আজ : সোমবার, ২১শে আগস্ট, ২০১৭ ইং | ৬ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

পদোন্নতি পুরস্কার পাচ্ছেন ববি’র তেল মর্দনকারীরা!

সময় : ১:১৬ অপরাহ্ণ , তারিখ : ২৩ মার্চ, ২০১৭


বরিশাল॥ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে সিনিয়রদের পাশ কাটিয়ে ভিসি’র অনুসারীদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। আর তাদের নিয়োগ দিতেই সম্প্রতি ১৬টি পদের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এদের মধ্যে উপ-রেজিস্টার, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, সহকারী রেজিষ্টার, সহকারী পরিচালক, সেকশন অফিসার, একাউন্টন্স অফিসার এবং একাউনটেন্ট পদে অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়ার সকল প্রস্তুতি ভিসি সম্পন্ন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ববি’র ক্যাম্পাস সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. এসএম ইমামুল হক যোগদানের পর থেকে পূর্বের ভিসি’র নিয়োগ দেয়াদের সরাসরি বিরুদ্ধাচারণ করে আসছিলেন। ইতিমধ্যে তার রোষানলে পড়া বেশী কিছু কর্মকর্তাকে ডিমোশন দিয়ে রেখেছেন। এমনকি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকিরচ্যুত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাড়িয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা ও সিন্ডিকেট সদস্যরা।
আর ভিসি যোগদানের পর থেকে যারা তাকে তেলমর্দন করছেন তারা আছেন বহাল তবিয়তে। কাজ না করে সারাক্ষণ ভিসি’র তেলমর্ধনেই তারা বেশি সময় দিচ্ছেন। আর তেল মর্ধনের পুরস্কার হিসেবে তাদেরকে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে বলে ক্যাম্পাসের নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। তাদের পদোন্নতি নিয়োগ বিধিতে না পড়লেও ভিসি’র সিদ্ধান্তে তারা পদোন্নতি পাচ্ছেন।
তবে ভিসি’র তেলমর্দনে প্রথম স্থান অধিকারী জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল মাহামুদ রুমিকে সম্প্রতি পুরস্কৃত করেছেন। নিয়োগের বিধি ভঙ্গ করে রুমিকে জনসংযোগ কর্মকর্তা থেকে পদোন্নতি দিয়ে উপ-পরিচালক করা হয়েছে। ওই পদে পদোন্নতি পেতে হলে কর্মস্থলে ৬ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা এবং সাংবাদিকতার সার্টিফিকেট থাকতে হবে। আর পদোন্নতি দেয়ার জন্য সিন্ডিকেট বৈঠক জরুরী। কিন্তু সবকিছু পাস কাটিয়ে শুধুমাত্র তেল মর্দনে পদোন্নতি পেয়েছেন এক সময় জাতীয় একটি দৈনিকের বিজ্ঞাপন সেকশনে চাকরি করা রুমি। এখন রুমি যেভাবে বলে ভিসি সেভাবে সকল কাজ সম্পন্ন করেন বলে ক্যাম্পাসে জনশ্রুতি রয়েছে। আর এ জনশ্রুতিকে কাজে লাগাচ্ছে রুমি। তার বিরুদ্ধাচারণ করা শিক্ষক থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে খারাপ আচরণ করছেন। আর যাদের সাইজ করা প্রয়োজন তাদের বিরুদ্ধে ভিসি’র অপর অনুসারীদের নিয়ে গোপন বৈঠকে বেশী সময় দিচ্ছেন।
তেল মর্দনের পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন ভিসি’র অনুসারী হিসেবে খ্যাত সাজ্জাত উল্লাহ মো. ফয়সাল। ফয়সালকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রন শাখা থেকে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। ওই পদে পদোন্নতি পেতে হলে কর্মস্থলে ৬ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু তার সে যোগ্যতা নেই। ভিসি’র অনুগতদের মধ্যে ‘ভেরী ভেরী গুড’ মার্কিং এ রয়েছেন রেজিস্টার্ড বিভাগের সেকশন অফিসার তামান্না শারমিন। এ কারণে নিয়োগের সকল বিধি পাশ কাটিয়ে সহকারী রেজিস্টার্ড পদে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে তাকে (তামান্না)। আর তামান্নার জন্যই ওই পদটি বিজ্ঞপ্তিতে রাখা হয় বলে ক্যাম্পাস সূত্র নিশ্চিত করেছে। অবশ্য তার ওই পদ পাওয়ার সামান্যতম যোগ্যতা নেই। শুধুমাত্র ভেরী ভেরী গুড মার্কিং পাওয়ায় তামান্নাকে ওই পদটি দিয়ে পুরস্কৃত করছেন ভিসি। তামান্নার যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন’র (ইউজিসি) মুখপাত্র (ফোকাল পয়েন্ট) করা হয়। যা বাংলাদেশে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার থেকে এ পদ এখন পর্যন্ত কেউ পায়নি। এমনকি সিন্ডিকেট সভাসহ ভিসি’র সকল সভায় তার প্রবেশ অধিকার রয়েছে। কিন্তু তামান্না যে পদে চাকরি করেন তাতে করে সিন্ডিকেট সভায় থাকার নিয়ম নেই। তামান্না সিন্ডিকেট সভায় থেকে সেখানে গোপনীয় যত সিদ্ধান্ত হয় তা আগেভাগে বিভিন্ন দপ্তরে জানিয়ে দিয়ে নিজের ক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একই পদে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে প্রটোকল ও লিয়াজো কর্মকর্তা দিদার হোসেনকে। নিয়োগ বিধিতে রয়েছে সহকারী রেজিস্টার্ড পদে পদোন্নতি পেতে চাকরির বয়স ৬ বছর হতে হবে। এছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতাও তাদের নেই। ঢাকাস্থ লিয়াজো অফিসের সেকশন অফিসার মিজানুর রহমানকে সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। ভিসি’র অনুসারী হিসেবে পদোন্নতি পাচ্ছেন একাউন্স ও অডিট অফিসার বরুন কুমার দে। তাকে করা হচ্ছে সহকারী পরিচালক (হিসাব শাখা)।
রফিকুল ইসলাম সেরনিয়াবাতকে গত ভিসি’র আমলে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সুপারিশে শিক্ষকগত যোগ্যতা অনুযায়ী সহকারী কেন্ট্রিন ম্যানেজার পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ওই সময় কেন্ট্রিন শুরু না হলেও নেতাদের সম্মান রক্ষার্থে রফিককে নিয়োগ দিয়ে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেয়া হয়। বর্তমান ভিসি নিয়োগ পাওয়ার পরই তেল মর্দনে তাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেকশন অফিসার হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পদোন্নতি পান রফিক। পরে তাকে স্থায়ী করা হয়। ওই পদে পদোন্নতি পেলে হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা থেকে শুরু করে পেপার বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। কিছুই করা হয়নি।
সাইফুল মল্লিক নিয়োগ পেয়েছিলেন কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে। সেখান থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা। বর্তমানে তাকে স্টোর অফিসার পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। নাদিম মল্লিককে অফিস সহকারী থেকে সেকশন অফিসার পদে পদোন্নতির দেয়া হবে। মো. হাসিবকে প্রশাসনকি কর্মকর্তার পদ থেকে একাউন্টস অফিসার পদে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। তাদের যোগ্যতা ভিসি’র অনুসারী হিসেবে খ্যাতি।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলে সেখানে সরকারের নিয়মানুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা দেয়ার নিয়ম রয়েছে। তা মানা হয়নি। কোন মুক্তিযোদ্ধার কোটা রাখা হয়নি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে। কিন্তু রাজাকারদের পরিবারের সন্তানদের নিয়োগ দেয়া হবে না বলে ভিসি জানিয়ে দিয়েছেন। এ নিয়ে এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। নাম প্রকাশ না করা শর্তে ববি’র একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিনিয়র ও নিয়োগ বিধি পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র ভিসি’র অনুসারীদের পদোন্নতিসহ সকল সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তাদের রাখা হয়েছে চাপের মুখে। এ কারণে তারা নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছেন। কথা বললেই চাকরিচ্যুত অথবা ডিমোশনের ভয় দেখায় ভিসি’র অনুসারীরা। তারা আরো জানান, যারা এখন ভিসি’র অনুসারী তারাই আবার পূর্বের ভিসি’রও অনুসারী ছিলেন। তারা তেলমর্দনে সব আমলেই ভালো করছেন। এ ব্যাপারে ববি’র উপ-পরিচালক (জনসংযোগ শাখা) ফয়সল আহমেদ রুমি জানান, আমাকে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সরাসরি ওই পদ দেয়া হয়নি। ভিসি’র অনুসারীদের নিয়োগের বিষয়ে বলেন, যারা আপনাকে তথ্য দিয়েছে তারাই এ বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন। এরপর তিনি মোবাইলের লাইনটি কেটে দেন।

Top