আজ : মঙ্গলবার, ১২ই ডিসেম্বর ২০১৭ ইং | ২৮শে অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

আসল ও নকল ডিবির পরিচয়ে বেড়েছে অপরাধ!


সকল নিউজ আপডেট পেতে পেইজে লাইক দিন

রাজধানীর কাফরুলে একটি ক্লাবে র‌্যাব পরিচয়ে চাঁদাবাজি করে ফেরার সময় ঢাকা সেনা নিবাসে সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি-ডিএমপি) ১১ সদস্য। সেই ঘটনার তদন্তে দোষী ডিবির সহকারী কমিশনার রুহুল আমিন, পরিদর্শক গিয়াস উদ্দিন, এসআই জাহিদুল ইসলাম, এএসআই লুত্ফর রহমানসহ ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি প্রদানের সুপারিশ করা হয়। ঘটনাটি চলতি বছরের এপ্রিলের।

সেবার রাজধানীসহ সারাদেশে বেশ আলোচিত হয় ঘটনাটি। এমনকি ওই ঘটনায় নড়েচড়ে উঠেন সরকার ও পুলিশ বাহিনীর শীর্ষস্থানীয়রা। অপরাধে জড়ালে কোন ছাড় দেওয়া হবে না বলেও সেসময় হুশিয়ার করেন বাহিনীর সদস্যদের।

অপরদিকে বুধবার ভোরে কক্সবাজারের টেকনাফে এক ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে ১৭ লাখ টাকা নিয়ে ফেরার সময় সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাত সদস্য। টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কে সেনা বাহিনীর তল্লাশির সময় ডিবি পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) গাড়ির গ্লাস ভেঙ্গে পালিয়ে গেলে সেনা সদস্যরা গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মুক্তিপণের ১৭ লাখ টাকাসহ তাদেরকে আটক করেন। টেকনাফে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় স্থাপিত সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের প্রধান অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পের মেজর নাজিম সাত ডিবি পুলিশকে ১৭ লাখ টাকাসহ আটকের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘টেকনাফের মধ্যজালিয়া পাড়ার মৃত হোসেন আহমদের ছেলে আবদুল গফুরেরর স্বজনরা অভিযোগ করেন যে, মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার শহর থেকে কিছু লোক গফুরকে ধরে নিয়ে টাকা দাবি করেছে। বুধবার ভোরে ১৭ লাখ টাকার বিনিময়ে গফুরকে একটি মাইক্রোবাসে করে টেকনাফে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।’

সাত ডিবি সদস্যকে আটকের বিষয়ে মেজর নাজিম আরো বলেন, ‘মাইক্রোবাসটি সকালে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে কক্সবাজারে চলে যাচ্ছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভের সেনা চেকপোস্টে মাইক্রোবাসটি থামানো হয়। সেনাবাহিনী মাইক্রোবাসটি তল্লাশি করতে চাইলে যাত্রীরা নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দেয়।

তিনি বলেন, ‘এসময় সেনা সদস্যরা গাড়ি তল্লাশি করতে চাইলে এক ব্যক্তি গাড়ির গ্লাস ভেঙ্গে পালিয়ে যায়। পরে গাড়ি তল্লাশি করে হলুদ রংয়ের কাপড়ের প্যাকেট থেকে ১৭ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরো বলেন, ‘১৭ লাখ টাকা উদ্ধারের পর বিষয়টি নিয়ে র‌্যাব ও পুলিশেকে জানানো হয়। পরে পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন। আটক সাত জনকে পুলিশ সুপারের জিম্মায় দিয়ে ১৭ লাখ টাকা ওই ব্যবসায়ীকে ফেরত দেওয়া হয়।

এমনিতেই ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এক শ্রেণির প্রতারক ও ভুয়া ডিবি পুলিশ নিয়মিতই চাঁদাবাজি ও জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এসব ভুয়া ও প্রতারকদের আসল ডিবি ও পুলিশের হাতে ধরা পরার ঘটনাও কম নয়।

কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আসল ডিবি পুলিশের কিছু সদস্য চাঁদাবাজি ও জিম্মি করে অর্থ আদায়ে নেমেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময় ডিবির পরিচয়ে বাড়ি থেকে বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। কখনো কখনো কারো লাশ পাওয়া যায়, আবার কাউকে খুঁজেও পাওয়া যায় না।

কেউবা টাকা দিয়ে ছাড়া পায় বলেও অভিযোগ আছে।

ডিবি পুলিশ সেজে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে মঙ্গলবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ পাশের গেটের সামনের রাস্তা থেকে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পূর্ব বিভাগের একটি দল। এসময় তাদের কাছ থেকে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত গুলিভর্তি বিদেশি পিস্তল, মাইক্রোবাস, ডিবি পুলিশের পোশাক (ডিবি জ্যাকেট) টর্চ লাইট, ওয়্যারলেস সেট, লাঠি ও গামছা উদ্ধার করা হয় ।

তার একদিন আগেই (সোমবার) রাজধানীর মতিঝিলের উত্তর কমলাপুর থেকে কমলাপুর হতে সায়েদাবাদগামী রাস্তার ওপর ডিবি পুলিশ সেজে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই এ দুই গ্রুপ স্বীকার করেছে তারা দীর্ঘদিন যাবত ঢাকা মহানগরীসহ আশপাশের এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতি করে আসছিল। তার একদিন আগে রোববার (২২ অক্টোবর) ঢাকার আশুলিয়ার বাইপাইল থেকে ভুয়া গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে প্রতারণার সময় একজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী। এসময় তার কাছ থেকে পুলিশের ভুয়া পরিচয়পত্রও উদ্ধার করা হয়।

১৯ অক্টোবর জয়পুরহাটে পাঁচ ভুয়া ডিবিকে আটক করে জনতা। তাদের ব্যবহৃত গাড়িতে আগুনও ধরিয়ে দেয় উত্তেজিতরা। ডিবি পুলিশের পরিচয়ে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া এলাকায় এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে তিন লাখ টাকা ছিনতাইয়ের পর পালানোর সময় একটি প্রাইভেটকারসহ তাদের আটক করে গণধোলাই দেওয়া হয়। ছিনতাইকারীদের একটি প্রাইভেটকার পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা।

৯ অক্টোবর সিরাজগঞ্জ ভুয়া ডিবি পরিচয়ে টাকা ছিনতাইকালে আটক করা হয়েছে চার জনকে। বগুড়ার শেরপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় পাঁচ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে পৌর শহর থেকে এ চার ব্যক্তিকে আটক করে। এ সময় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাস জব্দ করে পুলিশ।

এ বছরের ২০ মে ২০ পুলিশ-সামগ্রী ও অস্ত্রসহ ভুয়া ডিবির ১৬ সদস্যকে গ্রেফতার করে ডিএমপির ডিবি টিম। তাদের হেফাজত থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড গুলি, দুইটি খেলনা পিস্তল, দুইটি চাপাতি, চারটি ছুরি, দুইটি ওয়াকিটকি, তিনটি ডিবি জ্যাকেট, চারটি হ্যান্ডকাপ, দুইটি বেতের লাঠি, একটি কাঠের লাঠি, একটি ব্যাগ, দিুইটি ডিবি স্টিকার, পুলিশের মনোগ্রাম সম্বলিত একটি খালি আইডি কার্ডের কভার, তাদের ব্যবহৃত দুইটি কার ও দুইটি মাইক্রোবাস ও একটি আর্মি জ্যাকেটসহ অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে পুলিশের গোয়েন্দা (পূর্ব) বিভাগ গ্রেফতার করে ১২ জন ভুয়া ডিবির সদস্যকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন জানিয়েছিলেন তারা স্বীকার করেছিল বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনকারী গ্রাহকদের জিম্মি করে তাদের সব কিছু লুটে নিত। তাদের কাছ থেকে দুইটি পিস্তল, ছয় রাউন্ড গুলি ভর্তি দুইটি ম্যাগজিন, একটি কাঠের লাঠি, একটি প্লাস্টিকের তৈরি কালো রংয়ের ওয়াকিটকি, দুইটি হাতকড়া, দুইটি স্টেনলেস স্টিলের ধারালো চাকু, একটি চওড়া স্কচটেপ, একটি গামছা, একটি ডিবি জ্যাকেট এবং একটি সিলভার কালারের নোহা মাইক্রোবাসও উদ্ধার করা হয়েছিল।
বিভিন্ন সময় র‌্যাবও আটক করেছে ভুয়া ডিবি পুলিশকে

১৬ জুন রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভুয়া ডিবি চক্রের ৮ সদস্যকে আটক করে র‌্যাব। এসময় তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি ও গাড়ি উদ্ধার করা হয়।

এবছরের ৩ এপ্রিল রাজধানীর ডেমরায় এক অভিযানে চার ভুয়া ডিবি পুলিশ আটক করেছিল র‌্যাব-১০। তাদের কাছ থেকে একটি ৭.৬৫ মিমি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, দুই রাউন্ড গুলি, ওয়াকিটকি সেট, হ্যান্ডকাফ, সিগন্যাল লাইট, নগদ চার লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টাকা ও ১১ টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।

সে সময় র‌্যাব-১০ এর পরিচালক অতিরিক্ত ডিআইজি জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর পরিবর্তন ডটকমকে বিয়ষটি নিশ্চিত করেন।

বুধবার কক্সবাজারের ঘটনাটি ছাড়াও ২০ জুন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দুই ব্যক্তিকে আটক করায় জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তিন কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে স্থানীয় জনতা। স্থানীয়দের অভিযোগ সুমন গাজী ও শামীম গাজী গ্যারেজে বসাছিল। এ সময় ডিবির টিম তাদের কাছে ইয়াবা দিয়ে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অন্যথায় টাকা দাবি করে।

অভিযোগ অস্বীকার করে ডিবির এএসআই শাহাজুল ইসলাম জানান, শাহাপুর বাজার সংলগ্ন পাকা কবর মসজিদের সামনের সড়কে তারা চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করছিলেন। এ সময় ভ্যানযোগে সুমন গাজী ও শামীম গাজী নামে দুজন লোককে আসতে দেখে তারা থামার নির্দেশ দেয়। এ সময় শামীম গাজী দুই পিস ইয়াবা গিলে ফেলেন। আর সুমনের কাছ থেকে দুই পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

২৪ এপ্রিল চট্টগ্রামে ডিবির আট সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেন এক দোকান কর্মচারী। অভিযোগে বলা হয়, মঈন উদ্দিন নামে এক দোকান কর্মচারীকে তুলে নিয়ে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এমনকি তার মানিব্যাগে থাকা তিন হাজার ৯০ টাকা ও একটি মুঠোফোন কেড়ে নেন ওই পুলিশ সদস্যরা। ডিবি পুলিশ জানায়, মঈন উদ্দিন জাল স্ট্যাম্পসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। মামলা থেকে বাঁচার জন্য সে মিথ্যা মামলা দিয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি-ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, আমাদের বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে আমরা তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। ইতিপূর্বেও এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে। আর ভুয়া ডিবির নামে প্রতারকদের ধরতে আমাদের টিম সব সময় তৎপর।

তিনি বলেন, একটি বড় বাহিনীতে কিছু খারাপ মানসিকতার লোকও ঢুকে পড়ে। তবে আমরা তাদের চিহ্নিত করতেও কাজ করছি।

Loading...

আরও পড়ুন...
Top