আজ : সোমবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

৯ বছর শেষ হয়নি বিডিআর বিদ্রোহের বিচারপ্রক্রিয়া


নৃশংস বিডিআর বিদ্রোহের ৯ বছর আজ। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর পিলখানায় বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) উচ্ছৃঙ্খল জওয়ানদের শুরু হওয়া বিদ্রোহ ৩৬ ঘণ্টা পর অবসান হলেও বিডিআর সদর দপ্তরটি পরিণত হয় এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। সস্ত্রীক বাহিনী প্রধান ও ঊর্ধ্বতন ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ এতে নিহত হন ৭৪ জন।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর পিলখানায় বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) দরবার হলের ওই ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা জাতি। সচকিত হয়ে পড়ে পুরো দুনিয়া। রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের পর বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুনর্গঠন করা হয়। নাম বদলের পর এ বাহিনী এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সংক্ষেপে বিজিবি হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে বদল করা হয় বাহিনীটির পোশাক ও লোগো। ওই বিদ্রোহের ঘটনায় চাকরিচ্যুত করে ১০ হাজার জওয়ানকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়। মামলায় দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ১৫২ জনকে ফাঁসি, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন বিশেষ আদালত।

আসামি সংখ্যার দিক থেকে এটি ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মামলা। পরে এ মামলার আপিলের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ আসামির মধ্যে ১৩৯ জনের ফাঁসির রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট। আটজনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও চারজনকে খালাস দেওয়া হয়। গত বছরের নভেম্বরে বিচারপতি শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। ৯ বছর আগের ওইদিন বিডিআর সদর দপ্তরে ছিল বাহিনীটির বাৎসরিক দরবার (বৈঠক)। সকাল ৮টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ৯টায় দরবার শুরু হয়। আগে থেকে অপেক্ষমাণ দরবার হলে ৯টায় প্রবেশ করেন বিডিআরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ। এ সময় নিয়মানুযায়ী, তার কাছে ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিবুল হক দরবার প্যারেড হস্তান্তর করেন। তারপর ডিজি ও ডিডিজি মঞ্চে নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করেন।

এরপর বিডিআরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমামের কুরআন তেলাওয়াতের পর দরবারের সবাইকে সম্ভাষণ জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন মেজর জেনারেল শাকিল। তিনি আগের দিনের প্যারেডের প্রশংসাও করেন। এরপর তিনি ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কার্যক্রম প্রসঙ্গে কথা তোলার এক পর্যায়ে সকাল ৯টা ২৭ মিনিটের দিকে দরবার হলে ঢুকে পড়ে একদল বিদ্রোহী জওয়ান।
প্রথমে অস্ত্র হাতে প্রবেশ করেন সিপাহী মইন। মেজর জেনারেল শাকিলের দিকে অস্ত্র তাক করলে পাশের কর্মকর্তারা মইনকে নিরস্ত্র করতেই ‘জাগো’ স্লোগানের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে অন্য জওয়ানরা। এক পর্যায়ে শুরু হয় গুলিবর্ষণ।

বিদ্রোহীদের সামাল দিতে বের হলে কর্নেল মুজিব, লে. কর্নেল এনায়েত আর মেজর মকবুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অপরদিকে, দরবার হলের ভেতরে অবস্থানরত সেনা কর্মকর্তাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা। প্রাণ বাঁচাতে এদিক-সেদিক পালিয়ে যাওয়া সেনা কর্মকর্তাদের খুঁজে খুঁজে গুলি করা হয়। দুপুরের আগেই হত্যা করা হয় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে। এ সময় হত্যা ও নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারও।

সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার পর কয়েকটি মৃতদেহ নর্দমার ম্যানহোলে ফেলে দেওয়া হয়। দরবার হলের সামনে থেকে দুপুর ১টার দিকে বাকি মৃতদেহগুলো ট্রাকে করে নিয়ে দুটি গর্ত খুঁড়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। বিদ্রোহের পর পুরো পিলখানায় চলছিল গুলিবর্ষণ। সকাল থেকেই স্থানীয় সংসদ সদস্য আর জনপ্রতিনিধিরা বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করছিলেন। দুপুরের মধ্যে পিলখানার চারপাশে সশস্ত্র অবস্থান নেয় সেনাবাহিনী।

বিকালে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সন্ধ্যায় একটি হোটেলে বিদ্রোহী জওয়ানদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে চলে দফায় দফায় বৈঠক।

এরপর রাত ১টার দিকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি দল পিলখানার ভেতরে প্রবেশ করে। বিডিআরের কিছু সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করেন। ভোরে কয়েকটি পরিবারকে উদ্ধারও করেন তারা। অবশ্য, তখনো থেমে থেমে চলছিল গুলিবর্ষণ। পরদিন সকাল থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় পিলখানায় আটকে পড়া মানুষদের।

দুপুরে বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ করলে চারপাশে অবস্থানরত সেনাবাহিনী ঢুকে পড়ে ভেতরে। সঙ্গে পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেডসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা প্রবেশ করে। ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পিলখানা থেকে ৫৭ সেনা কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে বিডিআরের নাম, পোশাক, লোগো ও সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড আইনে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা রাখা হয় মৃত্যুদণ্ড।

Top