প্রতি মাসে একটি গ্রাম আলোকিত করবো বিনামূল্যে – শান

লিটার অব লাইট প্রজেক্ট। ৩.৫ কোটি মানুষের ঘরে বিদ্যুতের আলো নেই। কেরোসিনের বাতি দিয়েই কাজ সারে তারা। মাসিক আয়ের ৫ ভাগের এক ভাগ চলে যায় এই কেরোসিনের পেছনে। দেশে ৪০ লাখ ঘরে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করা হলেও সেসব সোলার সিস্টেমের ক্রয়মূল্য অনেক বেশি, যেখানে নিজেরা বানালে তৈরিতে খরচ পরবে ১০ ভাগের ১ ভাগ। ঠিক এই সমস্যার সমাধানের জন্য ইনোভেটিভ একটি আইডিয়া দিয়ে বিনামূল্যে সবার ঘরে আলো পৌঁছানোর কাজটাই করে লিটার অব লাইট বাংলাদেশ। লিটার অব লাইট বাংলাদেশ মূলত গবেষণা নির্ভর সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তারা মূলত সোলার দিয়ে সহজে তৈরি করা যায় এমন দুটি লাইটের আইডিয়া নিয়ে কাজ করে, সোলার স্ট্রিটলাইট যা আলোকিত করে বাড়ির উঠান বা রাস্তা যা সন্ধ্যা হলে অটো জ্বলে উঠবে আর সূর্যোদয়ের সময় অটো বন্ধ হবে এবং সোলার ল্যাম্প যা আলোকিত করে ঘরের ভেতর। এই বাতিগুলো তৈরি করতে খুবই সাধারণ জিনিস লাগে যেমন ছোট সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, এলইডি, পিভিসি পাইপ এবং প্লাস্টিকের বোতল। তারা এই প্রযুক্তি ওপেনসোর্স হিসেবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করছে, যাতে যে কেউ খুব সহজেই হাতের কাছে পাওয়া জিনিসপত্র দিয়ে স্বল্পমূল্যে এই বাতি তৈরি করতে পারে।

Liter Of Light Team
তারা প্রতিনিয়ত গবেষণা করছে এ রকম আরও নতুন নতুন আইডিয়া উদ্ভাবন করতে যা সহজেই রিপ্লিকেট করে যে কেউ সুবিধাভোগ করতে পারবে। তারা প্রতি মাসে একটি করে প্রজেক্টের আয়োজন করি, স্পন্সরের অর্থে ২০-৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে ৪-৫ দিন ওয়ার্কশপে আমরা ২০টি স্ট্রিটলাইট এবং ৫০টি ল্যাম্প তৈরি করি। তারপর সে লাইটগুলো আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চল যেমন পার্বত্য, চর, উপকূলীয়, দ্বীপ এবং বস্তি এলাকায় বিনামূল্যে বিতরণ করি। সঙ্গে আমরা স্থানীয়দের শেখাই কিভাবে তারা লাইট তৈরি করতে পারবে, যাতে আমরা যদি ৭০টি দেই তাঁদের ৭০০টি প্রয়োজন হলেও তারা বানিয়ে নিতে পারবে। আর লিটার অব লাইট বাংলাদেশ চায় সারাদেশের সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে নিজ এলাকার জন্য লাইট তৈরি করবে তাদের টেকনিক্যাল সহায়তা নিয়ে। সঙ্গে কিছু গরিব মানুষ আয়ের একটা সুযোগ পাবে এই লাইট তৈরি করে। লিটার অব লাইট বাংলাদেশ প্রত্যন্ত অঞ্চলে সোলার উদ্যোক্তা তৈরি করতে চায়। যেহেতু লিটার অব লাইট বাংলাদেশ একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, তাই সেবা থেকে কোন প্রকার আয় করে না। লিটার অব লাইট বাংলাদেশ কার্যক্রমের অর্থায়ন হয় স্পন্সর অথবা পার্টনারশিপ থেকে।
Founder
সানজিদুল আলম সিবান শান। লিটার অব লাইট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। মূল পেশায় তিনি একজন ডিজিটাল উদ্যোক্তা, ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট, ই-কমার্স, স্টার্টাপ ডেভেলপমেন্ট এবং ইনোভেশন বিশেষজ্ঞ। পড়াশোনা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে বিএসসি। তবে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহের কারণে খুব কম বয়স থেকেই প্রযুক্তিনির্ভর কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় শান, ২০০৮ সালে ১৬ বছর বয়সে প্রথম অনলাইন প্রফেশনাল হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর অনলাইনে কখনও ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক্স ডিজাইনার, কখনও ফ্রিল্যান্স ওয়েব ডিজাইনার, কখনও প্রোগ্রামার। ২০১০ থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং, স্ট্র্যাটেজি, প্ল্যানিং এবং নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করার প্রতি ঝোঁক বাড়াতে এই বিষয়গুলোতেই আটকে যাই। বিভিন্ন সময় ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজি এবং ডিজিটাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কখনও ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট আবার কখনও অফশোর জব করেন লম্বা একটা সময়। আমেরিকা, ভারত এবং চায়নার অনেক ছোট-বড় টেক কোম্পানি ও ডিজিটাল এজেন্সিতে অফশোর জব করেন শান। ২০১২ এর পর যখন দেশের ই-কমার্স এবং স্টার্টাপ মার্কেট বড় হচ্ছিল, তখন দেশের ইন্ডাস্ট্রির দিকে সময় দেওয়া শুরু করেন। ফিনটেক, এডটেক (এডুকেশন টেকনোলজি), ই-কমার্স, ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেছেন তিনি।
Workshop
বছর খানেক আগে ফ্রান্স থেকে স্বেচ্ছাসেবী তারা বাংলাদেশে এসে লিটার অব লাইট বাংলাদেশ সঙ্গে কাজ করতে চাচ্ছিল। তারা প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এই সামাজিক কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য দুবছর পার্টটাইম চাকরি করে টাকা জমিয়েছে। তারা স্বেচ্ছাসবী হিসেবে ৭ দিন কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে লিটার অব লাইট বাংলাদেশে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে ১ মাস কাজ করে। লিটার অব লাইট বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্য তিনটি, (১) গবেষণার মাধ্যমে এমন সব আইডিয়া উদ্ভাবন করা, যা যে কেউ রিপ্লিকেট করতে পারে, তারপর এই আইডিয়া উন্মুক্ত করে দেয়া। (২) নিজেরা স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় লাইট তৈরি করে বিতরণ করা। (৩) দেশের সাড়ে ১৩ হাজার নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন এবং এক লাখের বেশি অনিবন্ধিত সংগঠনকে একসঙ্গে নিয়ে দেশের ৩.৫ কোটি মানুষের জন্য লাইট তৈরি করা।
Light Giver
লিটার অব লাইট বাংলাদেশ চাই দেশের সব সংগঠন তাদের কাছ থেকে কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে নিজেরাই নিজেদের এলাকার গরিবদের জন্য লাইট তৈরি করবে। তারা আরো চায় গরিব কিছু মানুষকে লাইট তৈরির প্রক্রিয়া শিখিয়ে দিয়ে তাঁদের আয়ের একটা পথ তৈরি করতে। তারা তাঁদের এলাকার মানুষের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে লাইট তৈরি করবে, আর একটা ছোট মজুরি ধার্য করবে। ফেসবুক, ইউটিউবের মাধ্যমে তারা ভিডিও পাবলিশ করবে কিভাবে লাইট তৈরি করতে হয়, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা ওয়ার্কশপ করছি লাইট তৈরি শেখানোর জন্য, যাতে তারা নিজ নিজ এলাকায় উদ্যোগ নিয়ে লাইট বিতরণ করতে পারে। আর সর্বশেষে তাদের আর্থিক সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন কোম্পানি এবং দাতা সংস্থা যদি এগিয়ে আসে, তাহলে এ দেশের সব জায়গায় আলো পৌঁছে দিতে পারবে একদিন। আশার কথা হলো জাতিসংঘের একটি দাতা সংস্থা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চুক্তির আওতায় তারা লিটার অব লাইট বাংলাদেশ জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি প্রোডাকশন হাব তৈরি করবে। যেখানে আমরা ২০-৩০ জন রোহিঙ্গাকে শেখাব কিভাবে লাইট বানাতে হয়। তারা ওই সংস্থার আর্থিক সহায়তা এবং আমাদের তত্ত্বাবধানে লাইট তৈরি করবে, আর একটা পারিশ্রমিক পাবে। এছাড়া বিভিন্ন কর্পোরেট কোম্পানি প্রজেক্ট বেসিসে তাদেরকে স্পন্সর করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। আর লন্ডনভিত্তিক একটি দাতা সংস্থার সঙ্গে তাদের কথা হচ্ছে, তারা তাদেরকে একটি স্থায়ী প্রোডাকশন ল্যাব পরিচালনার ব্যাপারে সাহায্য করতে আগ্রহী। শান বিশ্বাস করে, বিশালসংখ্যক তরুণরা নিমিষেই সমস্যার সমাধান করতে পারে যদি সবাই শুরু করে। লিটার অব লাইট বাংলাদেশ চাই এই আইডিয়াটা দেশের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে যাক, যেখানে হয়ত লিটার অফ লাইট বাংলাদেশকে কেউ চিনবে না, কিন্তু আলোকিত হবে জীবন। এবং তাদের নতুন আরো কিছু পরিকল্পনা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। লিটার অব লাইট বাংলাদেশ এর জন্য রইল অনেক অনেক শুভ কামনা। কপিরাইট ডিসক্লেইমারঃ দৈনিক জনকন্ঠের অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত আর্টিকেল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রিমেইক করা হলো।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*