আজ : রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৭ ইং | ৮ই শ্রাবণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বেড়েই চলছে

সময় : ৮:৪০ অপরাহ্ণ , তারিখ : ০৭ জুলাই, ২০১৭


এবি সিদ্দিক :নামমাত্র জরিমানার বিধান থাকলেও তা প্রয়োগ না থাকায় রাজধানীতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বেড়েই চলছে। আকস্মিক হর্নের শব্দ একজন মানুষকে বধির কিংবা বেহুঁশ করে দিতে পারে। অথচ এই অপরাধের জরিমানা মাত্র একশ টাকা। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশের কাছে শব্দ পরিমাপের কোনো যন্ত্র না থাকায় তারাও বুঝতে পারেন না কোন গাড়ি অতিরিক্ত মাত্রার হর্ন বাজাচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দ দূষণ যেকোনো মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও এতে শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও ট্রাফিক পুলিশ, রিক্সা বা গাড়ি চালক, রাস্তার নিকটস্থ শ্রমিক বা বসবাসকারী মানুষ অধিক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের শ্রবণ সীমার স্বাভাবিক মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল। যার বেশি হলে শব্দ দূষণে পরিণত হয় যা থেকে মানুষের শরীরে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। শব্দ দূষণের ফলে মানুষের শ্রবণ ক্লান্তি এবং বধিরতা পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া যে সকল রোগ হতে পারে তার মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, কণ্ঠনালীর প্রদাহ, আলসার, মস্তিষ্কের রোগ, কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস, বদমেজাজ বা খিটখিটে মেজাজ, ক্রোধ প্রবণতা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, রক্তনালীর সংকোচন এবং হার্টের সমস্যা অন্যতম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৬০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে অস্থায়ী বধির এবং ১০০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে স্থায়ী ভাবে বধির করে দেয়। অথচ ঢাকা শহরে শব্দের মাত্রা ধারণা করা হয় ৬০-৮০ ডেসিবেল যা মানুষকে বধির করে দিতে পারে। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে জানা যায়, ঢাকায় যানবাহনের শব্দের পরিমাণ ৯৫ ডেসিবেল, কল-কারখানায় ৮০-৯০ ডেসিবেল, সিনেমা হল ও রেস্তোরাঁতে ৭৫-৯০ ডেসিবেল, যেকোন অনুষ্ঠানে ৮৫-৯০ ডেসিবেল, মোটর বাইকে ৮৭-৯২ ডেসিবেল, বাস এবং ট্রাকে ৯২-৯৪ ডেসিবেল যার সবকটিই মানুষের মস্তিষ্কের বিকৃতি এবং জটিল সব রোগ সৃষ্টি করে। অধিদপ্তরের অন্য এক জরিপে জানা যায়, শয়ন কক্ষে ২৫ ডেসিবেল, ডাইনিং এবং ড্রয়িং কক্ষের জন্য ৪০ ডেসিবেল, অফিসের জন্য ৩৫-৪০ ডেসিবেল, শ্রেণিকক্ষের জন্য ৩০-৪০ ডেসিবেল, লাইব্রেরির জন্য ৩৫-৪০ ডেসিবেল, হাসপাতালের জন্য ২০-৩৫ ডেসিবেল এবং সর্বোপরি ৪৫ ডেসিবেলের বেশি হওয়া উচিৎ নয়। অথচ রাজধানীতে সৃষ্ট শব্দের সীমা স্বাভাবিক সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

ঢাকার রাস্তায় হর্ন/ভেঁপুর শব্দে মনে হয় গাড়ি চালকগণ যেন হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। বিনা প্রয়োজনে হরহামেশাই যত্রতত্র হর্ন বাজানো হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বা সংরক্ষিত এলাকা যেমন মসজিদ, মন্দির, হাসপাতালের পাশের রাস্তাগুলোতেও হর্ন বাজানো বন্ধ করেনা এই চালকগণ। অথচ গাড়ির হর্নের এই বিকট শব্দে চলার পথেই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে যে কেউ। গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ থাকলেও সে নিষেধ মানার সময় নেই চালকদের। এ ব্যাপারে একজন পুলিশ সার্জেন্ট এর সাথে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, গাড়িতে বা বাইকে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ। হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করলে একশ টাকা জরিমানা দিতে হয়। তিনি আরও বলেন, সার্জেন্ট বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে শব্দের মাত্রা পরিমাপের কোন যন্ত্র না থাকায় তারা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারেন না। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত অভিযানে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করা হয় বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শব্দ দূষণের ফলে তারা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন প্রতিদিন। হঠাৎ করে হর্ন বাজানোর ফলে অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাদের মতে, শব্দ দূষণ সমস্যার জন্য নামমাত্র যে শাস্তি বা জরিমাণার বিধান আছে তা দিয়ে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রথমত নামমাত্র শাস্তি বা জরিমানা, দ্বিতীয়ত সে আইনের বিন্দুমাত্র প্রয়োগও নেই বললেই চলে। তাদের মতে, প্রয়োগহীন এই আইন শব্দ দূষণকারীদের অতিরিক্ত শব্দ দূষণে আরো উৎসাহ যোগাচ্ছে। তারা মনে করেন, শব্দ দূষণ রোধে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়িয়ে শব্দ দূষণ রোধ করা সম্ভব। চরকা টেক্সটাইলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মশিউর রহমানের মতে, নিজেরা সচেতন হলে শব্দ দূষণ রোধ করা খুব বেশি কঠিন হবে না। একই প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (প্রসাশন) সুলতানুল আলম বলেন, ‘আমরা আমাদের গাড়ি চালকদের প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনে গাড়ির হর্ন না বাজানোর জন্যে এবং হর্নের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেই। প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ পদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা সবসময় আমাদের গাড়ির চালকদের হর্ন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করি এবং ব্যস্ততার অজুহাতে চালককে ওভার ক্রসিংয়ে উৎসাহ দেইনা।’

হর্নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চালক ও ঢাকাবাসীর ধারণার পরিবর্তনের প্রয়োজন। কোন যানবাহনের রাস্তা সাইড দেয়া বা নেয়ার জন্য হর্ন ব্যবহার ঠিক নয়। বহির্বিশ্বে হর্ন বাজানো মানে সামনের চালকের কোন গুরুতর ভুল তাকে ধরিয়ে দেওয়া। এর দ্বারা মূলত ঐ গাড়ির চালককে অপমান করা হয়। সেখানে আমাদের দেশে বিনা প্রয়োজনেই যত্রতত্র বাজানো হচ্ছে হর্ন । এ ব্যাপারে সুন্দর জীবন সংস্থার সভাপতি এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের শব্দ দূষন নিয়ন্ত্রণ কমিটির সেক্রেটারি সিরাজুল ইসলাম মোল্লা বলেন, বহু আন্দোলন আর প্রতিক্ষার পর সরকার ২০০৬ সালের নভেম্বরে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন পাশ করেছে। কিন্তু আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি বাংলাদেশের অনেক মন্ত্রণালয়, পরিবেশ এবং শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার হচ্ছে। হর্ন বাজানো যেখানে সম্পূর্ণ নিষেধ সেখানে আমরা দেখতে পাই গাড়ি সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকলে বা যানজটে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক চালক অহেতুক হর্ন বাজাচ্ছেন।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ট্রাফিক পুলিশ ইচ্ছা করলেই এটা কমাতে পারে। এক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশকে আরও বেশি সক্রিয় ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। বিশিষ্টজনদের মতে, শব্দ দূষণের কুফল সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করার গুরুদায়িত্ব মিডিয়াকে নিতে হবে। তবেই একটা সময়ের ব্যবধানে সমাজ থেকে এই ব্যাধি দূর হবে।

এবি সিদ্দিক লেখক সাংবাদিক

Top