আজ : বৃহস্পতিবার, ২৯শে জুন, ২০১৭ ইং | ১৫ই আষাঢ়, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

রাউধা হত্যায় কাশ্মীরকন্যার সংশ্লিষ্টতা এখনও মেলেনি

সময় : ১২:২৭ অপরাহ্ণ , তারিখ : ১৩ এপ্রিল, ২০১৭


সময় পার হয়েছে দু’সপ্তাহ। এরই মাঝে প্রকাশ পেয়েছে হত্যা না আত্মহত্যার বিষয় নিয়ে নানা গুঞ্জন। ঘটনার দু’দিনের মাথায় ময়না তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে আত্মহত্যা। ১২ দিনের মাথায় আদালতে মামলা হয়েছে হত্যাকাণ্ডের। পরের দিন তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে আত্মহত্যার। আর দু’সপ্তাহের মাথায় স্বদেশি পুলিশ প্রকাশ করছে হত্যাকাণ্ডের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। এমনকি ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলার মতো কোনও কারণ খুঁজে পায়নি পুলিশ বিভাগ।
এদিকে থানায় দায়ের করা অপমৃত্যু মামলার তদন্তও শেষ পর্যায়ে। কেবল ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্ট পেলেই ফাইনাল রিপোর্ট দিতে পারবেন গোয়েন্দা বিভাগের তদন্তকারী কর্মকর্তা। মালদ্বীপের সাগর কন্যা রাউধা আতিফের মৃত্যু রহস্যের বিভিন্ন সময়ের চুলচেরা বিশ্লেষণের সর্বশেষ অবস্থা এমনটাই। নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে রাউধা ডাক্তারি পড়ার জন্য বাংলাদেশের রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
নীল নয়না মডেল কন্যা রাউধা অতিফের মৃত্যুর পাঁচ দিনের মাথায় বাবা ডা: মোহাম্মদ আতিফের অনুরোধে মালদ্বীপ পুলিশ বিভাগের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ রিয়াজ ও সিনিয়র ইন্সপেক্টর আলী আহমেদ ঘটনার তদন্তে আসেন। তারা কার্যক্রম পরিচালনা করেন চারদিন ধরে। এই সময় কালিন তারা এ পর্যন্ত কি পেয়েছেন তা তুলে ধরেন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে।
সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ রিয়াজ দেশটির ইনকান্দার কোশিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানান, তারা রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের অনেক শিক্ষার্থীর পাশাপাশি রাউধার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তবে এখনও তার মৃত্যুতে অস্বাভাবিকতার কোনও আলামত উদ্ধারে করতে পারেননি। ঘটনার পর থেকেই বিষয়টিকে ভিন্নখাতে নেওয়ার প্রচেষ্টার ব্যাপারেও তারা অবগত। সে কারণে এখনও অস্বাভাবিক কিছু খুঁজে না পেলেও তারা ঘটনার আরও বিস্তারিত তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান।
পুলিশ সুপার রিয়াজ রাউধার ২০৯ নং রুমের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, দুই পাল্লার দরোজা বিশিষ্ট ঘর। দুই পাল্লার মধ্যে একটি ফাঁক থাকায় বন্ধ অবস্থাতেও ওই দরজা দিয়ে কক্ষের ভেতরে কী হচ্ছে তা দেখা যায়। ঘরে থাকা ওয়ারড্রবের ভাঙা কাঁচ, আর খাটের যে অংশ ভাঙা ছিল তা তার মৃত্যুর আগের ঘটনা। ঘটনার সময় কক্ষের কোনও জিনিসিপত্র ভাঙা হয়নি। ওইদিন তার কক্ষে কোনও সহিংসতার ঘটনাও ঘটেনি। তবে ২৯ মার্চ রাউধার মৃত্যুর দিনে তার কক্ষের কোনও সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি, যা কারণে সন্দেহের উদ্রেক ঘটিয়েছে। কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙা ছিল এবং ২৫ মার্চ থেকে কয়েকটি ক্যামেরায় রেকর্ডও বন্ধ ছিল।
পুলিশ কর্মকর্তা রিয়াজ নিশ্চিত করেন, রাউধার মৃত্যুর খবর প্রথম জানায় তার বন্ধু সিরাত পারভিন। তিনিই অ্যালার্ম বাজিয়েছিলেন। স্থানীয় পুলিশের মতে, সিরাত অন্য শিক্ষার্থীরা আসার আগেই রাউধার কক্ষ ত্যাগ করেন। ঘটনা বুঝতে পারার পর কয়েকজন শিক্ষার্থী দরজা খোলার চেষ্টা করে। চার দেশের শিক্ষার্থীসহ কলেজের নিরাপত্তা কর্মীরাও দরজা খুলতে চায়। জানা যায়, রাউধা ও সিরাত দু’জনই ঘটনার দিনের রাতে হাসপাতাল গিয়েছিলেন। তবে পুলিশ দাবি করছে, আলাদা আলাদাভাবে তারা হাসপাতাল গিয়েছিলেন এবং সিরাত রাউধার আগেই তার কক্ষে ফিরে আসেন। মালদ্বীপের আরেক শিক্ষার্থী তাকে রুমে ঢুকতে দেখে।
সহকারি পুলিশ সুপার রিয়াজ জানান, রাউধার কারও সঙ্গে কোন বিবাদ ছিল না। তাই কাউকে সন্দেহ করা যাচ্ছে না। রাউধার কিছু বন্ধু তাকে ইনস্টাগ্রামে আনফলো করে। তার মৃত্যুর পর কেউ একজন তার অ্যাকাউন্ট ডিএকটিভেট করে দেয়। একথা নিশ্চিত যে এই কাজগুলো করেছে পুলিশের তদন্তের ফোকাস অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এই বিষয়টিও খতিয়ে দেখবে তারা। ঘটনার দিন রাতে রাউধা মালদ্বীপের আরেকজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ল্যাপটপ ধার করেছিলেন। সেই ল্যাপটপে রাউধা আরেকজনের অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল। পুলিশ মালদ্বীপের শিক্ষার্থীদের আরো জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলেও জানান রিয়াজ।
তিনি বলেন, রাউধার মোবাইল ফোন এখন পুলিশের হেফাজতে। তার এক বন্ধুর সহায়তায় ফোনটি আনলক করা হয়েছে। পুলিশের মতে, রাউধার বন্ধুর দাবি ইন্টারনেটে রেসিপি জানার জন্য তাকে পাসওয়ার্ড বলেছিল রাউধা। পুলিশ বলেছে তারা মোবাইল ফোন থেকে অনেক তথ্য পেয়েছে। মালদ্বীপে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে রাউধার যোগাযোগ ছিল। তার কাছ থেকেও তথ্য নিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা রিয়াজ সবশেষে খোলাসা করেন যে রাউধার ঘাড়ে একটি ক্ষত চিহ্ন রয়েছে। কারণ দুটি স্কার্ফ বেধে ফাঁসিতে ঝোলেন রাউধা। আর বাঁধা অংশের চাপেই তার ঘাড়ে সেই দাগ বসে যায়। এই মৃত্যুতে তারা এখনও কোন আলামত পাননি যেখান থেকে ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড বলা যায়।
রাউধার ঘরে জোর করে ঢুকার কোনও আলামতও পাননি। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, দরজার তালা ভেঙে তার ঘরে প্রবেশ করতে হয়েছিল তাদের। রাউধার পরিবার দাবি করে বান্ধবী সিরাত পারভিনের সঙ্গে রাউধার বিবাদ ছিল। সিরাত রাউধার জুসে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয়। তবে সিরাত পারভিন এইসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। মালদ্বীপের শীর্ষ সংবাদ মাধ্যম মিহারুর অনলাইন সংস্করণে এ খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে রাজশাহী ইসলামী মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে শাহমুখদুম থানায় করা অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক রাশিদুল ইসলাম রাশেদ সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত প্রায় শেষ। শুধু রাউধার ল্যাপটপ ও মোবাইলের ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ময়নাতদন্তের ভিসেরা রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছেন। সেগুলো পেলেই মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হবে। তদন্তে তিনি আত্মহত্যা ছাড়া কিছু পাননি বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

Top