আজ : বৃহস্পতিবার, ১৬ই আগস্ট, ২০১৭ ইং | ২রা ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

আল্লাহ তাআলাকে ডাকার মর্মার্থ

সময় : ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ২৩ মার্চ, ২০১৭


আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব, যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে তারা অচিরেই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা মু’মিন : আয়াত ৬০)

আল্লাহ তাআলাকে ডাকা বা দোয়া করা হলো ইবাদত। এ কারণেই হাদিসে বলা হয়েছে। দোয়াই ইবাদাত। আল্লাহ তাআলা দোয়াকে ইবাদত হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং সাহায্য লাভের মাধ্যম বানিয়েছেন।

মানুষ যখন বুঝতে পারে যে, বস্তুজগতের উপায় উপকরণ; তার কোনো সমস্যা, কষ্ট ও চাহিদা পূরণ করার জন্য যথেষ্ট নয় বা যথেষ্ট বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না; তখন কোনো অতি প্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী সত্তার কাছে ধর্না দেয়া অপরিহার্য মনে করে।

আর তখনই মানুষ দোয়া করে এবং না দেখেই সে সত্তাকে ডাকে, প্রতিমুহূর্তে, প্রতিটি জায়গায় এবং সর্বাবস্থায় ডাকে। একাকী নির্জনে ডাকে, শুধু উচ্চস্বরেই নয়, চুপে চুপেও ডাকে এবং মনে মনেও তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। তা শুধু মাত্র একটি বিশ্বাসের ভিত্তিতেই জন্ম নেয়। কেননা এর মাঝেই নিহিত আছে আল্লাহ তাআলাকে ডাকার মর্মার্থ।

কী সেই বিশ্বাস?
যেই সত্তা মানুষকে সর্বত্র দেখছেন, তার মনের কথা, আবেগ ও অনভূতি শুনছেন। তিনি এমন অসীম ক্ষমতার অধিকারী যে, তাঁর কাছে প্রার্থনাকারী যেখানেই অবস্থান করুক না কেন তিনি তাকে সাহায্য করতে পারেন, তার বিপর্যস্ত ভাগ্যকে পুনরায় তৈরি করতে পারেন।

মানুষের উপলব্ধি
আল্লাহ তাআলার এই অনুগ্রহ ও দয়ার ওপর আমাদের জীবনটাই কুরবানি করা উচিত যে,
>> আল্লাহ তাআলা কুরআনে মানুষকে তার নিকট প্রার্থনা করার (সাহায্য চাওয়ার) জন্য আহ্বান করেছেন এবং প্রার্থনা আল্লাহ তাআলা কবুল (গ্রহণ) করার ওয়াদাও করেছেন।

>> হযরত সুফিয়ান সাওরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, আল্লাহর নিকট ওই বান্দাই সবচেয়ে বেশি প্রিয় যে খুব বেশি প্রার্থনা করে; আর ওই বান্দা খুবই অপ্রিয় ও মন্দ যে তার নিকট সাহায্য চায় না।

>> কবি বলেছেন-
‘আল্লাহর মহাত্ম্য এই যে, যদি তুমি আল্লাহর কাছে চাওয়া পরিত্যাগ কর, তবে তিনি অসন্তুষ্ট হন; পক্ষান্তরে আদম সন্তানের কাছে যখন কিছু চাওয়া হয়, তখন সে অসন্তুষ্ট হয়।’

>> আল্লাহ তাআলাকে ডাকার মর্মার্থ ও তাৎপর্য অনুধাবন করার পর মানুষের জন্য একথা বোঝা আর কঠিন থাকে না, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাহায্য ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করেন সে প্রকৃতই নিরেট নির্ভেজাল এবং স্পষ্ট শিরকে লিপ্ত হয়। যা হয়ে থাকে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। কারণ, যে সব গুণাবলী শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য সত্তার মধ্যেও আছে বলে সে বিশ্বাস করে। (নাউজুবিল্লাহ)

আল্লাহ তাআলাকে ডাকার মর্মার্থ উপলব্ধিতে কয়েকটি হাদিস তুলে ধরা হলো-
>> হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনে, যে ব্যক্তি মহামহিমান্বিত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না, তিনি তার প্রতি রাগান্বিত হন। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি)

>> হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দোয়াই হচ্ছে ইবাদতের সারবস্তু। (তিরমিজি)

>> হজরত নুমান ইবনে বশির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দোয়া-ই ইবাদত। অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

উল্লেখিত আলোচনার শিক্ষা
১. দু’টি ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়
>> মানুষ মনে করে আল্লাহ তাকদিরের ভালো-মন্দ একবারেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন, এতে রদবদল করার ক্ষমতা আল্লাহ পাকের নাই। (নাউজুবিল্লাহ) কিন্তু আল্লাহর এ আয়াতের ঘোষণা অনুযায়ী আল্লাহ বান্দার চাওয়া-পাওয়ার জন্য তাকদিরের ভালে ও মন্দের পরিবর্তন করতে পারেন।
>> দোয়া কবুল হোক বা না হোক, বান্দা তার প্রভুর সামনে নিজের অক্ষমতা, অযোগ্যতা, অভাব ও প্রয়োজন পেশ করে প্রভুর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়া এবং নিজের দাসত্ব ও অক্ষমতা স্বীকার করে নেয়া। এ দাসত্বের স্বীকৃতিই ইবাদতের মূল প্রাণসত্তা। এর ফায়দা সে পাবেই পাবে।

২. হজরত সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, একমাত্র দোয়া ছাড়া আর কোনো কিছুতেই তাকদিরের পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই।

৩. বহু সংখ্যক সাহাবি থেকে একটি হাদিস এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, একজন মুসলমান যখনই কোনো দোয়া করে তা যদি কোনো গুনাহের কাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের মতো কোনো কাজ না হয়, তবে আল্লাহ তায়ালা তাকে তিনটি অবস্থার যে কোনো একটি অবস্থায় কবুল করে থাকেন।
>> হয় তার প্রার্থিত জিনিস এই দুনিয়াতেই কবুল করা হয়;
>> নতুবা পরকালে প্রতিদান দেয়ার জন্য সংরক্ষিত করে রাখা হয়; অথবা
>> তার ওপর ঐ পর্যায়ের বা পরিমাণ বিপদ-আপদ আসা বন্ধ করা হয়। (তিরমিজি, মুসনাদে আহমদ)

৪. দোয়া করার সময়, হে আল্লাহ তুমি চাইলে মাপ কর, রহম কর, দান কর এই রকম না বলে বরং নির্দিষ্ট করে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে হবে, হে আল্লাহ! আমার ওমুক প্রয়োজন পূরণ করুন।

৫. দোয়া কবুল হয় না ভেবে অস্থির হওয়া যাবে না বরং অস্থির না হয়ে ধীরতা অবলম্বন করাই ঈমানদারের লক্ষণ।

৬. এমনকি ছোট থেকে অতি সুক্ষ্ণ এবং বড় থেকে অনেক বড় বিষয়গুলোর ক্ষেত্রেও আল্লাহর সাহায্য কামনা করা বা ডাকা।

পরিশেষে…
আল্লাহ তাআলাকে ডাকার মর্মার্থ উপলব্ধি করে তাওহিদের ওপর অটল ও অবিচল থেকে অন্যের নিকট কোনো কিছু চাওয়া থেকে বিরত হয়ে আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়া এবং তার নৈকট্য লাভ করা। যা ব্যতীত দুনিয়া ও পরকালে মানুষের কোনো উপায় নেই।

আর আল্লাহ তাআলাকে ডাকা বা তাঁর নিকট দোয়া করা-ই হলো নৈকট্য লাভের বিশেষ বাহন ও মাধ্যম। মানুষ আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা, প্রত্যাশা ও সাহায্য কামনার মাধ্যমেই তাঁর নিকটবর্তী হয়।

আল্লাহ তাআলাকে ডাকার মাধ্যমেই মানুষ তার ইবাদত করে, উদ্দেশ্যে লাভে সফল হয়, তার সন্তুষ্টি অর্জন করে। সুতরাং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নামাজ-রোজা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিপদ-মুসিবত, সৎ চাওয়া-পাওয়া তথা আমলি জিন্দেগিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজে আল্লাহ তাআলাকে ডাকাই মূল বিষয়।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে তাঁর কাছে ধর্না দেয়াসহ তাঁর শেখানো ভাষা ও নিয়মে, দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ লাভে আশ্রয় প্রার্থনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Top