২০ বছর ভ্যান চালিয়ে জমাকৃত টাকায় পবিত্র হজ্ব পালন

হজ্ব আরবী শব্দ, যার আবিধানিক অর্থ অভিপ্রায় বা সংকল্প। হজ্বের প্রস্তুতি মুসলমানদের ওপর ফরজ ইবাদত সমূহের অন্যতম।ফরজ অর্থ অবশ্যই করণীয় যা আল্লাহর হুকুম বা নির্দেশ। আল্লাহর এই হুকুম পালনের অভিপ্রায়ে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের উত্তর বাসুদেবপুর গ্রামের মোঃ মোজাফ্ফর হোসেন (৫৫) দীর্ঘ ২০ বছর ভ্যান চালিয়ে জমাকৃত টাকায় পবিত্র হজ্ব পালন করেছেন। মোজাফ্ফর হোসেন জানান, ৩০ বছর ধরে তিনি ফুলবাড়ী পৌর শহরসহ আশপাশ এলাকায় ভ্যান চালাচ্ছেন। এরই মধ্যে ঈমান ও আমলের সহিত পবিত্র হজ্ব পালনের ইচ্ছা শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে গত ২০ বছর ধরে তিনি পৌর শহরের নুরলের তেলের দোকানে হজ্বের উদ্দ্যেশে টাকা জমাতে শুরু করেন। একসময় সেই অর্থ ২ লক্ষ ৩০ (ত্রিশ) হাজার টাকায় পৌঁছালে তা দিয়ে তিনি হজ্বের প্রস্ততি সম্পন্ন করেন।

২০১৫ সালে আল্লাহর হুকুম পালনের তাগিদ এবং কা’বা শরীফ জিয়ারতের আবেগ নিয়ে ইমন ট্রাভেলস্ এর মাধ্যমে ২ (দুই) লক্ষ ১০ (দশ) হাজার টাকায় মোজাফ্ফর হোসেন হজ্ব পালন করেছেন।পারিবারিক জীবনে মোজাফ্ফর হোসেনের ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে সন্তান রয়েছে বলে জানা যায়। স্থানীয়রা জানান, আলহাজ্ব মোজাফ্ফর হোসেন ইসলামের অদম্য সাহসী যোদ্ধা। লোভ লালসাকে উর্দ্ধে রেখে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, আনুগত্য ও ঈমানী শক্তিতে তার যে দৃঢ়তা আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে তা পূর্ণ হয়েছে। মুসলমানমাত্রই কাবা দেখার আজন্ম ইচ্ছা লালন করেন: শারীরিক ও আর্থিক দিক থেকে সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর হজ ফরজ হলেও হজ পালনের আকাক্সক্ষা লালন করেন সবাই। মুসলমানমাত্রই বায়তুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘর কাবাঘর নিজ চোখে দেখা এবং সেই ঘর তাওয়াফের তীব্র বাসনা পোষণ করেন। যে কাবাঘরের দিকে মুখ করে প্রতিদিন নামাজ আদায় করেন সেই ঘরকে সরাসরি সামনে রেখে নামাজ আদায় এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজেকে সমর্পণ, তাঁর ঘরের সামনে বসে তাঁরই কাছে প্রার্থনার অনুভূতিই আলাদা! এজন্য অনেকে হজে যাওয়ার জন্য অর্থ সঞ্চয়ও করেন। অবশেষে আজন্ম লালিত ইচ্ছার বাস্তব রূপ দিতে হজে গমন করেন।

হজে যাওয়ার পর তার মুুখের অন্যতম ভাষা হয়ে দাঁড়ায়- ‘লাব্বায়িক আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক…’ অর্থাৎ হে আল্লাহ আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি তোমার দরবারে হাজির…! এভাবে একজন হাজী কাবা শরিফ তাওয়াফ, সাফা মারওয়া সাই, মিনা, মুজদালিফা ও আরাফাতের ময়দানে অবস্থানসহ অন্যান্য কার্যাদির মাধ্যমে হজ পালন করেন। এভাবেই তার আজন্ম লালিত বাসনা পূরণ করেন। নিজেকে মহান আল্লাহ তায়ালার ঘনিষ্ঠ করার আধ্যাত্মিক দীক্ষা নিয়ে ফেরেন। যার ওপর শরিয়ত অনুযায়ী হজ ফরজ হয়ে দাঁড়ায় না তিনিও হজ পালন করতে পারেন। যেভাবেই হোক কেউ হজ পালন করলে সেটা আদায় হবে এবং ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মতে সেই অবস্থায় সেটা নফল হিসেবে আদায় হবে। তা ছাড়া যারা একাধিকবার হজ পালন করেন তাদের ক্ষেত্রেও বাকিগুলো নফল হিসেবে গণ্য হবে। হজ ফরজ। ইসলামের পাঁচটি রোকন বা স্তম্ভের মধ্যে পঞ্চম। নবী করীম সা: থেকে এ পর্যন্ত হজ ফরজ হিসেবে পালন হয়ে আসছে। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী হজ অস্বীকার কিংবা একে অন্য নামে আখ্যায়িত করা কুফরি। কাবাঘর জিয়ারাতের মাধ্যমে হজ পালনের নিয়ম আবহমান কাল থেকে চলে আসছে। ইসলামে হজ ফরজ হওয়ার আগে ভিন্ন যুগে বিভিন্ন নিয়মরীতিতে হজ পালিত হয়েছে। রাসূল সা:ও আগে কোরাইশদের রীতি অনুযায়ী হজ পালন করেছেন বলে কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়।

ইসলামে হজ কখন ফরজ হয় তা নিয়ে ইমামদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে। আলেমদের একটি অংশের মতে, রাসূল সা:-এর হিজরতের আগেই হজ ফরজ হয়। তবে পরিবেশ না থাকায় তখন সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। বেশির ভাগ ইসলামী বিশেষজ্ঞের মতে, হিজরতের পরে হজ ফরজ হয়। হিজরতের পর কখন ফরজ হয় তা নিয়ে অবশ্য মতভেদ আছে। নেসাব পরিমাণ মালের অধিকারীর ওপর যেমন জাকাত ফরজ তেমনি হজে যাওয়ার আর্থিক ও শারীরিক ক্ষমতা রাখেন এমন প্রাপ্ত বয়স্ক স্বাধীন মুসলমানের ওপর একবার হজ করা ফরজ। নামাজ রোজার মতো সবার ওপর হজ ফরজ নয়। হজ ফরজ হওয়া মাত্র আদায় করতে হবে নাকি দেরিতে অর্থাৎ সুবিধাজনক সময় আদায় করা যাবেÑ এ নিয়েও ইসলামী শরিয়ত বিশেষজ্ঞ তথা ইমামদের দুই ধরনের মত রয়েছে। প্রথম মত হচ্ছে : হজ ফরজ হওয়ার সাথে সাথে আদায় না করে দেরিতে আদায় করার অবকাশ আছে। এই মত দিয়েছেন ইমাম আবু হানিফা, শাফেঈ, সুফিয়ান সওরি। দ্বিতীয় মত : হজ ফরজ হওয়ার সাথে সাথেই আদায় করতে হবে। ইমাম মালিক, আহমদ, আবু ইউসুফ এই মত দিয়েছেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*