আজ : শনিবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

বন্যা এলাকায় খাদ্য সঙ্কট,ভয়াবহ অবনতি ১৪ জনের মৃত্যু , পানিবন্দি ৪ লাখ মানুষ

সময় : ১২:৩৭ অপরাহ্ণ , তারিখ : ১৪ আগস্ট, ২০১৭


আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় দ্বিতীয় দফায় বন্যাকবলিত হওয়ায় বন্যার্ত মানুষের মাঝে খাদের সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারি সাহায্য নেই। খাদ্য নেই , পানীয় নেই, নেই অন্য কোনো সহায়তা। কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। দুই জেলার ২৪টি উপজেলার প্রায় ৯ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যায় এ দুই জেলায় ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ দুই জেলার সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গেছে। বাঁধ রক্ষায় ও বানভাসি মানুষকে উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে আরো ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয় (ইউএনআরসিও) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ গবেষণা কেন্দ্রের (জেআরসি) বৈশ্বিক বন্যা সতর্কতা পদ্ধতির (গ্লো-এফএএস) বিশ্লেষণ করে এই সতর্ক বার্তা দেয়া হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অঞ্চলগুলোতে ১১ আগস্ট শুক্রবার থেকে পানি বাড়ছে এবং ১৯ আগস্ট পর্যন্ত এই পানি ভাটির দিকে প্রবাহিত হবে। গত ২০০ বছরের বেশি সময়ের ইতিহাসে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার উজানে বন্যার মাত্রা সবচেয়ে ভয়াবহ হবে। :  দ্য ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের (ইসিএমডব্লিউএফ) পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে হিমালয়ের দক্ষিণাঞ্চলে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে করে ব্রহ্মপুত্রের ভারত ও বাংলাদেশ অংশে পানি বাড়বে। জেআরসির বৈশ্বিক বন্যা সতর্কতা পদ্ধতির (গ্লো-এফএএস) গত ১০ আগস্টের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পুরো অববাহিকা এবং গঙ্গার ভাটিতে গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। আর ব্রহ্মপুত্রের উজানে গত ২০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। : এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের শিক্ষক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, বর্তমানে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে ২১ আগস্ট অমাবস্যা। অপরদিকে আসামে বড় ধরনের বন্য হচ্ছে। এই পানি নেমে আসতে তিন-চার দিন সময় লাগবে। আবার আমাদের ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মা অববাহিকায় পানি বাড়ছে। পদ্মার পানি এখনো বিপদসীমা অতিক্রম না করলেও পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে ১৯ তারিখের মধ্যে এ সীমা অতিক্রম করতে পারে। দুই নদীর পানি একসঙ্গে বাড়ছে। : বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করবে বৃষ্টিপাতের ওপর। ইতিমধ্যে পানি বৃদ্ধির পরিমাণ কমে আসছে। গত দুই দিনে যেখানে ৫০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার বেড়েছিল, সেখানে বেড়েছে ৪০ সেন্টিমিটার। : সাজ্জাদ হোসেন জানান, বাহাদুরবাদ পয়েন্টে পানি বৃদ্ধির পরিমাণ কমেছে। তিস্তায় পানি ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

গত ২৪ ঘন্টায় বন্যায় দিনাজপুরে পানিতে ডুবে, দেয়াল চাপায় এবং সাপে কেটে ১৪ জনের মুত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দিনাজপুর সদরে ৩ জন,বিরলে ৫ জন,কাহারোলে ৪জন,নবাবগঞ্জে একজন এবং বীরগঞ্জে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

রোববার বিকাল সাড়ে ৩টায় কাহারোল উপজেলার ঈশ্বরগ্রামে ভেলা উল্টে একই পরিবারের তিন শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়। বন্যার কারণে ঈশ্বরগ্রাম থেকে কলার ভেলায় চড়ে পার্শ্ববর্তী বিরল উপজেলার হাসিলা গ্রামে নিজ বাড়িতে তিন সন্তান ও প্রতিবেশীর এক সন্তানকে নিয়ে আসছিলেন আবদুর রহমানের স্ত্রী সোনাভান বেগম।

এসময় ভেলা উল্টে একই পরিবারের তিন শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়। এরা হলো- বিরল উপজেলার হাসিলা গ্রাামের আবদুর রহমানের মেয়ে চুমকি (১৩) শহিদ আলী (১০) ও সিয়াদ (৭) এবং প্রতিবেশী সাঈদ হোসেনের ছেলে সিহাদ (৭)।

প্রবল বর্ষণে রোববার সন্ধায় কাহারোল উপজেলার পল্লীতে দেয়াল চাপা পড়ে আরোদা রানী দাস (৫০) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। আরোদা রানী দাস, কাহারোল উপজেলার ৬নং রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের নয়াবাদ দাসপাড়া গ্রামের সুধীর চন্দ্র দাসের স্ত্রী বলে জানা গেছে।

কাহারোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনসুর আলী সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়া বন্যায় রোববার আরও নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। দিনাজপুর শহরের দক্ষিণ বালুবাড়ী এলাকার আবদুল হাকিমের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৪৫) ঘরে বন্যার পানিতে বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যান।

বালুবাড়ী ঢিবিপাড়া এলাকার এনামুল হকের ছেলে মেহেদী হাসান (১৫) তলিয়ে যাওয়া রাস্তার পাশে খালে পড়ে মারা যান। সদর উপজেলার মির্জাপুর এলাকার আবদুল গফফারের ছেলে আবু নাইমও (১৩) বন্যার পানিতে পড়ে মারা যান। সদর উপজেলার দরবারপুর গ্রামের মেহের আলীর ছেলে চাঁন মিয়া (৫৫) আতঙ্কে বন্যার পানিতে পড়ে যান।

বিরল উপজেলার মালঝাড় এলাকার বাবলু রায়ের স্ত্রী দিপালী রায় (৩২) নিজ বাসায় সর্পদংশনে মারা যান।

এছাড়াও আরো একজন সর্পদংশনে এবং দু’জন পানিতে ডুবে মারা গেছে। নবাবগঞ্জে সর্পদংশনে একজন এবং বীরগঞ্জ উপজেলার থানাপাড়া এলাকার মৃত ইসলামের ছেলে জাহাঙ্গীর(৩৪) সেতু থেকে পড়ে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে, দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। জেলার সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভেঙে গেছে দিনাজপুর শহররক্ষা বাঁধসহ বেশ কয়েকটি নদীর বাঁধ। বাড়ি-ঘর ডুবে গিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে জেলার প্রায় সাত লাখ মানুষ। রোববার দুপুর থেকে বৃষ্টি থেমে গেলেও ঢলে নেমে আসা পানিতে নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে বিভিন্ন এলাকা।দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর সদর, বিরল, কাহারোল, বীরগঞ্জ, খানসামা,ঘোড়াঘাট,নবাবগঞ্জ চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর উপজেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ।

পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। গৃহহীন এসব মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন বাঁধ,উচু এলাকা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠনে। জেলার দুই হাজার ৯৩০টি শিক্ষা প্রতষ্ঠানের অধিকাংশই বানভাসী মানুষের আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্ধ রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম।

দিনাজপুর সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুজ্জামান জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা না হলেও বন্যাদুর্গত এলাকায় বানভাসী মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আশ্রয় নেয়ায় সেগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৗশলী ফয়জুর রহমান জানান, জেলার সব নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।পুনর্ভবা নদীর পানি বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার এবং আত্রাই নদীর পানি ৫০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানির তোড়ে শহরের মাহুতপাড়া তুঁতবাগান এলাকায় দিনাজপুর শহররক্ষা বাঁধের ৫০ মিটার ভেঙে গেছে। এছাড়াও দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে নদীর বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

দিনাজপুর শহররক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় সেই বাঁধ সংস্কারে বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। বিজিবি বাঁধটি সংস্কারে ব্যর্থ হওয়ায় দুপুরে বাঁধ সংস্কার এবং বানভাসী মানুষকে উদ্ধারে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। মেজর তৌহিদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের ৫২ জন সদস্য বাঁধ সংস্কার ও বানভাসী মানুষকে উদ্ধারের কাজ শুরু করেছে।

বন্যায় দিনাজপুরের অধিকাংশ সড়ক ও মহাসড়ক পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় দিনাজপুর জেলার সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। হিলি স্থলবন্দর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শনিবার থেকে বন্ধ রয়েছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। পাবর্তীপুর-পঞ্চগড় রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দিনাজপুরে ২৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। যা মৌসুমের সর্বোচ্চ রেকর্ড।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই এক লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ৬৭ মেট্রিক টন চাল বন্যাদুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও বন্যার্তদের জন্য ৫০ লাখ টাকা এবং ৩০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ চেয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম ভেঙ্গে যাওয়া শহর রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করেছেন। বন্যায় দূর্গতদের মাঝে বিতরণ করেছেন ত্রাণ সামগ্রী।

আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Top