আজ : বৃহস্পতিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৯ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

নীলের রাজ্য সেন্টমার্টিন’স।

সময় : ১২:৫৩ অপরাহ্ণ , তারিখ : ২৩ মার্চ, ২০১৭


এবি সিদ্দীক: নীলের রাজ্য সেন্টমার্টিন’স। নীল আকাশ আর সমুদ্রের নীল পানি মিশে একাকার এখানে। দ্বীপটির পূর্বদিকে মিয়ানমারের পর্বতমালায় দৃষ্টি আটকে গেলেও অন্য তিন প্রান্ত যেন নীল রংয়ের সীমানাবিহীন ক্যানভাস। খোলামেলা বালুকাময় সমুদ্র সৈকত আর সমুদ্রের বিরামহীন গর্জন যেন নীল রংয়ের মায়াময় রাজ্যে পরিণত করেছে সেন্টমার্টিন’স।
দেশের সর্ব দক্ষিণের আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্টমার্টিন’স দ্বীপে বসবাস করছে প্রায় আট হাজার মানুষ। প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন’স টেকনাফ উপজেলার একটি ইউনিয়ন। টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী এখানে প্রতি বছর বেড়াতে আসা পর্যটকের সংখ্যা চার লাখের বেশি। ২০০৬ সালে দ্বীপটিকে প্রতিবেশগত সংকটময় এলাকা ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এর পরিবেশ রক্ষায় এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সেন্টমার্টিন’স প্রবাল দ্বীপ হিসেবে খ্যাত হলেও পর্যটকদের অতিরিক্ত আহরণের কারণে এখানকার প্রবাল অনেক কমে গেছে বলে একটা ধারণা প্রচলিত আছে। সেই জন্যে গত কয়েকবছর ধরে দ্বীপটির আশপাশ থেকে প্রবাল আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘সেন্টমার্টিনসে প্রবাল কমে যাওয়া নিয়ে নানারকম কথা প্রচলিত আছে। এটা ঠিক যে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্থানীয়দের সহায়তায় প্রতিনিয়ত সেখান থেকে প্রবাল পাথর চুরি হচ্ছে। এ জন্য প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। সেন্টমার্টিন্সের প্রবাল নিয়ে এখনো ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা বাংলাদেশে হয়নি। গবেষণা করলে জানা যেত প্রবাল জন্ম নিচ্ছে কি না। গবেষণা করেই অতি মূল্যবান প্রবাল সম্পর্কে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।’
অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এই দ্বীপে বেড়াতে আসা পর্যটকরা বলছেন, যথোপযুক্ত তত্ত্বাবধান না থাকায় ক্রমেই খারাপ হয়ে উঠছে এর পরিবেশ। পরিবেশ অধিদপ্তর স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় কিছু পদক্ষেপ নিলেও দ্বীপটির প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ বেশ সময়সাপেক্ষ বলেই মনে করছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
বিশ্বখ্যাত এই দ্বীপে পর্যটকদের সুবিধার্থে গড়ে উঠা দোকানপাট হোটেল ও রিসোর্টের কারণে ক্রমেই ঘিঞ্জি হয়ে উঠছে এখানকার পরিবেশ। এখানে বেড়াতে আসা পর্যটকরা বলছেন নির্মল পরিবেশ ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা থেকে আসা ব্যাংকার দম্পতি আসিফ ও মোহনা বলেন, ‘নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হলেও কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনা না থাকায় বিরক্তি তৈরি করছে।’
মোহনা আক্তার বলেন, ‘বিশেষ করে জেটি এলাকা এত বেশি ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে যে তা কারো কাম্য নয়। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে সেই এলাকা আরো সুন্দর ও গোছানো থাকতে পারত। এখানকার সব কিছু আরো সুন্দর হতে পারত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে রক্ষার উদ্যোগ না থাকলে তা দিন দিন হারিয়ে যাবে, আমাদের প্রশাসনকে এ বিষয় গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।’
সেন্টমার্টিন’স এর পশ্চিম সৈকতে প্রয়াত সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমদ প্রতিষ্ঠিত ‘সমুদ্র বিলাস’র ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ পাপন বলেন, ‘এখানে পাকা ভবন স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা থাকায় স্যার (হুমায়ুন আহমদ) শুধুমাত্র কটেজ বানিয়েছেন, অথচ এখানে অনেকে পাকা ভবন নির্মাণ করে দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে। এখানে যত্রতত্র মাছের দোকান, শুটকির দোকান বসানো হয়েছে। এগুলো থেকে গন্ধ বের হচ্ছে বলে পর্যটকরা কমপ্লেইন করছেন, অথচ দেখার কেউ নেই।’

ছোট দ্বীপটিতে যত্রতত্র গড়ে উঠছে একের পর এক দালান। নেই কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। দ্বীপের মাঝামাঝিতে অবস্থিত ডোবাটি ভরপুর ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে। দ্বীপের চারপাশের সমুদ্র সৈকতে পড়ে থাকে ময়লা আবর্জনা। বছর দুয়েক আগে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন এবং টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকজন বিচ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব বিচকর্মীরা পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করলেও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কোনো কাজই হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন হোটেল ও রিসোর্ট মালিকরা।
বেসরকারি হোটেল অবকাশের মালিক নুর আলম ভোলা জানিয়েছেন, কেউ বিচের আবর্জনা পরিষ্কার করছে না, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় পর্যটকদের বর্জ্য নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন যেসব উদ্যোগ নিয়েছে সেগুলো সাময়িক, পুরো দ্বীপটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
দেশের মধ্যে পর্যটকদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্থান এই দ্বীপে প্রায় অর্ধশত অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেছে পরিবেশ দপ্তর। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষিত হওয়ার পর সেখানে ছাদসহ পাকা দালান নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপরও সেখানে যে কয়টি বিল্ডিং নির্মিত হয়েছে তার বেশ কয়টি সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ রাজধানীসহ দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আইনের তোয়াক্কা না করে এখানে একের পর ভবন নির্মাণ করে চলছেন।
সেন্টমার্টিন’স ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবু বক্কর ছিদ্দিক অভিযোগের সুরে বলেন, ‘পর্যটকরা দুইদিনের জন্য আসেন, পরিবেশ নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথাও নেই। স্থানীয়রা পাকা দালান করতে পারে না অথচ ঢাকা থেকে এসে প্রভাবশালীরা দালান তৈরি করছে, স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন মাত্র নিরাপত্তা প্রহরী কর্মরত আছেন সেখানে। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মাসুদ করিম বলেন, ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সেন্টমার্টিন’স সরকারের বিশেষ মনিটরিংয়ের আওতায় থাকলেও এর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে যথাযথ প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আরো সময়ের প্রয়োজন। কিছু প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেন্টমার্টিন’স আগের অবস্থানে ফিরে যাবে। ব্যক্তি মালিকানার স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হলে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।’

ছেঁড়া দ্বীপ ও সাদ্দামের পরিবারের পর্যটন সেবা
সাদ্দাম হোসেন। পর্যটন মৌসুম এলেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চলে আসেন এখানে। হোটেল অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ছেড়া দ্বীপে পর্যটকরা রাত্রি যাপন করেন না। তারপরও কোনো পর্যটক তাঁবু খাটিয়ে অথবা অন্য কোনো উপায়ে রাত্রিযাপন করতে হলে তাদেরকে খাবার সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে থাকেন সাদ্দামের পরিবার।
সাদ্দাম হোসেন জানান, পর্যটকদের আগমন উপলক্ষে তারা ছেঁড়া দ্বীপে চলে আসেন। বছরের কয়েকটি মাস এখানে থাকেন তারা। আবহাওয়া খারাপ হয়ে উঠলে পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেন্টমার্টিন্সে চলে যেতে হয় তাদের।
গত ২০ বছর ধরে সাদ্দামের পরিবারই হচ্ছে ছেঁড়া দ্বীপের একমাত্র সেবাদানকারী। ১৯৯৪-৯৫ সালে চিত্র নায়িকা মৌসুমী ও প্রয়াত চিত্র নায়ক সালমান শাহ অভিনীত ‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমার শুটিং চলাকালে শুটিং টিমের সাথে কাজ করার জন্য সাদ্দামের বাবা হোসেন আলী ছেঁড়া দ্বীপে আসেন। এরপর থেকে এই পরিবারটি ছেড়া দ্বীপের পর্যটকদের একমাত্র সেবা দাতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০১১ সালে হোসেন আলী মারা গেলে তার ছেলে এখানকার পর্যটকদের অর্থের বিনিময়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
সমুদ্রে ভাটার সময় সেন্টমার্টিনসের অনেক পর্যটক সাইকেল চালিয়ে আসেন ছেড়া দ্বীপে।
সাইকেল চালিয়ে ছেঁড়া দ্বীপে আসা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আইয়ুব জানান, এখানে আনলিমিটেড সমুদ্র সৈকত, যা সেন্টমার্টিন্সে বাংলাদেশের অন্যসব পর্যটন এলাকা থেকে আলাদা করেছে, দেশের অনেক পর্যটক এলাকায় গেছি, এটার তুলনা হয় না। সেন্টমার্টিন্স থেকে সাইকেল চালিয়ে আসতে ৪৫ মিনিট লেগেছে।
রাজধানীর উত্তরা থেকে আসা আল হুমারা জানালেন, ১৫ বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার সেন্টমার্টিন্সে এসেছি। এখানকার সবকিছু প্রাকৃতিক, এখান থেকে সমুদ্র ও আকাশের নীল যেভাবে দেখা যায় তা আর অন্য কোনো এলাকা থেকে দেখা যায় না। আগে যেমন দেখেছি এখনো সেই রকমই আছে, তবে একটু যেন ময়লা হয়েছে।

সামুদ্রিক মৎস্যের আধার সেন্টমার্টিন’স
সেন্টমার্টিন্সের ৮ হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগই মৎস্যজীবী। এখানকার অর্ধশতাধিক হোটেল রেস্টুরেন্টের সামনে পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য সাজানো থাকে তাজা মাছ। খাবার হিসেবে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণই হচ্ছে হরেকরকম তাজা সামুদ্রিক মাছ। পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী কয়েক মিনিটের মধ্যে তা পরিবেশন করা হয়। এছাড়া শুঁটকি মাছের বেশ কয়েকটি দোকান আছে দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে। যেখানে পাওয়া যায় নাম না জানা বহু প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর শুঁটকি।
উত্তাল সাগরে জেলেদের মাছ ধরার নানা গল্প হতে পারে পর্যটকদের জন্য আরো একটি আকর্ষণ। এখানকার দোকান পাট কিংবা স্থানীয়দের যেকোনো আড্ডায় প্রধান আলোচ্য বিষয় থাকে মৎস্য সম্পর্কিত। কে কত মাছ পেয়েছে, মাছের দরদাম কেমন, দেশের কোনো এলাকার মানুষ কোন মাছ পছন্দ করে সেই সবই হচ্ছে স্থানীয়দের আলোচনার মূল বিষয়। এখানকার মানুষের মাছধরার অনেক গল্পই আছে, যা রীতিমত দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের গল্পের মতই।
দ্বীপের পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা মৎস্যজীবী বশির আলী জানালেন, গত ৪৫ বছর ধরে সমুদ্রে মাছ ধরছেন। তার এই দীর্ঘ জীবনে এমনও মাছ ধরেছেন যেটি একটাই বিক্রি হয়েছে লাখ টাকার উপরে। সমুদ্রে হারিয়েও গেছেন কয়েকবার, আবার এত বেশি মাছ পেয়েছেন যে ট্রলারে জায়গা হচ্ছিল না, তখন ভয়ও পেয়েছেন। এক-দুই টন ওজনের হাঙ্গরও ধরেছেন। দাঁতাল হাঙ্গর ভয়ঙ্কর হলেও জালে আটক পড়লে তারা আর কিছু করতে পারে না।
তিনি জানান, এখনকার বড় মাছগুলোর দাম হয় এগুলোর ফুসফুসের জন্য, টেকনাফ ও কক্সবাজারের ব্যবসায়ীরা মাছ রেখে অনেক দাম দিয়ে ফুসফুস কিনে নিয়ে যায়।

Top