আজ : বৃহস্পতিবার, ২৯শে জুন, ২০১৭ ইং | ১৫ই আষাঢ়, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

হাওর হারিয়ে এবার গরু নিয়ে কাঁদছে হাওরপাড়ের কৃষক

সময় : ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ , তারিখ : ১০ এপ্রিল, ২০১৭


তাহিরপুর(সুনামগঞ্জ) থেকে : সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় বিশাল হাওর পানিতে থৈ থৈ করছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের পানির চাপে বাঁধ ভেঙ্গে নিমিষের মধ্যেই ডুবে যায় ১৯টি হাওর। এখন এ হাওরের কৃষক পরিবার গুলোর ঘরে ভাত নেই,আছে বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের তাকদার চাপে। তার পরেও সব হাওর হারিয়ে শেষে রয়েছে শেষ ভরসা শনির হাওর।

এ হাওরের কয়েকটি বাঁধের উপর দিয়ে পানি হাওররে প্রবেশ হয়েছে। তাই সবাই সব হারিয়ে শেষ সম্পদ শনির হাওর রক্ষায় বাঁধে কাজ করে যাচ্ছেন তাহিরপুর,বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ সহ তিন উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৩সহশ্রাধিক শ্রমিক স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছে শনির হাওরের বগিয়ানী,লালুরগোয়ালা,ঝালখালি,নান্টুখালি বাঁধে। হাওর থেকে উৎপাদিত বোরো ধান আর গোয়ালের গরু হাওরপাড়ের কৃষক পরিবারের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। এবারও কৃষকের ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সব হারিয়ে এখন গো-খাদ্য সংকট আর পরিবারের আর্থিক অনটন তাড়াতে শেষ সম্ভল চাষাবাদের কাজে ব্যবহ্নত গরু বেঁচে দিতে হচ্ছে পানির দামে। কৃষকেরা গোয়ালের গরুকে নিজের সন্তানের মতোই আদর করে পালন করেছে। ধান গেছে পানিতে এবার গরু হারানোর কষ্টে কৃষক পরিবার গুলো চোখের জল ফেলছে। জানা যায়,মাটিয়ান হাওরটি উপজেলা প্রধান বোরো উৎপাদন সমৃদ্ধ বড় হাওর। এ হাওরে সাড়ে ৩হাজার হেক্টরে অধিক বোরো ধানের চাষাবাদ করেছে ১০টি গ্রামের হাজার হাজার কৃষকগন। গত মঙ্গলবার পানিতে হাওরটি ডুবে যাওয়ায় এ হাওরের কৃষকরা এখন দিশেহারা হয়ে পরেছে। আর একমাত্র জীবন বাঁচার সম্পদ,কষ্টে ফলানো সোনার ফসল পানিতে ডুবে যাওয়া দৃশ্য দেখে তাদের চোখের পানি ঝড়ছে।

এছাড়াও উপজেলার এ পর্যন্ত মহালীয়া,লোবার হাওর,বলদার হাওর,কলমার হাওর সহ ২০টি হাওরের কাচাঁ,আধা পাকা বোরো ধান একবারেই পানিতে তলিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ক্ষয় ক্ষতির পরিমান ১৬হাজারের হেক্টরের অধিক। তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের পূর্ব-দক্ষিণপাড়ের কিষানি জবা রাণী তালুকদার (৪২)। হাওরটির দিকে তাকিয়ে অশ্রæ শাড়ির আঁচলে মুছলেন। নিজ বাড়ির গোয়াল ঘরের সামনে দাঁড়ানো মেয়ে জুঁই ও ছেলে অনুকুলের চোখেও জল। জানতে চাইলে জানান,বাড়ির গোয়ালে বাঁধা ৫টি গরু। গেল বছর হাওরটিতে ২০কিয়ার (১কিয়ার=৩০ শতক) জমি করেছিলেন। সবটুকু জমির ধানই নষ্ট হয়েছিল। এ বছর হাওরের ১৫কিয়ার জমিতে আবারও ধানের চাষ করেছেন। কিন্তু সবটুকু জমির কাঁচা ধানই গলা সমান পানিতে তলিয়ে গেছে।

এ জমি গুলোতে ধানের চাষ করতে আর সংসারের আর্থিক খরচ মেটাতে ৬মাস আগেই ৫টি গরু বিক্রি করেছেন। ঘরে নিজেদের খাবার নেই,যোগাড় হয়নি গরুর খড়ও । ঋণও আছে কিছু টাকা। তাই নিজের চেয়েও বেশী যন্তে রাখা গরু গুলো অর্ধেক দামে বিক্রি করছেন। নয়তো নিজের সঙ্গে উপোস থাকবে গরুও। লোভার হাওরপাড়ের রসুলপুর গ্রামের কৃষক শাহজাহান মিয়ার ৪টি গাভী রয়েছে। গাভীগুলো থেকে তিনি প্রতিদিন ৮থেকে ১০কেজি দুধ পান। এক কেজি দুধ নিজের জন্য রেখে বাকী গুলো বাড়ি বাড়ি বয়ে বিক্রি করেন। মাটিয়ান ও লোভার হাওরে চাষকরা তার ১২কিয়ার জমির কাঁচা ধানই পানিতে তলিয়ে গেছে। গরুর খড়ও সংগ্রহ করা যায় নি। তাই গোখাদ্য সংকট এবং পারিবারিক ব্যয় মেটাতে তিনি ৩টি গাভীই বিক্রি করে দিয়েছে।

মহালিয়া হাওরপাড়ের কৃষক সাহাবুদ্দিন বলেন, গরুর খেড় (খড়) নাই, নিজের ঘরও খাওন (খাবার) নাই। এল্লাই¹্যা (এজন্য) গরু বেইচ্ছা (বিক্রি করে) দিছি। এমন দৃশ্য এখন হাওর পাড়ের প্রতিটি বাড়িতেই। তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুস সালমা বলেন,গত মঙ্গলবার গভীর রাতে মাটিয়ান হাওরের আলমখালি বাঁধটি ভেঙ্গে যায়। এতে করে হাওরটিতে চাষ করা ৩হাজার ২শ হেক্টর জমির কাঁচা ধান সম্পূর্ণ রুপে পানিতে তলিয়ে যায়। তিনি জানান,উপজেলার ১৮হাজার ৪শ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে তুলনামুলক নীচু হাওরাঞ্চলে ১৫হাজার একশত হেক্টর জমিতে এ বছর বোরো ধানের চাষ হয়। এর মধ্যে প্রায় ১২হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে সম্পূর্ণভাবে তলিয়ে গেছে। বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় গবাদি পশুর চরম খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। বাদাঘাট বাজার বনিক সমিতির সাধারন সম্পপাদক মাসুক মিয়া জানান,হাওরডুবির পর থেকেই বাজারে গরুর কেনা বেচার সংখ্যা হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেছে। দামও অনেক কমে গেছে। কৃষকরা বাধ্য হয়েই গরু কমদামে বিক্রি করছেন।

তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন বলেন,আগামি কয়েক বছর হাওরডুবির ঘটনা না ঘটলেও কৃষকদের এ আর্থিক ক্ষতি পোষাতে আর গোয়ালে গরু ভরতে এক যুগ লেগে যেতে পারে।

উপজেলা আ,লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক শফিকুল ইসলাম জানান, হাওরে উৎপাদিত নিজের জমির কাঁচা ধান চোখের সামনে তলিয়ে যাওয়া দেখে কেঁদেছে কৃষক। এবার গোয়ালে যতেœ রাখা গরুর খাবার নেই। এখন নিজের পরিবারের খাবার যোগাতে গরু বাজারে বিক্র করতে হচ্ছে কৃষকদের। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারন সম্পাদক গোলাম সরোয়ার লিটন বলেন,বোরো ধান হারিয়ে হাওর পাড়ের কৃষক পরিবার গুলো গুরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। হাওরের বাঁধ যখন নির্মান করা প্রয়োজন ছিল তখন কারো দেখা যায় নি। নাম মাত্র কাজ হয়েছে বাঁধে তাই হাওরের ভাঁধ ভেঙ্গে পানিতে ডুবে গেছে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান। বাঁধ নির্মানে দায়ীদের বিচার ও ক্ষতিগ্রস্থদের সার্বিক পুর্ণবাসন দাবী জানাই।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, সুনামগঞ্জের হাওর গুলোতে বছরে একটিমাত্র ফসল বোরো ধানের চাষ করেন হাওরপাড়ের কৃষকরা। হাওর ডুবে যাওয়ায় গোখাদ্য সংকট আর পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে এখন গোয়ালের গরু গুলো পানির দামে বিক্রি করছেন কৃষক।

Top