আজ : বৃহস্পতিবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং | ১৪ই বৈশাখ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

বাঙালির বর্ষবরণে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস

সময় : ৭:০০ অপরাহ্ণ , তারিখ : ১১ এপ্রিল, ২০১৭


ঢাকা: রমনার বটমূলে ছায়ানটের গান-কবিতা বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম প্রধান আয়োজন। পহেলা বৈশাখের সকালে অনুষ্ঠিত এ আয়োজন এবার ৫০তম বর্ষ পূর্তি হচ্ছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতি বছরই হাজির হয়েছি এ উৎসবে। প্রায় প্রতিটি আয়োজনেই দেখেছি দর্শক সারিতে অগণিত তরুণ-তরুণী।

আবার গান-কবিতা পরিবেশনের শিল্পীদের মধ্যেও তারুণ্যের প্রাধান্য। এথেকে বলা যায় এদেশে বর্ষবরণ শুরু হয় তারুণ্যের হাত ধরেই।

ছায়ানটের আয়োজন শেষ হলে রমনার দর্শকরা আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে। এখান থেকে যাত্রা করে বর্ষবরণের আরেক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রা। মূলত চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা মিলে এ শোভাযাত্রার আয়োজন করে আসছেন।

এ শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। বর্ষবরণের দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে থেকে চলে এ শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। চারুকলার শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা চারুকলার সামনে ছবি আঁকেন, শিল্পকর্ম করেন এবং সেসব শিল্পকর্ম বিক্রি করেন মেলায় আগত দর্শনার্থীদের কাছে। এ বিক্রির অর্থ জোগান দেয়া হয় শোভাযাত্রার আয়োজনে।

এ মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বাংলা বর্ষবরণের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, চারুকলার এ মঙ্গল শোভাযাত্রা ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর স্থান পেয়েছে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়ও। এর পেছনেও রয়েছে তারণ্যেরই জয়গান।

কেউ কেউ বলছেন চারুকলার এ মঙ্গল শোভাযাত্রার নামকরণ হয় ১৯৮৯ সাল থেকে। আবার কেউ বলছেন ১৯৯০ সাল থেকে। এরও আগে ১৯৮৮ সাল থেকেই চারুকলায় নানা নামে বর্ষবরণের আয়োজন হয়েছিল। আবার আরেক তথ্যমতে, ১৯৮৬ সালে চারুপীঠ নামের একটি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে।

এসবের পাশাপাশি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পোশাকের মাধ্যমে দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে নানা আয়োজন করে থাকে। এ আয়োজনের পেছনেও অনন্য ভূমিকায় থাকেন ফ্যাশন হাউসগুলোর ডিজাইনাররা।

বিশেষ করে তরুণ ফ্যাশন ডিজাইনাররা নানা ভাবনায় পোশাকের ক্যানভাসে তুলে আনেন দেশের ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির নানা বিষয়। ফ্যাশন ডিজাইনারদের ডিজাইন করা পোশাক সময়ের হাত ধরে এখন বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ খাওয়া বাঙালি সংস্কৃতির কোনো অংশ নয়, তবু একদল সুবিধাভোগী মানুষ বাণিজ্যের খাতিরে পান্তার সঙ্গে ইলিশ খাওয়ার প্রচার ঘটিয়ে ব্যাপক সুবিধা নিচ্ছেন। আর এ ধারণার প্রতিবাদও কয়েক বছর আগে প্রথম প্রকাশ করেছেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে মেডিটেশন কোর্স করা একদল তরুণ।

তারা ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ ১৪২০ সালে পহেলা বৈশাখ পান্তা-ইলিশের পরিবর্তে ‘পান্তাপিয়া’ সংস্কৃতি প্রচার শুরু করেছেন। অর্থাৎ পান্তা ভাতের সঙ্গে তেলাপিয়া মাছ দিয়ে তারা বৈশাখ উদযাপন করেন এবং এর প্রচার চালান। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার হয়েছে ‘বৈশাখে ইলিশ নয়’ ধারণাটি। বৈশাখে এ সচেতনার পেছনেও রয়েছে তারুণ্যেরই অবদান।

চারুকলার সাবেক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, তারুণ্যের ছোঁয়াতেই আসে পূর্ণতা- এটা অনস্বীকার্য। পহেলা বৈশাখে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাও পেয়েছে একই পূর্ণতা। মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন দেশের বর্ষবরণের প্রতীকী রূপ পেয়েছে।

সংস্কৃতিকর্মী আনিতা বলেন, সব ক্ষেত্রেই তারুণ্যের জয়গানেই ভরে ওঠে দেশের প্রাণ। বাংলা বর্ষবরণেও তারুণ্যের জয়গান লক্ষণীয়।

কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সবগুলো স্বদেশী আন্দোলন সফল হয়েছে তারুণ্যেরই হাত ধরে। বাংলা বর্ষবরণের আজকের যে উচ্ছ্বাস, তা-ও সেই তারুণ্যেরই বহিপ্রকাশ। মঙ্গল শোভাযাত্রা, পোশাকের নকশা, মেলার আয়োজন কিংবা গান-কবিতা পাঠ ও নানা আয়োজন তারুণ্যের জয়গান ঘোষণা করছে।

Top