আজ : মঙ্গলবার, ১৪ই আগস্ট, ২০১৮ ইং | ৩০শে শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বেনাপোল সীমান্তে ‘রিট্রেট শিরোমনি ’ যেন দুই বাংলার মিলনমেলা


অমারেশ কুমার বিশ্বাস জেলা প্রতিনিধি যশোর :
বেনাপোল সীমান্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা। দুই দেশের চেকপোস্টের দুই বাহিনীর সদস্যরা মার্চ পোস্ট করে এসে দাঁড়িয়ে যায় নোম্যান্সল্যান্ডের জিরো পয়েন্টে। ঘড়ির কাটায় ঠিক বিকেল ঠিক ৫টা ২০ মিনিট। তার আগে উভয় দেশের দর্শনার্থীরা আলাদা আলাদা গ্যারারিতে বসে পড়েন। এর পর শুরু হয় মার্চ পোস্ট। বিউগলের সেই মধুর সুরে বাংলাদেশ ও ভারতীয় জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু হয় দুই দেশের জাতীয় পতাকা নামানো বা ‘ফ্ল্যাগ ডাউন’-এর আনুষ্ঠানিকতা। এরপর দুই দেশের সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে একজন বিএসএফ সদস্য এসে আরেকজন বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে করমর্দন করলেন। এটি যশোরের শেষ সীমান্ত বেনাপোল চেকপোস্টের প্রতিদিনকার চিত্র। একে বলা হয় রিট্রেট শিরোমনি। যা দেখতে সীমান্তেরর দুই পারে হাজারো বাংলাভাষাভাষি প্রতিদিন এসে ভীড় জমান। তবে দিনের বেলা পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডের পাশে কেউ যেতে না পারলেও বিকেলের পতাকা নামানোর এই নয়নাভিরাম দৃশ্য সকলের জন্যই উন্মুক্ত করে দিয়েছে বিজিবি ও বিএসএফ। অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পতাকা নামানোর এই অনুষ্ঠান অনেকটা দুই বাংলার মিলনমেলায় পরিণত হয়। মাত্র আধা ঘন্টা চলে এ অনুষ্ঠান। এ সময় আমদানি-রফতানিসহ পাসপোর্টযাত্রী চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
বেনাপোলের বাইরে শার্শা, নাভারন, ঝিকরগাছা, ও যশোর থেকে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী জানান, মফস্বল শহরে থাকি। বিনোদনের তেমন কোন জায়গা নেই। তাই মাঝে মধ্যেই খানিকটা বিনোদনের আশায় তারা ছুটে আসেন বেনাপোল স্থলবন্দরের নোম্যান্সল্যান্ডে। পতাকা নামানোর এই মনোরম দৃশ্য দেখে তারা মুগ্ধ হন। পাশাপাশি বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যদের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক দেখে পূলকিত হন তারা।
এদিকে অনেক আদি বাংলাদেশি বর্তমানে ভারতের ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ ও তার আশেপাশের সীমান্তে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। বনগাঁ এলাকায় বসবাসরত এসব আদি বাংলাদেশিদের বেশিরভাগেরই বাড়ি ছিল যশোর, নড়াইল ও এর আশপাশের অ লে। তবে ভিসা জটিলতার কারণে অনেকে সবসময় বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করতে না পারলেও বাংলাদেশের খবর জানতে তাদের মধ্যে আগ্রহের কোন কমতি নেই। প্রিয় মাতৃভূমির প্রতি এই টান থেকেই তারা প্রতিদিন ছুটে আসেন বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে। পতাকা নামানোর অনুষ্ঠান দেখতে এসে তারা বাংলাদেশের মাটি ছুঁয়ে সালাম করেন, কেউবা আবার বাংলাদেশে ফেলে আসা স্বজনদের কথা মনে করে অশ্রুজলে মুখ ভাসান। অনেকেই হাত নেড়ে ইশারায় কথা বলেন স্বজনদের সঙ্গে। যেকোন বিশেষ দিনে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভীড় সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খান বিজিবি সদস্যরা।
বেনাপোল চেকপোস্টের বিপরীতে ভারতের পেট্রাপোল সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশন ওয়েলফেয়ার এর সাধারন সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, কলকাতাসহ উত্তর ২৪ পরগনা দক্ষিন ২৪ পরগনা জেলার মানুষসহ বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ বাংলাদেশ-ভারতের এ অনুষ্ঠান দেখতে প্রতিদিন বিকালে ভিড় জমায়। বিএসএফ ও বিজিবি দর্শনার্থীদের দাঁড়িয়ে থেকে অনুষ্ঠান উপভোগ করার দিক বিবেচনা করে নোম্যান্সল্যান্ডের দুই পাশে দুটি অত্যাধুনিক গ্যালারী নির্মান করেছেন। এখন তারা বসে সুন্দর ভাবে এ অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
বেনাপোল চেকপোস্টের বাসিন্দা মিলন খান জানান, বিজিবি-বিএসএফের এই হয় ‘রিট্রেট শিরোমনি’ অনুষ্ঠান দেখতে বেনাপোল ছাড়াও অন্যান্য এলাকার লোকজন অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে এখানে আসেন। আগে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এ অনুষ্ঠান উপভোগ করলেও এখন দুই পাশে বিজিবি ও বিএসএফের গ্যালারি নির্মাণ করায় তারা সাচ্ছন্দে বসে এ অনুষ্ঠান দেখতে পাচ্ছেন। দু‘দেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও আসেন এখানে। মাঝে মাঝে নাচ গানেরও আয়োজন করা হয়। তখন লোক জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হয় বিজিবি সদস্যদের।
এ ব্যাপারে বিজিবির বেনাপোল চেকপোস্ট কোম্পানি কমান্ডার হারাধন বলেন, বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে উভয় দেশের সৈনিকরা এক যোগে সকাল এবং বিকালে কুচকাওয়াজ ও পতাকা উত্তোলন করে। এটা দেখার জন্য উভয় দেশের দর্শনার্থীরা প্রতিদিন বিকালে এখানে শত শত দর্শকদের উপস্থিতি হয়। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে সৈনিকদের এ অনুষ্ঠান দেখতে হয় উপস্থিত দর্শনার্থীদের। সীমান্ত এলাকার মানুষ ছাড়া দুর দুরান্ত থেকে দু‘দেশের অনেক পর্যটক আসে এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য। সীমান্তে ‘রিট্রেট শিরোমনি’ বা ফ্ল্যাগ ডাউন’ অনুষ্ঠানটি দর্শনার্থীরা যেন সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারেন সেজন্য ঢাকার একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দিয়ে বেনাপোল নোম্যান্সল্যান্ডে একটি অত্যাধুনিক গ্যালারি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে সাধারন মানুষের জন্য আসন রয়েছে ৩০০ আর ভিআইপি গ্যালারির আসন সংখ্যা রয়েছে ২০টি। ভারতীয় বিএসএফও একটি গ্যালারি নির্মাণ করেছেন। যেখানে বসে থেকে এ অনুষ্ঠান সবাই উপভোগ করতে পারছে।

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ...
Top