আজ : শুক্রবার, ২০শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং | ৭ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

দেহব্যবসায় জ​ড়িয়ে প​ড়ছেন অধিকাংশ ছাত্রলীগ নেত্রীরা!


আপনাদের সবার নিশ্চয়ই মনে আছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসীমুদ্দিন মানিক ওরফে রেপিস্ট মানিককে সেঞ্চুরিয়ান জসিমুদ্দিন মানিক বা সেঞ্চুরিয়ান মানিক বলা হতো । কারণ সে ১০০ টা ধষর্ণ কর্ম করে বন্ধুদের নিয়ে ককটেল পার্টি দেয় । ৯৬-২০০১ এ মানিক ছিল একজন , একা আর এবার মানিক অসংখ্য যার চিত্র চরম ভয়াবহ । ছাত্রলীগে মানিকের সংখ্যা এতো বেশি যে যাদের প্রয়োজন মেটাতে ইডেন কলেজের ছাত্রীদের দেহব্যবসায় বাধ্য করা হয়েছিল এবং যে ব্যবসার টাকা ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে দুগ্রুপে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয় । ইডেন কলেজের সেই আলোচিত ঘটনা ও কাহিনী আপনাদের সামনে সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি ।
গত ১৩ ই মার্চ ২০১০ ছাত্রলীগের দুইগ্রুপে দেহব্যবসা নিয়ে সংঘর্ষ হয় … খবরে প্রকাশ….ভর্তির পর ছাত্র-ছাত্রীদের হলে তুলতে ‘সিট বাণিজ্য’ করে ছাত্রলীগ। প্রতিটি সিটে একজন তোলার বিনিময়ে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এবার ইডেন ও বদরুননেসা কলেজে অর্থের বিনিময়ে প্রায় ৫০০ ছাত্রীকে সিটে তোলা হয়েছে। আর এই ঘটনার আড়ালেই জঘন্যতম সত্য জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

ইডেন কলেজে গত ১২ মার্চ ছাত্রলীগের দু’গ্র“প ভর্তিবাণিজ্যের টাকার ভাগ নিয়ে হকিস্টিক, রড, ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। ক্ষোভ জমেছিল ঐ কলেজ শাখার ছাত্রলীগের সভানেত্রীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। এখানে ভর্তিবাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। শুধু এখানেই বা কেন, এই ভর্তিবাণিজ্য পরিব্যাপ্ত হয়েছে প্রায় সকল কলেজে। ছাত্রলীগ নেতাদের পয়সা না দিয়ে কারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আর ভর্তি হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের বিক্ষোভে দ্বিতীয় কারণটি বড় কুৎসিত, বড় বেদনাদায়ক, বড় বিভীষিকাময়। এবার ছাত্রলীগেরই এক পক্ষ আর এক পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে যে, ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ সভানেত্রী প্রধানত প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীদের দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জোরপূবর্ক দেহব্যবসা করিয়ে আসছে। ঐ নেত্রীরা ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের বাসায় এবং রাজধানীর কাকরাইল, গুলিস্তান, এলিফ্যান্ট রোড, মালিবাগ, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের আবাসিক হোটেলগুলোতে তাদের যেতে বাধ্য করে। অভিযোগ আরো অনেক। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও মন্ত্রীদের চরিত্রেরও একটা বহিঃপ্রকাশ এর মধ্যদিয়ে ঘটে গেল। তারা ছাত্রলীগের মহিলা নেত্রীদের দ্বারা তরুণী ছাত্রী সংগ্রহ করে যে ভোগ বিলাসে মেতে উঠেছেন তারও প্রমাণ পাওয়া গেল ইডেন ছাত্রীদের অভিযোগ থেকে।
দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রীদের জোরপূর্বক ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাদের বাসায় নেয়া ছাড়াও রাজধানীর কাকরাইল, গুলিস্তান, এলিফেন্ট রোড, মালিবাগ, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, মীরপুরের আবাসিক হোটেলগুলোতে সংগঠনের জুনিয়র কর্মী ছাড়াও প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীদের বাধ্য করে নিয়ে যাওয়া হতো।
একটি পক্ষ বলছে, কলেজের সভাপতি জেসমিন শামীমা নিঝুম ও সাধারণ সম্পাদক ফারজানা ইয়াসমিন তানিয়াসহ কয়েকজন প্রথম সারির নেত্রী ছাত্রীদের দিয়ে দেহব্যবসা ও ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। আবার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পক্ষ বলছে, যারা ছাত্রীদের দিয়ে দেহব্যবসা করায় তার প্রতিবাদ করায়ই আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।
নিঝুম-তানিয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা কলেজে ভর্তি বাণিজ্য করে। টাকা নেয়, টেন্ডারবাজি করে। নানা ধরনের কাজ বাগিয়ে আনে। বিটিভির স্লট কিনে আয় করছে লাখ লাখ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন তদবির বাণিজ্য করে এ গ্রুপ।

এজন্য তারা ব্যবহার করে নতুন ছাত্রীদের। তাদের দেখানো হয় আগামী দিনের নেতা হওয়ার স্বপ্ন। সচ্ছল হওয়ার স্বপ্ন। এসব স্বপ্ন পূরণের জন্য তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন নেতার বাসায়। বাসাবাড়ি ছাড়াও বিভিন্ন হোটেলে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের বাধ্য করা হয় বিভিন্ন নেতার মনোরঞ্জন করতে। অবশ্য তানিয়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, এসব করি না। এগুলো ঠিক নয়। উল্টো তিনি অভিযোগ তুলেছেন হ্যাপী-শর্মী গ্রুপের বিরুদ্ধে। তানিয়া বলেছেন, ওরা বহিষ্কৃৃত।

ওরাই এসব করে। ওদের একজনের দু’টি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। একাধিক মহিলা হোস্টেল চালায়। সেখানেও বিভিন্ন ছাত্রীদের ব্যবহার করে। নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কাজ বাগিয়ে নেয় তারা। ভর্তি বাণিজ্য আমরা করি না, ওরাই করে। ওদের একজন এমন কোন কাজ নেই যা করে না। আর হ্যাপী মেয়েদের দিয়ে হোস্টেল চালানোর নামে ব্যবসা করে। ওদিকে হ্যাপী বলেছেন, নিঝুম-তানিয়া গ্রম্নপের কর্মকাণ্ডের কারণে আমরা অতিষ্ঠ। তারা প্রিন্সিপালের সঙ্গে মিলেই সব অন্যায় করে। অন্যায় সহ্য করে প্রিন্সিপাল। তারা যা আয় করে সব ভাগ-বাটোয়ারা করে। তারা আমাদের বহিষ্কার করার দাবি করে। তারা তো আমাদের বহিষ্কার করতে পারে না। ওই এখতিয়ার নেই। ওরা এমন কোন কাজ নেই করতে পারে না। শুক্রবার রেশমি ও শ্রাবণী নামে যে দুই ছাত্রীকে নিঝুম ও তানিয়া গ্রুপ মারধর করেছে তাদের দু’জনকে হলে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ। তারা নিখোঁজ থাকার ঘটনায় লালবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইডেন কলেজে এখনও দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। সেখানে পুলিশ প্রহরা রয়েছে। এছাড়াও সাদা পোশাকে রয়েছেন গোয়েন্দারা। কলেজের প্রিন্সিপাল মাহফুজা চৌধুরী ছুটিতে আছেন। ১৫ই মার্চের পর কলেজে যোগ দেবেন। তার অবর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ভাইস প্রিন্সিপাল আয়েশা সিদ্দিকা। তিনি বলেছেন, আমি এসবের কিছুই বুঝতে পারছি না। ঘটনা যা ঘটেছে তাতে বোঝা যাচ্ছে দুই গ্রুপের আধিপত্যের লড়াই। তারা আমাকে তাদের দাবি-দাওয়া কিছু জানায়নি। এর আগেই তারা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, নিঝুম ও তানিয়ার অ্যান্টি গ্রুপের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করতে হবে। এটা এখন চাইলেই করতে পারব না। এটা তাদের পলিটিক্যাল ব্যাপার। আমরা কি করতে পারি? তিনি বলেন, তাদের আধিপত্যের লড়াইয়ের কারণে কলেজের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে।

হ্যাপী বলেন, মিশু নামের এক ছাত্রীকে নিঝুম অফার করেছিল এক নেতার বাসায় নিয়ে যাওয়ার। তাকে দেখানো হয়েছে নানা রকমের লোভ। না যাওয়াতে নির্যাতন করা হচ্ছে। মিশু বলেন, আমি দারুণ হতাশা ও টেনশনের মধ্য আছি। ওরা আমাকে এমন এক নেতার বাসায় নিতে চেয়েছিল যে নেতা খুবই ক্ষমতাশালী। ওই নেতা অনেক কারণেই বিতর্কিত। তার বাসায় যাইনি বলে আমাকে নানাভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার মতো আরও অনেক মেয়েকেই এ ধরনের অফার দেয়া হয়। আমি যাইনি। সবাই তো এক রকম না। আমাকে নানা রকমের লোভ দেখানো হয়। তিনি বলেন, কলেজে অনেক মেয়েই তাদের কারণে নির্যাতিত।

সাংগঠনিক সম্পাদক আফরোজা সুলতানা হ্যাপী বলেন, নিঝুম ও তানিয়ার দাবি, তারা আমাকে ও শর্মীকে বহিষ্কার করেছে। তারা আমাদের বহিষ্কার করতে পারে না। কারণ আমাদের কোন অন্যায় থাকলে বহিষ্কার করবে কেন্দ্রীয় কমিটি। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তারা ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ করে পাঠাবে। নগর কমিটি অনুমোদন দিলে এরপর কেন্দ্রীয় কমিটি আমাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু তারা তা করেনি। তারাই আমাদের বহিষ্কার করেছে। তিনি বলেন, আমরা অন্যায় করলে তারা আমাদের শোকজ দিতে পারে। তা দেয়নি। হ্যাপী বলেন, আমরা শহীদ মিনারে ছাত্রলীগের ব্যানারে ফুল দিতে গিয়েছিলাম- এতে নাকি আমাদের অন্যায় হয়েছে। আমরা ছাত্রলীগ করি, আমরা সেখানে গেছি। কোন অন্যায় করিনি। তিনি বলেন, এটা একটা অজুহাত। প্রধান সমস্যা হচ্ছে নিঝুম-তানিয়া ও কলেজের প্রিন্সিপাল ম্যাডাম এরা তিনজন মিলে ভর্তি বাণিজ্য করে। গত বছর ৭০০, এবার ৯০০ ছাত্রী ভর্তি হয়েছে। চলতি বছরের ৯০০’র মধ্যে আমাদের কমিটির ১৬ জনকে ৪০টা সিট দেয়া হয়েছে। ওই সিট দেয়ার কারণে আমরা বেশির ভাগই নিজেদের আত্মীয় স্বজন ও পরিচিত জনদের ভর্তি করেছি। সেখানে ভর্তি নিয়ে বাণিজ্য করার সুযোগ নেই। অন্যদিকে তারা তিনজনে মিলে ৮৬০ জন ছাত্রী ভর্তি করেছে। কিছু ফেয়ার ছাড়া সবাই তদবিরে হয়েছে। এক একজন ছাত্রীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়েছে। এতে তারা কোটি কোটি টাকা আয় করেছে। ওই টাকার ভাগ বিভিন্ন জায়গায় দিয়েছে। আমরা এই বাণিজ্য বন্ধ করতে চাই। কলেজ তাদের হাতে জিম্মি হয়ে গেছে। তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। নিঝুম-এর ছাত্রীত্ব নেই কলেজে। তারপর সে কলেজে থাকছে এবং কলেজের ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি। প্রকৃতপক্ষে তার স্টুডেন্টশিপ এখন নেই। বিভিন্ন জনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই তিনি কলেজে আছেন। হ্যাপী বলেন, যে সব মেয়ে সুন্দরী, ফিগার আকর্ষণীয়, একটু অভাবী, ঢাকায় থাকার জায়গা নেই ও উচ্চাভিলাষী- ওসব মেয়েকে ওরা টার্গেট করে। এরপর তাদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে তাদের বলে নেয়া হয় তারা নেতার কাছে যাচ্ছেন কাজের জন্য। চল তোমাকে নিয়ে যাই। পরিচয় করিয়ে দেবো, নেতা চিনলে লাভ হবে। নেত্রী হতে পারবে। সেখানে গেলে অনেককেই মাশুল দিয়ে আসতে হয়। তিনি বলেন, অনেক দিন ধরেই কলেজে এসব হচ্ছে।

এদিকে হ্যাপী-শর্মী গ্রুপের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রলীগের বর্তমান সেক্রেটারি তানিয়া। তিনি বলেন, ওরা কলেজ ছাত্রলীগের কেউ নয়। ওরা আমাদের দলের ছিল। এরপরও ওরা শহিদ মিনারে ফুল দিতে গেছে ছাত্রলীগের পাল্টা ব্যানারে। পাল্টা গ্রুপে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়ার কারণেই তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যায় করলে আমাদেরকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তাই আমরা নিয়েছি। তিনি বলেন, আমরা কোন মেয়েকে জোর করে নেতার বাড়িতে নিয়ে যাই না। আমাদের ছাত্রীরা নেতা মানে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা আমাদের দেখতে হয়। আমাদের কর্মী রয়েছে, তাদের আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতেই পারি, নিয়ে যাওয়া মানে এই নয় কিছু হয়। এদিকে ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি চম্পা বলেন, হ্যাপী-শর্মী আমরা একসঙ্গে আছি। সকাল থেকে আমরা বাইরে আছি। কলেজের অবস্থা ভাল নয়। আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। কলেজে দুর্নীতিমূলক কাজ বন্ধ করতে হবে। টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্যসহ সব অন্যায় কাজ বন্ধ করতে হবে। আমরা আমাদের কথাগুলো কলেজের প্রিন্সিপালকে বলতে পারি না। তিনি আমাদের কোন কথাই শুনতে চান না। তারা নিঝুম ও তানিয়ার কথা শোনেন। তারা যেহেতু সভাপতি-সেক্রেটারি তাই তাদের মন যুগিয়ে প্রিন্সিপালকে চলতে হয়। তিনি ওদের অন্যায় কাজের সহায়তা করছেন বলে আমরা অসহায়।

সুত্রঃ সকালের সংবাদ

Top