আজ : সোমবার, ১১ই ডিসেম্বর ২০১৭ ইং | ২৭শে অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধ হলে কেন সৌদি আরবকে ছাড় দেবে না ইরান?


সকল নিউজ আপডেট পেতে পেইজে লাইক দিন

মাত্র তিনটি ঘটনা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিয়েছে। বলা চলে উত্তেজনার বিস্তৃতি ঘটেছে। পরিস্থিতি এখন যুদ্ধংদেহী। ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে লেবানন। তাকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে সৌদি আরব ও ইরান। অন্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজ বলয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে দেশ দুটি। তিন ঘটনার প্রথমটি হলো, হঠাৎ করে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি তার ক্ষমতার লাগাম আরও বৃদ্ধি করেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের নামে রাজপুত্র, মন্ত্রী ও ধনকুবেরসহ ৩ শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আটকের পর কারাগারে পাঠান। শুধু তাই নয়, সরকারিভাবে তাদের গোটা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

এরই মধ্যে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ বিমানবন্দর লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়ে মারে। তবে আকাশেই সেটি ধ্বংস করার দাবি করে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

ঘটনার তিন দিন পর ৬ নভেম্বর সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের দাবি করেন, ‘এই মিসাইল ইরানের। আর সেটি নিক্ষেপ করেছে হিজবুল্লাহ।’ তার এই দাবিকে আরও জোরাল করেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেন।

উপরের দুটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৪ নভেম্বর রিয়াদে বসে পদত্যাগের ঘোষণা দেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সা’দ আল-হারিরি।
হারিরি অভিযোগ করেন, তিনি প্রাণ হারানোর ভয়ে আছেন। আর ইরান ও হিজবুল্লাহ দ্বারা তিনি আক্রান্ত।

এরপরই মূলত ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা। সৌদি আরব ও কুয়েত লেবানন থেকে তাদের নাগরিকদের জরুরি ভিত্তিতে দেশে ফেরার নির্দেশ দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইয়েমেনের মতো লেবাননেও সৌদি জোট হামলা করতে যাচ্ছে।

ইরানও বসে নেই। তারা জানিয়েছে, সিরিয়ায় সামরিক ঘাঁটি গড়তে যাচ্ছে তেহরান। সেটি হলে সেখান থেকেই হয়তো সৌদি আগ্রাসনের জবাব দেবে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ট দেশটি।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি ও শিয়া মতালম্বী দুই শক্তিধর দেশ সৌদি আরব এবং ইরান পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।

অবশ্য বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশ দুটি বিভিন্ন ইস্যুতে প্রক্সি যুদ্ধ করে আসছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইরানই বিজয়ী হয়েছে। তাছাড়া দেশটি প্রতিরোধ যুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্র সমৃদ্ধ হয়েছে বলেই আশঙ্কা বোদ্ধাদের।

২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনে ইরাকে সুন্নি মতালম্বী সাদ্দাম হোসেন সরকারের পতন ঘটে। এরপর কেটে গেছে বহু বছর। এরই মধ্যে এ বছর মহররম উপলক্ষ্যে লাখ লাখ শিয়া অনুসারি ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরে জড়ো হয়েছিলেন। এদের মধ্যে বহু মানুষ এসেছিলেন ইরান থেকে। তাদের কণ্ঠে শোনা গেছে, দুই দেশের ঐক্যের সুর। এখন জনগণের এই ঐক্যকে তারা সরকারি পর্যায়ে দেখতে চান।

কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে ইরানের এই শক্তি কাজ লাগাবে তেহরান। এছাড়া সম্প্রতি ইরান ও ইরাকের সেনাবাহিনীর সদস্যরা যৌথ মহড়া দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের পৃষ্ঠপোষকতা এবং হিজবুল্লাহর সরাসরি সহায়তায় দীর্ঘদিন মার্কিন জোটের হামলার মুখেও সিরিয়ায় নিজের রাজত্ব টিকিয়ে রেখেছেন বাশার আল আসাদ।

রাশিয়ান বিমান বাহিনী ইরান এবং ইরানের সৈন্যদের সামরিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে। ফলে সৌদি জোটের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে সিরিয়া থেকে আইএস এবং আসাদের বিদ্রোহীদের ফেরত আসতে হচ্ছে।

২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হামলা শুরু করে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মানসুর আল হাদি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সৌদি সরকার এই হামলা শুরু করে। তারা আশা করেছিল, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এখানে বিজয় আসবে। ইতোমধ্যে সৌদি জোটের এই হামলায় কয়েক লাখ সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। কিন্তু, হুথি বিদ্রোহীদের শিয়া মতালম্বী ইরান সহায়তা করায় সেখানে সৌদি জোটের বিজয়ের সম্ভাবনা সুদূর পরাহত বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি ইরানকে সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তু করার কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান। বার্তাসংস্থা ইরনা খবর দিয়েছে, দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি গত বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেছেন, ‘যদি আপনি (সৌদি আরব) অভ্যন্তরীণ সমস্যা মনে করেন, তাহলে নিজেরা নিজেরটা সমাধান করুন। কেন নিজের সমস্যা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে ফায়দা লুটতে চাচ্ছেন? কেন আরেকটি দেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন?’
রুহানির এই বক্তব্য বলে দেয়, ইরান প্রক্সি যুদ্ধ থেকে সরাসরি সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতেও কোনো দ্বিধা করবে না।

তেহরান যে আধুনিকতায় বদলে যাওয়ার ঘোষণাকারী সৌদি আরব, তার সেনাবাহিনী এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তার অস্ত্রকে পরোয়া করছে না, সেটিও স্পষ্ট।

এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ইরান কি সত্যিই পবিত্র শহর মক্কা ও মদীনাতে হামলা করবে? এই দুটি পবিত্র স্থানকে ইসলামের জন্মভূমি বলা হয়ে থাকে এবং সমস্ত মুসলিমরা শহরগুলোকে সম্মানের চোখে দেখে থাকে। অবশ্য এ বিষয়ে ইরান তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেনি।

নাইন-ইলেভেনের পর ইরানের ওপর রীতিমত ঝড় বইয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নানা অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান এখন সিরিয়া এবং লেবাননের উত্তম প্রতিবেশী। তারা নিজেদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেও বলে বিশ্ব শক্তিদের ধারণা। সবচেয়ে বড় বিষয় ২০১৫ সালের পর থেকে ইরান রাশিয়ার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছে। তারা দেশটির থেকে পরমাণু কর্মসূচিতে সব ধরনের সহায়তা নিচ্ছে।

সহসাই রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তেহরান সফরে যাবেন। এর সঙ্গে আশা হয়ে দেখা দিয়েছে, ১৯৭৯ সালের পর ফ্রান্সের কোনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও তেহরান সফরে যেতে পারেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ তার ইউরোপ সফরের সময় এই কূটনীতিক সম্পর্ক জোরদার করেছেন।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার শক্তিমত্তা অর্জন ও প্রভাব বিস্তারের সঠিক পথেই রয়েছে। এমতাবস্থায় সৌদি আরব সরাসরি সামরিক অভিযান চালালে তারাও ছেড়ে কথা বলবে না। সত্যিই যদি যুদ্ধ বেধে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি নেমে আসবে।

যে আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসেন করেছেন। তিনি লেবাননের প্রক্সি যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশটির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন তিনি।

এছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব আন্থোনিও গুতেরেসও সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, এই অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনবে।

Loading...

আরও পড়ুন...
Top