আজ : রবিবার, ১৯শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সামাজিক যোগাযোগে যা খেয়াল রাখতে হবে

সময় : ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ০৯ মার্চ, ২০১৭


আমাদের দেশে, একেবারে ছোট স্কুল লেভেল থেকে শুরু করে একেবারে উঁচু লেভেলের অফিসিয়াল ব্যাপারস্যাপারে, সজ্ঞানে অথবা অবচেতন মনে, পারিবারিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের অভাবে, অথবা একেবারেই নিজস্ব মানসিকতার সমস্যার কারণে আমরা প্রফেশনালিজম শো করতে পারি না। নানান অশোভন, অযথাযথ বিহেভিয়ার করি। সেই লিমিটেশন এবং ভুলগুলো ধাপে ধাপে তুলে আনার প্রথম প্রয়াস এটি। প্রথম পর্বে থাকছে প্রাইভেসি রিলেটেড এটিকেট– অর্থাৎ অন্যের প্রাইভেসি লংঘন না করে এবং এর প্রতি সম্মান রেখে কীভাবে আপনি জীবনযাপন করবেন– এডুকেশনাল ইন্সটিটিউশন বা ওয়ার্কপ্লেসে কীভাবে আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করবেন, কী বলবেন, কী বলবেন না ইত্যাদি।

● একজন মানুষকে কী কী জিজ্ঞেস করা যায়? কী কী জিজ্ঞেস করা যায় না?

আমাদের দেশে একজন মানুষের প্রাইভেট ব্যাপারগুলো সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন অনেকে এত সহজে করে ফেলে যে অফেন্সিভ হচ্ছে কিনা কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না। ভাবে, এগুলো নিতান্ত সাধারণ প্রশ্ন, যে কাউকে করা যায়। কিন্তু খেয়াল রাখুন:

একজন অপরিচিত মানুষের সাথে প্রথম আলাপে যা যা জিজ্ঞেস করা যায়:

ক. নাম (ভদ্রভাবে, যেমন, যদি কিছু মনে না করেন, আপনাকে কী বলে ডাকতে পারি?)। সিনিয়রিটি বা অন্য কোন কারণে নাম ধরে ডাকা সম্ভব না হলে জিজ্ঞেস করবেন, আপনাকে কী সম্বোধন করবো, স্যার না ভাইয়া, না আঙ্কেল?

খ. পেশা (শুধুমাত্র যে ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক সেক্ষেত্রে পেশা জিজ্ঞেস করা যায়, তবে কোনমতেই বেতন নয়!)।

● একজন অপরিচিত মানুষের সাথে প্রথম আলাপে যা যা কোনমতেই জিজ্ঞেস করা যায় না:

জন্মতারিখ, বয়স, পিতামাতার নামধাম ও বৃত্তান্ত, পরিবার সংক্রান্ত কিছু, দেশের বাড়ি, বেতন, রেজাল্ট (সিজিপিএ বা গ্রেড), রিলেশনশিপ সংক্রান্ত বিষয় (প্রেম, বিয়ে, সন্তানাদি ইত্যাদি), পেশার ডেজিগনেশন ইত্যাদি। যে যে ব্যাপারে আপনি অনিশ্চিত, সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন না– এভাবেই সেইফ থাকবেন। এই প্রতিটি বিষয়ই জানার অধিকার রাখেন পরিবারের সদস্যরা, আপনজনেরা, আত্মীয়স্বজন এবং খুব কাছের বন্ধুরা– স্বল্প পরিচয়ের কারো এগুলো জানার অধিকার বা প্রয়োজন নেই, এমনকি প্রতিবেশীদেরও নয়।

লক্ষ করবেন, অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবেই এগুলোর অনেক কিছুই কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন। অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো না জানলে পেট গুড়গুড় করে, কারণ পরচর্চা করা আমাদের জাতীয় অভ্যাস। বেতন আর রেজাল্ট জাতীয় ব্যাপারগুলো একজনের অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং গোপন ব্যাপার, কেউ নিজে থেকে না বললে জানতে চাওয়া অভদ্রতা, এবং একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।

● যোগাযোগের ভদ্রতা, সম্বোধন ইত্যাদি

প্রত্যেক মানুষেরই কিন্তু প্রাইভেট লাইফ আছে, কিন্তু যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমরা সবসময় এটি বেমালুম ভুলে যাই। কাজেই কারো সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আগেই নিজেকে প্রশ্ন করে নেবেন, এতে তাঁর প্রাইভেসি লঙ্ঘন হচ্ছে কি? তাঁর ডিস্টার্ব হচ্ছে কি? এটিই কি তাঁর সাথে যোগাযোগের সঠিক এবং প্রফেশনাল উপায়?

ক. নানা কারণে অনেককে মেইল পাঠাতে হবে। সবসময় সম্বোধনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করুন লাস্ট নেইম, যতক্ষণ না ঐ ব্যক্তি আপনাকে অন্য কোন নামে সম্বোধন করতে অনুরোধ করেন। সম্বোধনে ফার্স্ট নেইম ব্যবহার করার অধিকার রাখেন শুধু আপনজনেরা, বন্ধুবান্ধব ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রে সম্বোধন কী করবেন বুঝতে না পারলে তাঁর ডেজিগনেশন ব্যবহার করুন– যেমন, ডিয়ার মিস্টার ম্যানেজার, ডিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ইত্যাদি।

খ. সম্বোধনের ক্ষেত্রে অনেকের আকার-আকৃতি ছোট বা কমবয়সী (বা সমবয়সী) মনে হয় বলেই হয়তো তুমি সম্বোধনে কথা বলা শুরু করা আজকালকার ছেলেমেয়েদের অভ্যাস। ব্যাপারটাতে হয়তো খানিকটা আলগা ‘কুল’ আঁচ আছে, কিন্তু সেইফ সাইডে থাকতে ‘আপনি’ দিয়েই শুরু করুন। ‘তুমি’ বা ‘তুই’ তে নেমে আসার বিস্তর সময় পাবেন যদি দরকার হয়। যেখানে ক্লাসমেটরাই শুধু আছে, সেখানেও কিন্তু অনেক কেইসে আপনার সিনিয়ররা আপনার সাথে ক্লাস করতে পারেন, কাজেই সাবধান।

গ. যখন কাউকে টেক্সট করে কিছু জানতে চান, অবশ্যই শুরুতে নিজের পরিচয়টা দিয়ে তারপর আসল কথা বলুন। অজানা-অচেনা নম্বর থেকে টেক্সট করে ‘ঐ ব্যাটা এই ইনফরমেশনটা দে’ অথবা ফোন করে কে ধরেছে তা না জেনেই একটা অশালীন সম্বোধন দিয়ে কথা শুরু করা আপনাকে অনেক ক্ষেত্রে বিপদে ফেলবে।

ফোন রিসিভ করার ক্ষেত্রেও তাই। অচেনা নম্বর রিসিভ না করাই ভালো। আর করলেও ভদ্রভাবে যিনি ফোন করেছেন, তাঁর পরিচয় আগে জেনে নিন। প্রয়োজনে নিজের পরিচয় দিন– তারপর কথা শুরু করুন।

ঘ. ধরুন, কেউ আপনার ফোন ধরছেন না। হয়তো ব্যস্ত আছেন বা ফোন থেকে দূরে আছেন। এক্ষেত্রে অনেকে পাগলের মত দশবার বিশবার কল দিতেই থাকে, দিতেই থাকে। ভালো এটিকেট হল একবার ফোন করা, জবাব না পেলে একটা ছোট্ট টেক্সট দিয়ে রাখা। তিনি প্রয়োজন মনে করলে পরে কল ব্যাক করবেন।

ঙ. অনেকে হয়তো আপনার সাথে যোগাযোগ রাখতে চান না। কিন্তু আপনি জোর করেই যোগাযোগ করতে চান। এটি কিন্তু তাঁর প্রাইভেসির চরমতম লঙ্ঘন। চাইলে তিনি এ ব্যাপারে হ্যারাসমেন্টের অভিযোগ করে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। বাংলাদেশে হয়তো ব্যাপারটিকে অত গুরুত্ব দেয়া হয় না, কিন্তু অনেক দেশেই প্রাইভেসিকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হয়।

চ. হয়তো কারো সাথে আপনার যোগাযোগ করা দরকার। আপনি তাঁকে না পেয়ে তাঁর বন্ধুর কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে ধুম করে ফোন করে দিলেন। এটিও চরম অভদ্রতা। কাউকে ফোন করা হল তাঁর সাথে ডিরেক্ট কন্টাক্ট। এটি করার আগে অবশ্যই ইনডিরেক্ট কন্টাক্ট করে তাঁর অনুমতি নিতে হবে (ই-মেইল, টেক্সট)। অনুমতি পেতে দেরী হলে অপেক্ষা করতে হবে।

ছ. ওপরের পয়েন্ট থেকেই আসে আরেকটি পয়েন্ট– কখনোই কারো অনুমতি ছাড়া তাঁর ই-মেইল অ্যাড্রেস, ফেসবুক আইডি, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ছবি বা অন্য কোন তথ্য অন্য কারো সাথে শেয়ার করা যাবে না– এটি প্রোফেশনালিজম এর চরম লঙ্ঘন, বিশ্বাসের তো বটেই। বন্ধু মানুষ বা পরিচিত বলেই আপনি আরেকজনের ইনফরমেশন ইচ্ছেমত শেয়ার করতে পারেন না– কারণ এগুলো আমানতের মত।

● কারো সাথে সাক্ষাৎ করার সময়

কেউ কেউ আন্তরিকতা দেখানোর জন্য একেবারে প্রথম দেখাতেই গায়ে চড়ে বসে– কোলাকুলি না করলে মনে শান্তি পায় না। কিন্তু প্রথম দেখাতে একজন অপরিচিত মানুষ থেকে খানিকটা দূরত্ব নিয়ে দাঁড়াতে হবে।

হ্যান্ডশেকের নিয়ম হল, আপনার সিনিয়র যদি আপনার দিকে হাত না বাড়ান তাহলে আপনি কখনোই নিজে আগে হাত বাড়াবেন না। তিনি যতক্ষণ হাত ঝাঁকাবেন, ততক্ষণ আপনিও হাত ঝাঁকাবেন, তিনি ছেড়ে দিলে আপনিও ছেড়ে দেবেন! হাতের চাপ রাখবেন মাত্রার মধ্যে। কোলাকুলিতেও তাই, সিনিয়র আপনার সাথে কোলাকুলি করতে না এগুলে আপনিই তাঁকে আগে গিয়ে জড়িয়ে ধরবেন না। এছাড়াও, কোন ভদ্রমহিলা যদি আপনার দিকে হ্যান্ডশেক করার জন্য আগে হাত না বাড়ান, আপনি নিজে থেকে আগে হাত বাড়াবেন না। যদি আপনি ভুলক্রমে আগে হাত বাড়িয়ে দেন, আর ভদ্রমহিলা মুখ গোমড়া করে বলে বসেন, ‘সরি, আই ডোন্ট শেইক হ্যান্ডস’, অথবা দু’পাশে মাথা নাড়েন, অথবা কিছুই না বলে আপনাকে উপেক্ষা করেন– তাহলে কিন্তু সবার সামনে বেইজ্জত হয়ে যাবেন– ঐ হাত আর নিজে নিজে নামাতে পারবেন না।

এটিকেটগুলো লঙ্ঘন করা আমাদের রক্তে এমনভাবে মিশে গেছে যে এগুলো পালন করার কথা চিন্তা করলেও শুরুতে গা কুটকুট করবে। “আমরা আমরাই তো” অথবা “এসব ব্যাপার তো আদিখ্যেতা” ভেবে হয়তো অনেক কিছুই আমরা এভয়েড করি। কিন্তু এগুলোই হয়তো আপনাকে একজন প্রোফেশনালিজম সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলবে।

Top