২৩শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং, মঙ্গলবার

ইসলামি ব্যাংকিং না কি মুনাফিকি ব্যাংকিং?

আপডেট: জানুয়ারি ২৯, ২০১৮

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

মুনাফিক সম্পর্কে সাধারণ ধারনা দিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক। মুনাফিকের পরিচয় সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তারা যখন ঈমানদার লোকদের সঙ্গে মিলিত হয় তখন বলে আমরা ঈমান এনেছি। কিন্তু যখন নির্জনে তারা তাদের শয়তানদের সঙ্গে মিলিত হয় তখন তারা বলে, আসলে আমরা তোমাদের সঙ্গেইে আছি, আর আমরা তাদের সঙ্গে ঠাট্টাই করি মাত্র”। সুরা বাক্বারাহ : আয়াত ১৪১ । মানব জাতির প্রতি রহমত মুসলিমদের শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) মোনাফেকের সর্বকালের সর্ব নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে আবদুল্লাহ বিন উবাই এর নাম ঘোষণা করে গিয়েছেন।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে সে খাঁটি মুনাফিক। আর যার মধ্যে উক্ত স্বভাবগুলোর কোন একটি থাকে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকির একটি স্বভাব থেকে যায়- ১. তার কাছে কোনো আমানত রাখলে খিয়ানত করে ২. সে কথা বললে মিথ্যা বলে ৩. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে ৪. ঝগড়া করলে গাল-মন্দ করে। (বুখারি, মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ)। তাহলে মুনাফিক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা পাওয়া গেলো।

এখন দেখা যাক সুদ কি? আল্লাহপাক সর্বশেষ আসমানি কিতাব পবিত্র কোরআন শরীফের বলেন “মানুষের সম্পদের সাথে যুক্ত হয়ে বৃদ্ধি পায় এজন্য তোমরা যে সুদ দাও, আল্লাহর কাছে তা (সুদ) বৃদ্ধি পায় না; আর আল্লাহর সন্তোষ্টি লাভের জন্য তোমরা যারা জাকাত দাও তারাই তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করে থাকে”।

সূরা বাকারায় আল্লাহ্‌পাক আরও বলেন “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর, আর তোমাদের যে সুদ পাওনা আছে তা ছেড়ে দাও যদি তোমরা ঈমানদার হও। (২৭৮) অতঃপর তোমরা যদি তা না কর তাহলে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে রাখ। (২৭৯)

হাদিস শরীফে সুদের ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে “সুদ এমন একটি বিরাট গোনাহ যে, একে সত্তরটি ভাগে বিভক্ত করলে তাঁর সবচাইতে হালকা অংশটিও নিজের মায়ের সাথে যিনা করার সমান গোনাহের শামিল (নাউজুবিল্লা)”। – ইবনে মাজাহ, বায়হাকি।

পবিত্র কুরআন-হাদিস ও জাহিলি যুগের সুদী লেনদেনের ঘটনাগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে মুফাসসিরগন বলেন, রিবা বা সুদ হচ্ছে, কোন নির্ধারিত সময়ের জন্য প্রদত্ত ঋণের আসলের ওপর ঋণগ্রহীতা কর্তৃক দেয় নির্ধারিত অতিরিক্ত। অর্থাৎ আসলের উপর পূর্বনির্ধারিত অতিরিক্তই হল সুদ। সুদ কখনো কখনো জাহিলি যুগের মত সরাসরি পূর্বনির্ধারিত অতিরিক্ত হিসাবে দেয়া হয়, কখনো কখনো আবার আধুনিক যুগে পূর্বনির্ধারিত হারে ঘুরিয়ে সুদ আদায় করা হয়ে থাকে। যেভাবেই হোক আসলের উপর পূর্বনির্ধারিত অতিরিক্তই হল সুদ।

বাংলাদেশে সহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কতিপয় জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল বিনিয়োগ পণ্যর মধ্যে ১. বাই মুয়াজ্জেল ও ২. হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মুলক বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এখন দেখা যাক আসলে এগুলো কি প্রক্রিয়ায় কাজ করে।

(১) বাই-মুয়াজ্জেলঃ এ ক্ষেত্রে ইসলামি ব্যাংক সমূহ তাদের গ্রাহকদের একটি নির্দিষ্ট লিমিট বা সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারন করে দেয় এবং গ্রাহক যখন খুশি প্রয়োজন মত পণ্য ক্রয়ের শর্তে অর্থ ধার নিতে পারে। প্রতিটি ডিল এর মেয়াদ দেয়া হয় ০১ (এক) বছর এবং ডিল এর শুরুতেই নির্দিষ্ট হারে মুনাফা নির্ধারন করে এক (০১) বছরের মুনাফা যোগ করা হয়। কোন গ্রাহক যদি এক বছরের আগে অর্থ ফেরত দেয় তবে তাকে দিন হিসাব করে যে কয়দিন আগে অর্থ ফেরত দিয়েছে সে কয়দিনের মুনাফা কম রাখা হয়। কেউ যদি বেশি সময় নেয় তাহলে তাকে জরিমানা করা হয়, এই জরিমানাও ধার্য করা হয় সময় হিসাব করে।

এখন দেখা যাক, এই প্রক্রিয়ায় মুনাফা না কি সুদ হয়? প্রথমতঃ পণ্য বিক্রয়ের শর্তে অর্থ ধার দেয়া হয় কিন্তু পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় নিশ্চিত করা হয় না এবং ঋণগ্রহিতাকেই তার বিক্রয় এজেন্ট ধরা হয়। দ্বিতীয়ত প্রতিটি ডিল এর সাথে এক বছরের মুনাফা যোগ করা হয় এবং কেউ যদি ছয়মাস আগে অর্থ ফেরত দেয় তবে তার কাছ থেকে দিন হিসাব করে ছয়মাসের মুনাফা নিয়ে নেয়া হয় এবং ছয়মাসের মুনাফা ফেরত দেয়া হয়। আবার কেউ যদি বেশি সময় নেয় তবে দিন হিসাব করে বেশি মুনাফা (জরিমানা) আদায় করে। কিন্তু বাস্তবে ব্যবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রে দিন গুনে মুনাফা হয় কি? কখনোই হয় না। প্রতিটি বিক্রয়ে নির্দিষ্ট পরিমান মুনাফা হয় আবার ক্ষতিও হতে পারে যদি বাজারে চাহিদা কমে যায়। তাই এখানে মুনাফা বলা হলেও বাস্তবে সুদের লেনদেন করা হয় অর্থাৎ কথা আর কাজের অমিল যা পবিত্র কোরআন ও হাদীস শরীফের আলোকে স্পষ্ট মুনাফিকের লক্ষণ।

জাহিলি যুগে সুদ কেন্দ্রীক লেনদেন এর সবচেয় বড় উদাহরণ হল নির্দিষ্ট দামে পণ্য বিক্রয় করা হত এবং দাম পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেধে দেয়া হত এবং দাম দিতে না পারলে দাম বাড়িয়ে দেয়া হত এবং চক্র ভিত্তিক পদ্ধতিতে গ্রহন করা হত এই অতিরিক্ত অর্থই হল সুদ যা ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। অথচ দেশের ইসলামি ব্যাংকসমুহ প্রতিনিয়ত তাই করে যাচ্ছে শরীয়াহ বোর্ডের আড়ালে। এরা অপ-যুক্তি দিয়ে বলতে চায়, “ঋণগ্রহিতা যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ ফেরত দিতে পারেনি তাই জরিমানা নেয়া হল”। আবারো ঘুরিয়ে সুদ আদায় করছে অর্থাৎ কথা আর কাজের অমিল যা মুনাফিক এর ঘোষিত লক্ষনের পরিচয় বহন করে।

(২) হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মুলকঃ এবার দেখা যাক ‘হায়ার পারছেস আন্ডার শিরকাতুল মুলক’ বলতে কি বুঝায়। এর বাংলা অর্থ হল ভাড়ার ভিত্তিতে ক্রয়। সাধারনত স্থায়ী সম্পদ ক্রয় করার জন্য এ ধরনের ধার দেয়া হয়। যেমন ফ্ল্যাট ক্রয়। ফ্ল্যাট এর দামের একটি অংশ ব্যাংক থেকে দেয়া হয় যেমনঃ ৭০% বা তার কম এবং বলা হয় ক্রেতা যে ধার নিয়েছে তা নির্দিষ্ট কিস্তিতে ফেরত দিবে এবং বাসা ভাড়াও দিতে থাকবে এবং সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেয়ার পর ব্যাংক ক্রেতার নামে ফ্ল্যাট বুজিয়ে দিবে।

এবার দেখা যাক, এক্ষেত্রে কথা আর কাজের সাথে কতটা অমিল রয়েছে। আমরা জানি যে ফ্ল্যাট এর ভাড়া বর্তমান এর চেয়ে ভবিষ্যতে বেশি হয় এবং স্থানভেদে ভাড়া ভিন্ন হয়ে থাকে। অথচ ইসলামি ব্যাংক গুলো ভবিষ্যতের চেয়ে বর্তমানে বেশি ভাড়া আদায় করে এবং স্থান ভেদে ভাড়া ঠিক না করে ধারকৃত অর্থের উপর শ্তকরা হারে ভাড়া নির্ধারন করে অর্থাৎ সুদী ব্যাংকের সাথে অর্থের হিসাবের কোন গরমিল হয়না শুধু নামের পার্থক্য ছাড়া। একজন বলে ভাড়া আর অন্যজন বলে সুদ। আবারো ঘুরিয়ে সুদ আদায় করা হচ্ছে। অর্থাৎ কথা আর কাজের অমিল যা মুনাফিকের লক্ষণ। এভাবেই ইসলামি ব্যাংক গুলো পরোক্ষভাবে সুদ আদায় করে নিচ্ছে, যা মুনাফিকি নয় কি?

এরকম মুনাফার নামে সুদী লেনদেনের আরও অনেক বর্ণনা দেয়া সম্ভব। তবে লেখনীর ব্যাপ্তি দীর্ঘতার আশঙ্কায় এখানে প্রধানতম দুটি উধাহরন নিয়ে আলোচনা করা হল।

অনেকেই বলেন, তাহলে শরিয়াহ বোর্ড কি করে? বস্তুত বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারি করা ইসলামিক ব্যাংকিং গাইডলাইনে ব্যাংকগুলোকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। গাইডলাইন অনুযায়ী শরিয়াহ বোর্ড গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও শরিয়াহ বোর্ডের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট কোন বিধিনিশেধ নাই। শুধুমাত্র বোর্ডের সদস্যদের বাক্তিগত যোগ্যতা সম্পর্কে কিছু দিক-নির্দেশনা দেয়া আছে। ফলশ্রুতিতে খুব সহজেই ইসলামি ব্যাংকগুলো নিজেদের পছন্দমত বাক্তিদের সমন্বয়ে শরিয়াহ বোর্ড গঠন করেন। যারা ব্যাংক থেকে নির্দিষ্ট পরিমান ভাতা ও অন্যান্য সুবিদাধি গ্রহণ করে থাকেন। তাই ভাতার লোভে হোক কিংবা জ্ঞানের অভাবে অথবা জ্ঞানপাপী হয়ে কোরআন- সুন্নাহর পরিবর্তে ব্যাংকের বোর্ড সদস্যদের ইচ্ছা- অনিচ্ছাকেই অনেক বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তাই, কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি মহান পালনকর্তা আল্লাহপাক তাদের হেদায়েদ দান করুন। কেননা তাদের কারনেই ইসলামি ব্যাংকগুলো মুনাফিকিকে পুঁজি করে সাধারন মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের সাথে ধারাবাহিক প্রতারনা চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন