আজ : সোমবার, ২০শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৬ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সুপেয় পানি পায় না দুই কোটি মানুষ

সময় : ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ২৩ মার্চ, ২০১৭


উপকূলে লবণাক্ততা, আর্সেনিক দূষণ আর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় পানীয় জলের সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ। গ্রামাঞ্চলে ৩০ কিমি দূরে গিয়ে পানীয় জল সংগ্রহ করতে হচ্ছে আর শহরে গভীর নলকূপেও পাওয়া যাচ্ছে না সুপেয় পানি।

খুলনা শহর থেকে ৪০ কি.মি দূরে দাকোপ উপজেলা। সেই উপজেলায় এখন পানীয় জলের প্রধান উৎস একটি গভীর নলকূপ। আগের নলকূপগুলো থেকে লবণ পানি ওঠে। তাই সেই পানি পান করা যায় না। দু’বছর হলো নতুন বসানো এই নলকূপটির পানি সুপেয়। এই নলকূপের পানি নিতে প্রতিদিন কম করে হলেও ৩০ হাজার মানুষ ভিড় করেন। এই তথ্য জানান খুলনার সাংবাদিক হেদায়েত হোসেন।

তিনি বলেন, দূর দূরান্ত থেকে মানুষ পানি নিতে আসেন। নৌকা যোগে কলসি বা ড্রামে করে তারা পানি নিয়ে যান। প্রতি কলসি পানি সংগ্রহ করতে খরচ পড়ে যায় ১০ টাকার মতো। তাও সবাই পান না সেই পানি।

খুলনার উপকূলবর্তী কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপে চলছে লবণ পানির আগ্রাসন। দু-একটি গভীর নলকূপে সুপেয় পানি পওয়া যায়। বাকি নলকূপে লবণ পানি ওঠে। পুকুরের পানিই ভরসা। তবে সব পুকুরের পানি পানযোগ্য নয়, নয় নিরাপদ। তারপরও ঐ সব অঞ্চলে কিছু বড় বড় পুকুর আছে, যেখান থেকে মানুষ পানীয় জল সংগ্রহ করে।

খুলানা দীঘলিয়া, রূপসা আর ফুলতার নলকূপের পানিতে রয়েছে আর্সেনিক। হেদায়েত বলেন, আর্সেনিক, লবন পানির আগ্রাসন আর পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় এই অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট চলছে।

খুলনা শহরে গভীর নলকূপে পানি পাওয়া যায় না। এই মৌসুমে তাই খুলনা শহরে পানীয় জলের সংকট চলছে বলে জানান হেদায়েত।

বাংলাদেশের দক্ষিণের বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুরসহ ১৬টি জেলার কোনোটাতেই পর্যাপ্ত সুপেয় পানি নেই। সবখানেই লবণ পানির আগ্রাসন। কোথাও কোথাও আবার নলকূপের পানিতে রয়েছে আর্সেনিক।

পিরোজপুরের সাংবাদিক বলেন, এই অঞ্চলের গ্রামের মানুষ পুকুরের পানির ওপরই নির্ভরশীল। তবে পুকুরগুলোর দীঘদিন সংস্কার হয় না। ফলে অনেক সময়ই এলাকাবাসীরা বাধ্য হয়ে দূষিত পানি পান করেন। সিডরের পর কয়েকটি দাতা সংস্থার উদ্যোগে পিরোজপুরের বিভিন্ন উপজেলায় পুকুরের পানি বিশুদ্ধ করে পানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য পন্ড স্যান্ড ফিল্টার বা পিএসএফ বসানো হয় পুকুরে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার অধিকাংশই আজ অকেজো হয়ে গেছে।

আর যেগুলো সচল আছে তা থেকে পানি নিতে দূর দূরান্ত থেকে নারী-পুরুষরা ভিড় করছেন। কেউ কেউ আবার বৃষ্টির পানি ধরে রাখছেন পানীয় জলের জন্য।

গতবছর ‘‘নেপোটিজম অ্যান্ড নেগলেক্ট: দ্য ফেইলিং রেসপন্স টু আর্সেনিক ইন দ্য ড্রিংকিং ওয়াটার অফ বাংলাদেশ’স রুরাল পুয়র’’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা এইচআরডাব্লিউ জানায়, বাংলাদেশের প্রায় দু’কোটি মানুষ আর্সেনিক ঝুঁকির ভেতর রয়েছে। এছাড়া প্রতিবছর ৪৩ হাজার মানুষ আর্সেনিকজনিত রোগে মারা যাচ্ছেন। দেশে খাওয়ার পানিতে আর্সেনিক শনাক্ত হওয়ার ২০ বছর পরও বাংলাদেশ সরকার এই সমস্যার প্রতিকারে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এইচআরডাব্লিউ’র দাবি, আর্সেনিক দূষণের শিকার অধিকাংশ মানুষের ত্বকে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। অথচ আর্সেনিকের কারণে অনেকক্ষেত্রেই ক্যান্সার, হৃদরোগ ও ফুসফুসের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তাই অনেকে জানেনই না যে তারা আর্সেনিক সমস্যায় আক্রান্ত।

এদিকে, রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা ২৫০ কোটি লিটার। কিন্তু সরবরাহ করা হয় মাত্র ২০০ থেকে ২০৫ কোটি লিটার। অর্থআৎ ৪৫ কোটি লিটার ঘাটতি থেকে যায়। ঢাকায় এক দশকে আড়াই মিটার হারে ভুগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। এছাড়া ওয়াসার পানি পানযোগ্য কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তাই পানীয় জল হিসেবে ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে বোতলজাত পানির চাহিদা বাড়ছে।

ওয়াটার এইডের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের দু’কোটিরও বেশি মানুষ নিরপাদ পানি থেকে বঞ্চিত। তাদের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিবছর পাঁচ বছরের কম বয়সি কমপক্ষে ৪,১০০ শিশু মারা যায় নিরাপদ পানি এবং সেনিটেশন সুবিধার অভাবে।

Top