আজ : রবিবার, ২৫শে জুন, ২০১৭ ইং | ১১ই আষাঢ়, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

হাওরবাসীর কান্না থামাতেই হবে

সময় : ৩:৩৬ অপরাহ্ণ , তারিখ : ১১ এপ্রিল, ২০১৭


এ্যাড.শামীম আহসান: এখনো চৈত্র মাস। বৃষ্টি হওয়ার কথা না থাকলেও গত ক’দিন ধরে টুকটাক বৃষ্টি হচ্ছেই। কিন্তু এরই মধ্যে অতলান্ত পানিতে ডুবে গেলো সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জের প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমির ধান। অথচ আর ক’দিন পরই, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে নতুন ফসলের ঘ্রাণে এসব অঞ্চল, বিশেষ করে সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চল, মুখরিত থাকারই তো কথা ছিল।

কী বলবো একে, দুর্ভাগ্য? খানিকটা দুর্ভাগ্য বলাই যায়। কারণ, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টির কারণে এবং সুনামগঞ্জে মুষলধারে বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন নদীতে পানি বিপদসীমার ওপরে চলে যাওয়াটা দুর্ভাগ্যই তো।

কিন্তু এ দুর্যোগ-দুর্বিপাক তো আকস্মিক কিছু নয়! এমনটা তো প্রায় প্রতি বছরই ঘটে। এবং ঘটে বলেই পানি উন্নয়ন বোর্ড নামে একটি হাতী পোষে সরকার। সোনার ধান হারানো কৃষকের বুকফাটা কান্না কি এই হাতীর কর্ণকুহরে প্রবেশ করে? সে কি শুনেছে হাওরপাড়ের বাহাদুরপুর গ্রামের কৃষকবধু বাসন্তী রানি দাসের আর্তনাদ : ”ইবার কিতা খাইমু, বাইচ্চারারে কিতা খাবাইমু?”

কেন এই আর্তনাদ, কী হয়েছে বাসন্তী রানি দাসের?

হাওরপাড়ের এই কৃষকবধুর পরিবার সুদে টাকা ধার করে অন্যের জমি বর্গাচাষ করেছিল। অকাল বন্যা তাদের সেই জমির সব ফসল পানিতে তলিয়ে দিয়েছে। তাদের আগামী দিন তো দূরের কথা, আজকের দিনই অন্ধকারে ছেয়ে গেছে।

শুধু বাসন্তী রানি দাসের পরিবার নয়, সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের এরকম অসংখ্য ছোট-বড় কৃষকের সোনার ধান এভাবে তলিয়ে গেছে পানির নিচে।

কে না জানে, সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চল ”এক ফসলী এলাকা” হিসেবেই পরিচিত। এই জেলার ৪০টি হাওরের প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যেই তলিয়ে গেছে, টাকার অঙ্কে যা হাজার কোটি টাকার বেশি। শুধু তা-ই নয়, ঝুঁকিতে আছে আরো ১২০টি হাওরের বোরো ফসল।

এতো বড় ক্ষতি, এতো সর্বস্বহারা মানুষের কান্না, একে কি কেবলই ”প্রকৃতির খেলা বা খেয়াল” বলে চালিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে হুঁকায় তামাক টানা যায়? কিন্তু পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর দেখে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিশ্চিন্তে বসে হুঁকায় তামাক টানার কাজটিই করে চলেছে সংশ্লিষ্ট মহল।

আমরা জানি, নদীমাতৃক এই দেশে, বর্ষাবৃষ্টির এই ভূখণ্ডে ঝড়জলবন্যাফসলহানি নতুন কোনো ঘটনা নয়। নয় বলেই সরকার এসবের ক্ষতি যথাসম্ভব সীমিত রাখতে গড়ে তুলেছে অনেক সংস্থা। তাতে আছে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, সুরম্য ভবন, বিলাসবহুল গাড়ি। তাদের পেছনে সরকারের ব্যয় হয় বিপুল অঙ্কের অর্থ। অথচ সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের ফসল যখন একে একে ডুবে যায়, তখন সেই ”গুরুত্বপূর্ণ” সংস্থার টিকিটিরও দেখা পায় না কেউ।

দেখা যে পাওয়া যায় না, তার সত্যতা মেলে স্থানীয় কৃষকদের কথায়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ৩৭টি বড় হাওরসহ ৪২টি হাওরের ফসল রক্ষার জন্য বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ”করছে” পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এ কাজে বরাদ্দ প্রায় ৫৭ কোটি টাকা। এতো মোটা অঙ্কের বরাদ্দ সত্ত্বেও আজ ডুবে চলেছে ফসল।

কেন? জানতে চাইলে স্থানীয় কৃষকরা সাংবাদিকদের জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ফসলরক্ষা বাঁধ মেরামতের কাজ শুরুর কথা ছিল। কিন্তু অনেক বাঁধে কোনো কাজই করেনি পাউবো’র ঠিকাদাররা। যেসব বাঁধে ”কাজ” হয়েছে, তারও বেশিরভাগ নামেমাত্র। বেশিরভাগ বাঁধে ”এক কোদাল মাটিও ফেলা হয়নি” বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।

শুধু কৃষক কেন, অভিযোগ রয়েছে জনপ্রতিনিধিদেরও। তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতিবছর মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা করে। বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত নিয়ে চলে অনিয়ম ও দুর্নীতি।

সাধারণ কৃষক থেকে জনপ্রতিনিধি – সবার মুখে এক কথা। হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে অনিয়ম ও দুর্নীতি, দায়িত্ব পালনে গাফলতি অর্থাৎ সময়ের কাজ ঠিক সময়ে না-করা ইত্যাদি কারণে সারা বছরের খোরাক হারাতে বসেছে হাওরপাড়ের কৃষিজীবী মানুষদের, যারা স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার করে, মহাজন ও ব্যাঙ্কের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিয়ে ফসল বুনেছিল, কেউবা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে করেছিল ধানের আবাদ।

এসব মানুষ এখন কী খাবে, কোথায় যাবে – এই নিদারুণ প্রশ্নটি আমাদের বিবেকের সামনে জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু আমাদের কাছে এর কোনো উত্তর নেই।

তবে সরকারের কাছে আমাদের একটি দাবি আছে। তা হলো, যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি ও গাফলতির কথা জনতা ও জনপ্রতিনিধির মুখে সমস্বরে উচ্চারিত হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখতে অবিলম্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা হোক। দোষীদের চিহ্নিত করে আনা হোক আইনের আওতায়। নইলে প্রতি বছর ফসলবঞ্চিত হাওরবাসী মানুষের কান্না ও দীর্ঘশ্বাস আমাদের পিছু ছাড়বে না।

আমরা হাওরবাসীর মুখে তৃপ্তি ও স্বস্তির হাসিই দেখতে চাই, তাদের আহাজারি শুনতে চাই না। হাওরের এ কান্না থামাতেই হবে।

সম্পাদকঃ এ্যাড.শামীম আহসান

Top