আজ : রবিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

বিএনপি কি বদলাচ্ছে?

সময় : ৪:৩৯ অপরাহ্ণ , তারিখ : ০৫ জুলাই, ২০১৭


আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

গরম কথা বলে নরম পথে চলার নীতি নিয়ে চলছে বিএনপি। এটা খারাপ নয়। এই নীতি নিয়ে চলতে পারলে বিএনপি ভালো ফল পেতে পারে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সম্প্রতি পুলিশের নিষ্ফল অভিযানের পর বিএনপি যেরকমভাবে হম্বিতম্বি করছিল তাতে মনে হচ্ছিল, এবার বিএনপি কিছু একটা করবে। কিন্তু না, মামুলি প্রতিবাদ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলো বিএনপি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতিবাদ সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছিল, পায়নি। ব্যাস, বিএনপি আর কিছু করলো না। এরপর রাঙামাটি যাওয়ার পথে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপর হামলার ঘটনায়ও বিএনপির প্রতিক্রিয়া প্রতিবাদ বিবৃতি আর দেশের কয়েক জায়গায় জনাকতক মানুষের সমাবেশের বাইরে আর কিছু হলো না। ভালো। এইধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে বিএনপির ইমেজ বদলাবে।
রাস্তায় বেরুলে বিএনপি শান্তি পূর্ণ আচরণ করতে পারে না, বিএনপি পথে নামা মানেই অশান্তি, গাড়ি ভাঙচুর, মানুষের দুর্ভোগ –এই ইমেজ থেকে বেরিয়ে আসা বিএনপির জন্য এখন খারাপ না। মানুষের মনে বিএনপিকে নিয়ে গত কয় বছরের ভয়ঙ্কর আন্দোলনের কারণে যে ভীতি তৈরি হয়েছে তা দূর হওয়া দেশের নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থেই জরুরি। বিএনপি হয়তো সে চেষ্টাই করছে।
তবে কথাবার্তায় বিএনপি নেতারা এখনো সংযমের পরিচয় দিতে পারছে কি? তারা হয়তো ভাবেন গরম গরম কথা না বললে তাদের প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়বে না। তাদের এই ধারণায় গলদ আাছে। আমাদের দেশের মানুষ এখন আর রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে কোনো ধরনের হঠকারিতা দেখতে চায় না। সময় বদলেছে। মানুষ এখন মুহূর্তের মধ্যে জেনে যাচ্ছে পৃথিবীর কোথায় কি ঘটছে। কোনো কিছুই গোপন থাকছে না, গোপন রাখা যাচ্ছে না।
শুধু অন্যের সমালোচনা শোনার চেয়ে মানুষ বরং বেশি শুনতে চায় তাদের কথা, তারা ক্ষমতায় গিয়ে কি করতে চায়। আওয়ামী লীগ এখন দেশ চালাচ্ছে। তারা কীভাবে দেশ চালাচ্ছে, কোথায় তাদের সফলতা আর কোথায় ব্যর্থতা সেটা সবাই দেখছে, জানছে।
বিরোধীদলের রাজনীতি যদি হয় কেবল সরকারের সমালোচনা কেন্দ্রিক তাহলে সেসব শুনতে মানুষজন বেশি পছন্দ করবে না। মানুষ বিএনপির কাছ থেকে সেজন্যই সম্ভবত বিএনপির কথাই শুনতে চায়। তারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কি করবে, কীভাবে করবে সেসব যদি বিস্তারিত বলে তাহলে মানুষ তাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে।
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, আমি হঠাৎ বিএনপি নিয়ে এতসব লিখছি কেন। লিখছি, কারণ আমি চাই দেশের রাজনীতি বর্তমান অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসুক। রেষারেষি, হানাহানি না করে রাজনৈতিক দলগুলো দেশের মানুষের সামনে নিজেদের তুলে ধরুক। রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরে আসুক। অস্থিরতা, উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা – রাজনীতি থেকে এসব দূর হোক।
বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ। এদেশের মানুষের প্রাণশক্তির কোনো তুলনা হয় না। জ্বলে পুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়। এই দেশের উত্থান পর্বে যারা দেশটি নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছিলেন, তারা এখন থুতু গিলে মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করছে। অর্থনীতি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াচ্ছে। মানুষের অভাব অনটন কমছে। এখন আর কেউ না খেয়ে মারা যায় না। কেউ যদি এই পরিবর্তন দেখতে না পান, সেটা তার চোখের সমস্যা।
আওয়ামী লীগ দেশকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এই অবান্তর ভাঙা রেকর্ড অব্যাহত ভাবে না বাজিয়ে বিএনপির বরং বলা উচিত তারা গদি পেলে এর চেয়েও ভালো কি করবে, করলে সেটা কীভাবে এবং কোন কৌশলে করবে। আমাদের গদিতে বসিয়ে দাও আমরা উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেবো, এমন ছেঁদো কথায় আার মানুষের আস্থা নেই।
দেশের মানুষ যেহেতু আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির কাছেই নিজেদের সমর্পণ করেছেন, তাই আমরা চাইবো এই দুইদলের কাছে দায়িত্বশীল রাজনীতি, দায়িত্বশীল আচরণ। দেশে যেমন আওয়ামী লীগের সমর্থক আছেন, তেমনি আছেন বিএনপির ভক্ত অনুরাগী দল।
কাজেই এই দুই দলের নীতি, আদর্শ এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ যদি নিজেদের বিএনপির থেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে মানুষ যেমন সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবে, বিএনপির বেলায়ও তাই। আওয়ামী লীগকে সরাতে হলে বিএনপি কোন উন্নততর রাজনীতি নিয়ে অগ্রসর হয় সেটা আমাদের জানতে হবে। বিএনপিকেও তা জানাতে হবে। বিএনপি কি তা জানাতে পারছে?
পুরানা ধারায় চললে হাওয়া যেমনই মনে হোক না কেন বিএনপি মসনদি হতে পারবে না। বিএনপিকে রাজনীতিতে নীতিগত ও কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হবে এবং সেটা সবার কাছে দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। হঠকারিতার পথ পরিহার করছে বলে মনে হচ্ছে।
আরো কিছু পরিবর্তন দেখাতে হবে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রশ্নে। জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর ওপরে স্থান দেওয়ার গোঁয়ার্তুমি বিএনপিকে ছাড়তে হবে। বঙ্গবন্ধুকে ছোট করে বিএনপি কখনোই বড় হতে পারবে না।
যদি বলা হয় আওয়ামী লীগ বিরোধিতাই তো বিএনপি রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। এখন তারা মুজিব বন্দনা শুরু করলে আওয়ামী লীগের কাছে প্রথমেই হেরে যাবে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও বিএনপির বর্তমান অবস্থান বদলালে মিত্র হারানোর আশংকা দেখা দেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির সঙ্গে সমন্বয়ের যে রাজনীতি বিএনপি করছে তা মার খাবে। এটা বিএনপির সমর্থক গোষ্ঠী ভালো ভাবে নেবে না। এতে উল্টো বিএনপির দুর্বল হওয়ার বিপদ দেখা দিতে পারে।
আমার অবশ্য তা মনে হয় না। ভোটের রাজনীতি বিবেচনায় নিয়ে অমন শংকা যারা পোষণ করেন, তারা আরেকটি হিসাব মাথায় নিতে ভুলে যান। আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা আওয়ামী লীগার নন, তারা আবার বিএনপিরও অনেক কিছু মানতে পারেন না। অনেক কিছু বিবেচনা করে তারা বিএনপিকে নয়, আওয়ামী লীগকেই ভোট দিয়ে থাকেন।
বিএনপির রাজনীতিতে নীতি ও কৌশলগত কিছু পরিবর্তন এলে এদের ভোট বিএনপিই পাবে। এজন্য দরকার বিএনপির একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। সাহস করে বিএনপি যদি একবার বৃত্ত ভাঙতে পারে তাহলে রাজনীতিতে সুবাতাস বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিএনপি কি সে সাহস দেখাবে? এতে ঝুঁকি হয়তো একটু আছে তবে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস না থাকলে রাজনীতি করা কেন?
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
[email protected]

আপডেট নিউজ পেতে পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Top