপে যাবে না সরকার।
প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ গত ৩ জুলাই বিচারপতি অপসারণসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে দেয়া হাইকোর্টের রায় বহালের পক্ষে মত দেন। এরপর ১ আগস্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় কয়েকটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণসহ প্রকাশ করা হয়। রায় ঘোষণার পর থেকেই সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি এ রায়কে ঐতিহাসিক আখ্যায়িত করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করছে।
আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের এ রায় এবং পর্যবেক্ষণকে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। সব বিচারপতির সর্বসম্মত রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত ‘রাজনীতিতে ব্যক্তিবাদ’, সামরিক শাসন, ‘অপরিপক্ব সংসদ’, দুর্নীতি, সুশাসন, মুক্তিযুদ্ধ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা করা হয়। বিষয়টি নিয়ে বিস্মিত ও চরম ক্ষুব্ধ হন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। বিশেষ করে কারো ‘একক নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়নি’ এবং ‘বর্তমান সংসদ অপরিপক্ব’ আদালতের এ পর্যবেক্ষণকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারা।
সে জন্য এ রায় ঘোষণার পর কিছু দিন চুপ থাকলেও কয়েক দিন ধরে দলটির নেতারা মুখ খোলা শুরু করেছেন। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন তারা। দল ও সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে মধ্যম সারির নেতা-মন্ত্রীরাও আদালতের রায় নিয়ে কথা বলছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত বিষয়ে আক্রমণ করে অবিলম্বে প্রধান বিচারপতির স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না হলে অপসারণ দাবি করেছেন। প্রয়োজনে দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামারও হুমিক দিচ্ছেন তারা। দাবি আদায়ে সারা দেশে ইতোমধ্যেই তিন দিনের কর্মসূচি পালন করছেন আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা। একই সাথে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এ রায়কে প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগ নেতা, সরকারের মন্ত্রী, আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবী ও ১৪ দলের আন্দোলনের মধ্যেই গত শনিবার রাতে হঠাৎ অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে বাসভবনে গিয়ে প্রধান বিচারপতির সাথে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তবে এ বৈঠকের খবর মিডিয়ার চাউর হয়ে যায়। ওই দিন বৈঠকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সরকার বা দলের তরফ থেকে কেউ কিছু স্পষ্ট করেননি। পর দিন স্বয়ং আইনমন্ত্রীও বলেন, তিনি বৈঠকের বিষয়বস্তু জানেন না। তবে সন্ধ্যায় ওবায়দুল কাদের ওই বৈঠক নিয়ে প্রথম মুখ খোলেন।
বৈঠকের কথা স্বীকার করে সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতির বাসায় গিয়েছিলাম। তার সাথে আমার দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়েছিল। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ বা অবজারভেশন ছিল তা নিয়ে আমাদের পার্টির বক্তব্য জানিয়েছি। আরো অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে দীর্ঘক্ষণ।’
তবে আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে কিছু না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তার (প্রধান বিচারপতি) সাথে আলোচনা হয়েছে, দীর্ঘক্ষণ। আরো আলোচনা হবে। আলোচনা শেষ হয়নি। শেষ হওয়ার আগে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। সময় হলে আপনারা সব কিছু জানতে পারবেন। আমিও বলব।’
এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন ওবায়দুল কাদের। এ সময় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
পরে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমাদের দলের অবস্থান রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরেছি। এ ছাড়া শনিবার প্রধান বিচারপতির বাসভবনে আমাদের যেসব কথাবার্তা হয়েছে সে সম্পর্কেও রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছি।’
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘যেহেতু রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক প্রধান বিচারপতি তিনি নিয়োগ দেন। তাকে আমি বিষয়টি জানিয়েছি।’
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের এ রায় ও পর্যবেক্ষণ ছাড়াও প্রধান বিচারপতির কথাবার্তায় আওয়ামী লীগ বেশ ক্ষুব্ধ। তিনি বিভিন্ন সময় সরকারের সমালোচনা করে নানা ধরনের মন্তব্য করেন। সে জন্য এ রায়কে কেন্দ্র করে তাকে বড় ধরনের একটি চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া চাপ তৈরি করা না হলে সমঝোতাও হবে না। সে জন্য আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা রায় নিয়ে প্রকাশ্যে কঠোর মন্তব্য করছেন। অন্য দিকে প্রধান বিচারপতির সাথে আলাপ-আলোচনাসহ নানা মাধ্যমে একটা সমঝোতার রাস্তাও বের করতে চায় সরকার। এতে রাষ্ট্রপতিকেও পাশে চায় সরকার। সে জন্যই গতকাল তার সাথে বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের দুই জন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়ার আগ পর্যন্ত বাইরের সমালোচনা ও আন্দোলন থামবে না। এগুলো চলতেই থাকবে। আওয়ামী লীগ এ রায়ের পর্যবেক্ষণকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। যেভাবেই হোক তা প্রত্যাহার হবেই। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই।’
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু বলেছেন, ‘আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। রায়ের সাথে দেয়া অনভিপ্রেত পর্যবেক্ষণ বাতিল করতে হবে। এখানে কোনো ছাড় নেই।’
সমালোচনা ও সমঝোতার কৌশল নিয়ে তিনি বলেন, ‘রায়ের পর্যবেক্ষণগুলো নিয়ে আমরা দলীয়ভাবে এবং আইনজীবীরা ফোরামের মাধ্যমে কর্মসূচি পালন করব। আর সরকার নিজস্ব কৌশলে এগোবে।’
আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে ইতোমধ্যেই বেশ চাপের মুখে পড়েছে বিচার বিভাগ। সে জন্য সরকারের কঠোর বক্তব্যের পরও প্রধান বিচারপতির কোনো প্রতিক্রিয়ার কথা শোনা যাচ্ছে না। তাই শিগগিরই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে বলেও জানায় সূত্রগুলো।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল সেই দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে, কিন্তু শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ক্ষণিকের এ মেঘ কেটে যাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আকাশের মেঘ ক্ষণিকের, সূর্য চিরদিনের। ক্ষণিকের মেঘ কাটিয়া যাবে, চির দিবসের সূর্য উঠিবে আবার।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তা বাদ দিতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। তার কোনো বিকল্প নেই।

আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Top