আজ : মঙ্গলবার, ১২ই ডিসেম্বর ২০১৭ ইং | ২৮শে অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ব্যাংকিংখাত এখন কোমায়!!


সকল নিউজ আপডেট পেতে পেইজে লাইক দিন

বলা হয়, দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মাধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু একটি দেশের উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি অর্থনীতি। আর অর্থনীতির হৃদপিণ্ড বলা হয় ব্যাংকিংখাতকে। দেশের সেই হৃদপিণ্ডে গত ১০ বছর ধরে রক্তক্ষরণ চলছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পুরো ব্যাংকিংখাত এখন কোমায় বললেও অত্যুক্তি হবে না।

হলমার্ক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের কথা সবারই জানা। সরকারি বেসিক ব্যাংকের লুটপাটও পুরোনো ইতিহাস। ঋণ বিতরণে দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ খেলাপির কারণে ধ্বংসের শেষ সীমায় আছে কৃষি ব্যাংক। এছাড়াও সরকারি অন্য ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা পর্ষদে রদবদলের কারণে অর্থ হরিলুটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অপরদিকে সব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান- বাংলাদেশ ব্যাংকের রিভার্জ চুরি এবং বার বার ব্যাংকটির কেন্দ্রীয় অফিসে আগুন লাগার ঘটনায় সরকারি ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়েছে অনেক আগেই। যাদের লুটপাটের উদ্দেশ্য নেই, এমন সাধারণ মানুষ না ঠেকলে এসব ব্যাংকে এখন আর যান না বললেই চলে।

কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও আস্থাহীনতা ও চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও মাফিয়া গ্রুপের হাতে বেসরকারি ব্যাংকগুলো চলে যাওয়ায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকই এখন ধ্বংসের দ¦ারপ্রান্তে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স ও জোর করে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের কারণে এমন অবস্থা দেখা দিয়েছে। সেই সাথে স্বার্থান্বেষী মহলের ভূমিকাও রয়েছে। এতে গোটা ব্যাংকিংখাতের প্রতিই আমানতকারীসহ দেশবাসীর আস্থা নষ্ট হচ্ছে। ব্যাংকিং লেনদেন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন অনেকে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ১০ বছর আগে ব্যাংকের অর্থ এভাবে লুটপাটের কথা কেউ চিন্তাও করেনি। কিন্তু ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর শেয়ারবাজার ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ লুটপাট শুরু হয়। সেই সাথে রাজনৈতিক বিবেচনায় চলতে থাকে নতুন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান ও ব্যাংকগুলোতে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলে ব্যাংকের সংখ্যা ৫৭টি। এর মধ্যে অধিকাংশ ব্যাংকই ক্ষমতাসীন দলের কোনও না কোনও পর্যায়ের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে।

সূত্র বলছে, বর্তমান সরকারের সময়েই ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে। ঘটেছে একের পর এক অস্বাভাবিক বড় কেলেঙ্কারি। যেমন সোনালী ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি ইত্যাদি। কেলেঙ্কারির হাত থেকে বাদ যায়নি শেয়ারবাজারও। শেয়ারবাজারে দু’বার কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই। অতি সম্প্রতি সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এর আগে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মালিকানা দখল আরেকটি বিশেষ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

ইমেজ সংকটে ইসলামী ব্যাংক

সূত্র বলছে, ইসলামী ব্যাংক দেশের অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। যদিও মালিকানা পরিবর্তনের পর ব্যাংকটি নানা অপকর্মে জড়িয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে তারল্য সংকটও। সরকারের পছন্দের লোকেরা ব্যাংকটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বগ্রহণের পর স্বার্থ নিয়ে দু’টি পক্ষ দ্বন্দ্বে জড়ায়। এতে একটি পক্ষকে সরে যেতে হয়। ফলে ব্যাংকটির ওপর একটি গ্রুপের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকেরা অনেকেই ব্যাংকটি থেকে তাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে নিচ্ছেন। কমে গেছে এর রেমিট্যান্স সংগ্রহও। ব্যাংকটি জামায়াতমুক্ত করার নামে গ্রাহকদের কাছে আস্থাহীন হয়ে পড়েছে।
সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক দখল

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডও (এসআইবিএল) এখন একটি বিশেষ গ্রুপের দখলে চলে গেছে।

গত ৩০ অক্টোবর এসআইবিএল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন হয়। ওইদিন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) হঠাৎ পদত্যাগ করতে হয়েছে। রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ারুল আজিম আরিফ। নতুন এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত এমডি কাজী ওসমান আলীকে। এ ছাড়া নির্বাহী কমিটির নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল আহমেদ।

ব্যাংকটির মালিকানা পরিবর্তনের পর গত ৩১ অক্টোবর সকালে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান আনোয়ারুল আজিম আরিফ ও নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী ওসমান আলী প্রধান কার্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। তারা ওইদিন বেলা ১টার দিকে প্রধান কার্যালয় থেকে বের হন। বেলা দেড়টার পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বর্তমান চেয়ারম্যান আরাস্তু খানসহ বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যালয়ে গিয়ে গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে দেখা করেন। তারা ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। পরে একত্রে বেলা আড়াইটার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ছেড়ে যান।

অর্থনীতিকেই ‘ঝুঁকিতে’ ফেলছে ফারমার্স ব্যাংক

ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপি। বর্তমানে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে স্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে ফারমার্স ব্যাংকের লাইসেন্স নেন তিনি। কিন্তু ব্যাংকটির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ শুরু থেকেই। ২০১৩ সালে জুন মাসে ফারমার্স ব্যাংক আরও ৮টি ব্যাংকের সাথে লাইসেন্স পেয়েছিল, যা রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে এই ব্যাংকটি নিয়ম-কানুন লঙ্ঘন করে পুরো অর্থনীতিকেই ‘ঝুঁকিতে’ ফেলছে। যদিও পর্যবেক্ষক বসানো ছাড়া এই ব্যাংকটির বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্র বলছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কারণেই কোনো কিছু করার সাহস দেখাতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে এসব ব্যাংকের মালিকেরা যা চাইছেন, সেটাই হচ্ছে। বারবার বলা সত্ত্বেও বেসিক ব্যাংক নিয়েও কিছু করা হচ্ছে না। এতে ব্যাংক খাত আরও খারাপ হয়ে পড়ছে। সাবেক মন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মালিকানাধীন ফারমার্স ব্যাংককে আর্থিক খাতের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যাত্রা শুরুর তিন বছর না যেতেই শত শত কোটি টাকা ঋণ বিতরণে অনিয়ম ধরা পড়ায় বেসরকারি এই ব্যাংকটিকে কড়া নজরদারিতে আনতে পর্যবেক্ষক বসিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও তা আদালতে আটকে যায়।

এখন অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, ব্যাংকটি সাধারণ আমানতকারী এবং বিভিন্ন ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে অর্থ নিয়ে ধার করে চলছে। দায় পরিশোধের সক্ষমতাও নেই ব্যাংকটির। এর ফলে ব্যাংকটি সমগ্র আর্থিক খাতে ‘সিস্টেমেটিক রিস্ক’ সৃষ্টি করছে। এতে আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট হতে পারে বলেও মনে করছে মন্ত্রণালয়। গত ২৯ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দেয়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছর ধরে ফারমার্স ব্যাংকে তারল্য সঙ্কট রয়েছে। বর্তমানে তা তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত নগদ জমা (সিআরআর) সংরক্ষণে ব্যাংকটি ক্রমাগতভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির গ্রাহক আমানত ৫ হাজার ১২৫ কোটি টাকা এবং আন্তঃব্যাংক আমানত ৫৩৫ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে ব্যাংকটির কলমানি ঋণের পরিমাণ ১৪৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ক্রয়কৃত সরকারি সিকিউরিটিজের (বিল ও বন্ড) পরিমাণ ১ হাজার ৯ কোটি টাকা। “অর্থাৎ ব্যাংকটির দায় পরিশোধের সক্ষমতা নেই,” বলা হয় প্রতিবেদনে।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ফারমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শামীম উপস্থিত ছিলেন।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, “তিনি (শামীম) বলেছেন, এমডি হিসেবে তার আসার আগে এগুলো হয়েছে। তারা সংশোধনের চেষ্টা করছেন।”

অনিয়ম এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকেও

সংসদীয় কমিটিতে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের বিরুদ্ধেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক সম্পর্কে সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোর্ড সভায় অনুপস্থিত পরিচালকদের স্বাক্ষর জাল করে উপস্থিতি দেখিয়ে পর্ষদ সভার কার্যবিররণী করা হয়েছে। নিয়ম ভেঙে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। ব্যাংকটি গঠনের সময় মূলধন আনায় অনিয়ম, অনিবাসীদের পরিবর্তে বেনামে বাংলাদেশে বসবাসকারী ব্যক্তি কর্তৃক ব্যাংকের শেয়ার কেনা, বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ প্রদান এবং ব্যাংক হতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টির সাথে পর্ষদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সম্পৃক্ততার কথা এসেছে প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানি আইনের বিধান এবং ব্যাংকের আর্টিক্যালস অব অ্যসোসিয়েশনের সংশ্লিষ্ট ধারা লঙ্ঘন করে ব্যাংকের একজন পরিচালকের অনুপস্থিতিতে তার শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে পর্ষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এছাড়া নিয়ম না মেনে ৬ জন পরিচালকের শেয়ার বাজেয়াপ্তকরণ ও ৩ জন পরিচালককে অপসারণ করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ডিসেম্বর ২০১৬ প্রান্তিকে প্রায় ১৯ কোটি ৩০ কোটি টাকা। কিন্তু জুন ২০১৭ প্রান্তিকে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়ে ১৯১ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা মোট ঋণের ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। নতুন স্থাপিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের হারের বিবেচনায় এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ফারমার্স ব্যাংক রয়েছে প্রথম অবস্থানে।

বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংক পরিচালনায় অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে অধিকতর তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শান্তি নিশ্চিত করে ব্যাংকগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়।

বৈঠকে ইসলামী ব্যাংক নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, “আমরা যেটা দেখেছি সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক এগ্রেসিভ লোন দিচ্ছে। এ বিষয়টি আমরা সতর্ক করেছি।”
দেশে এত ব্যাংক কি প্রয়োজন?

বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে ব্যাংকের সংখ্যা ৫৭টি। এর মধ্যে বেশিরভাগ ব্যাংকের অর্ধশতাধিক শাখা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৩ কোটি মানুষ এখনও চরম দারিদ্র্যতার মধ্যে বসবাস করছে। এমন একটি দেশে এতগুলো ব্যাংক কি প্রয়োজন?

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ব্যাংক দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজের সমীক্ষাই হচ্ছে বাংলাদেশে এত ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। তারপরও অনুমোদন দেয়া হয়। এতগুলো ব্যাংক নজরদারি করার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের আছে কি না, সেই প্রশ্ন তো আছেই।

মহা বিপর্যয় আসন্ন?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনোভাবেই ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। আর সরকারি ব্যাংক হলে তো কথা-ই নেই। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণের নামে ইচ্ছেমতো লুটপাট চলছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই। যার অনন্য দৃষ্টান্ত বেসিক ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর কারণেই অত্যন্ত শক্তিশালী এ ব্যাংকটি আজ দেউলিয়ার পথে। শুধু বেসিক ব্যাংকই নয়, বাচ্চুদের মতো প্রভাবশালীদের কারণে পুরো ব্যাংকিং খাত বিপর্যন্ত। কিন্তু বড় বিস্ময়, ব্যাংক লুটপাটকারী দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হয় না। আর বেসরকারি ব্যাংকের ঋণ পরিচালকরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়ে যাচ্ছেন। ১০ বছর আগে যা কল্পনায়ও আসেনি। অথচ আজ অবলীলায় তা হচ্ছে। রক্ষকদের সহায়তায় টাকা পাচারের অভিযোগ তো আছেই।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিও এখন ক্লান্ত। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে তাদের সুপারিশ এখন বিশাল স্তুপাকার ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। সংসদীয় কমিটি পরিণত হয়েছে ঠুঁটো জগন্নাথে।

এর মধ্যে একই পরিবারের চারজনকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাখা ও কমিটির মেয়াদ ৯ বছর করার বিষয়ে প্রক্রিয়াধীন নতুন আইন কার্যকর হলে ব্যাংকিংখাত আরও ধ্বংসের দিকে যাবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এ দুরবস্থা উত্তরণে কমিশন গঠনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ দিয়েছেন তারা। না হলে ভবিষ্যতে ব্যাংকিংখাতের জন্য আরও খারাপ সংবাদ অপেক্ষা করছে।

তাদের মতে, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো পুঁজি হারিয়ে ধসে পড়লে দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসবে। সাধারণ আমানতকারীরা বিপাকে পড়বেন। তাই সবার আগে ঋণখেলাপিদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনাসহ ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন করে, এক পরিবার থেকে চার পরিচালক ও পরিচালকদের মেয়াদ ৯ বছর করা এই দুটো আইনি পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয় বলে মত দিয়েছেন বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ব্যাংকের মালিকানা ওই পরিবারগুলোর মধ্যে স্থায়ী করার উদ্যোগ এটি। এটা অত্যন্ত ভুল সিদ্ধান্ত। খেয়াল রাখতে হবে, রাজনৈতিক স্বার্থ ও স্বজনপ্রীতির কারণে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটা বড় ধরনের রাজনৈতিক দুর্নীতি মনে করি। কারণ, ব্যাংকের আসল মালিক আমানতকারীরা। আমানতকারীদের টাকা অন্যদের কাছে ঋণ দিয়ে ব্যাংকের ব্যবসা পরিচালনা করা হয়। এই মালিকদের অনেকে নিজেরা আসলে কোনো পুঁজি বিনিয়োগ না করে ব্যাংকের মালিক-পরিচালক হয়ে গেছেন। যেসব রাজনৈতিক পরিবার এখন ব্যাংকের মালিক হয়ে গেছে, তারা বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপকে তাদের শেয়ার বিতরণ করে বা তাদের নিজেদের শেয়ারের দাম ওই ব্যবসায়ীদের চাঁদা থেকে পরিশোধ করেছে। এটা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অসুস্থ প্রবণতা। এর বিরুদ্ধে জাতিকে রুখে দাঁড়াতে হবে। এর মাধ্যমে বড় ধরনের পুঁজি লুণ্ঠনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
এছাড়া গত দুই বছরে তিনটি ব্যাংকে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা পুরো খাতে আস্থার সংকট তৈরি করছে বলে মনে করছেন অনেকেই। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, প্রতিযোগিতামূলক আইনের প্রয়োগ হলে এই অবস্থা হতো না। এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। দ্রুত তা প্রতিরোধ করতে হবে। না হলে বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধস নামবে। অর্থনীতিতেও বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনবে।

(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর প্রকাশিত)

Loading...

আরও পড়ুন...
Top