আজ : সোমবার, ১৮ই জুন, ২০১৮ ইং | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

“২১’শ নিয়ে কিছু কথা”-অধ্যাপক আব্দুর রশিদ


পুরো ফেব্রæয়ারী মাসের মূল আকর্ষণ হলো ২১-শে ফেব্রæয়ারী। ২১-শে ফেব্রæয়ারীকে কেন্দ্র করেই চলে সারা ফেব্রæয়ারী মাসের আয়োজন-সংযোজন-স্মৃতিচারন। তো ২১-শে ফেব্রæয়ারী আর দশটা-পাঁচটা গতানুগতিক দিনের মত দিন নয়। এ দিন রক্তাক্ত শিমুল-পলাশ-কৃষ্ণচুড়ার ফুল ফোটার দিন। আমাদের জাতীয় জীবনে এদিন এক গৌরব মাখা ঐতিহাসিক দিন। ঐতিহাসিক এই দিনের চিন্তা-চেতনা আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে শানিত করেছে-লালিত করেছে। কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রমনে উৎসাহ, উদ্দীপনা আর সাহস জুগিয়েছে। এই পথ ধরেই আমরা স্বাধীন সর্বভৌম জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে আত্মমর্যাদা লাভ করেছি। আর তাই “একুশ”-কে আমরা লালন-পালন করে চল্ছি,-স্মরন-বরণ করে চল্ছি, দিনের পর দিন মন ও মননে। এই দিনেই ১৯৫২-সালে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে এদেশের কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-ছাত্রী ও যুব সমাজ সহ সব শ্রেণী পেশার মানুষ যে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছিল, তার পটভূমি জানতে হলে এদেশের তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনা করা দরকার।
পাকিস্তানের জন্মের কিছুদিন পূর্বে অর্থাৎ ৪৭-সালের ১৭-ই মে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান ও জুলাই মাসের কোন এক সময় আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ জিয়া উদ্দিন আহমদ দৃঢ় ভাবে মত প্রকাশ করেন যে, উর্দূ হবে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। শুরু হয় তখন থেকেই রাষ্ট্র ভাষা নিয়ে বাংলা ভাষা বিরোধী চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডঃ মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি জোরালো ভাবে বলেন উর্দূ পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেই মাতৃভাষা রুপে চালু নয়। যদি বিদেশী ভাষা বলে ইংরেজী ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা রুপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোন যুক্তি নাই।
এদিকে ১৯৪৭ সালের ১৪-ই আগষ্ট ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে জন্ম নিল পাকিস্তান। আর এই পাকিস্তানের জন্মের পর পরই তদানিন্তন পাকিস্তানের কুচক্রি শাসক গোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মাতৃভাষা-বাংলাভাষাকে পঙ্গু করবার উদ্যেশ্যে এবং মা’কে মা বলে ডাকবার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে উর্দূকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য নতুন করে শুরু করে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত। আর এই ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকে প্রতিহত করবার জন্য মাতৃভাষা-বাংলা ভাষা ও মাকে “মা” বলে ডাকবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৯৪৭-সালের ১-লা সেপ্টেম্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের তৎকালীন তরুণ অধ্যাপক এম,এ আবুল কাশেমের নেতৃত্বে কয়েকজন আত্মসচেতন অধ্যাপক ও ছাত্র নিয়ে সংগঠিত হয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান “তমুদ্দুন মজলিস”। এই সংগঠনই প্রথম রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নটি সরাসরি উত্থাপন করেন এবং রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দানের দাবি জানান। তাদের দাবির পক্ষে তারা ৪৭ সালে ১৫-ই সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা “বাংলা না উর্দূ” শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। উক্ত পুস্তিকায় বাংলাকে পূর্ব বাংলায় শিক্ষার বাহন ও আইন আদালত, অফিসাদির ভাষা করার এবং উর্দূকে আন্ত:প্রাদেশীক ভাষা ও ইংরেজিকে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবী করা হয়।
ঐ সময় ডঃ এনামুল হক রাষ্ট্র ভাষা বাংলার পক্ষে বলতে যেয়ে বলেছিলেন, উর্দূ প্রচলিত হলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক রাষ্ট্রিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ধ্বংস ঘনিয়ে আসবে এবং সর্ব বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান হবে উত্তর ভারতীয় পশ্চিম পাকিস্তানি উর্দূ ওয়ালাদের শাসন ও শোসনের যন্ত্র। পাকিস্তান সৃ্িরষ্টর কয়েক মাসের মধ্যে রাষ্ট্র ভাষা নিয়ে এত কিছু প্রত্রিক্রিয়ার পরও ৪৭ সালের ৫-ই ডিসেম্বর করাচীতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উর্দূ ও ইংরেজীকে গ্রহণ করবার প্রস্তাব গৃহীত হয় সর্ব সম্মতিক্রমে। এই রুপ প্রস্তাব গ্রহনে পূর্ব বাংলার কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবি সহ সকল মহলে দারুণ ক্রোধ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঐ দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে সকল শ্রেণীর সমন্বয়ে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্র ভাষার দাবি নিয়ে এই প্রথম সাধারণ সমাবেশ। উক্ত সমাবেশে সভাপতিত্ত¡ করেন তমুদ্দুন মজলিসের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এম এ কাশেম। বক্তৃতা করেন মুনির চৌধুরী, আব্দুর রহমান, এ, কে, এম আহসান, কল্যাণ দাস গুপ্ত, এস আহমদ প্রমুখ। প্রস্তাব পাঠ করেন ফরিদ আহমদ। সমাবেশ শেষে ছাত্র-জনতা মিছিল সহকারে সচিবালয় ও মর্নিং নিউজ পত্রিকার অফিসের সম্মূখে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পাকিস্তানের জন্মের কয়েক মাসের মধ্যে সরকারের আচরণের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদের গুরুত্ব অপরিসীম। তো যাই হোক এই ভাবেই বাঙালীদের মধ্যে ভাষা আন্দোলনের একটা ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হতে লাগল। এক পর্যায়ে ৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে তমুদ্দুন মজলিসের উদ্দ্যোগে ও অধ্যাপক নূরুল হক ভূইয়াকে আহবায়ক করে প্রথম রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৪৮- সালের ২-রা মার্চ আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ছাত্র প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সামসুল হক-কে আহবায়ক করে ১১- সদস্য বিশিষ্ট রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ পূনর্গঠন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে নূরুল হক ভূইয়া নেতৃতাধীন রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবীতে ৪৮ সালে ৪-ঠা জানুয়ারীতে সারা পূর্ব বাংলায় সফল হরতাল পালিত হয়।
এদিকে ১৯৪৮ – সালের ২৩- শে ফেব্রæয়ারী পূর্ব পাকিস্তান গণ পরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। উক্ত অধিবেশনে ২৫-শে ফেব্রæয়ারী পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি সিলেটের কৃতি সন্তান শ্রী ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত উর্দূ ও ইংরেজীর পাশা পাশি বাংলা ভাষা কেও গণ পরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের সরকারী স্বীকৃতির দাবী জানান। মওলানা ভাষানী, শ্রীস চন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, রাজ কুমার চক্রবর্তী, শামসুদ্দিন আহমদ, মহি উদ্দিন আহমদ প্রমূখ সদস্যবৃন্দ সেদিন এই প্রস্তাবকে সমর্থন করে একই সূরে কথা বলেছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগের গণ-পরিষদ সদস্যগন, বিশেষ করে খাজা নাজিমুদ্দিন, তমিজ উদ্দিন আহমদ সহ আরো অনেকে এই দাবীর প্রবল বিরোধীতা করায় দাবীটি অবশেষে বাতিল হয়ে যায়।
বাংলা ভাষা সর্ম্পকে গণ পরিষদের এই দুঃখ জনক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং মুসলিম লীগের বাংলা ভাষা বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবানে ১৯৪৮ সালের ১১-ই মার্চ সারা পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্র ভাষা দিবস পালন করা হয়। ঐ দিন তদানীন্তন মুসলিম লীগ সরকার শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক ও অলি আহাদ সহ ৬৫ জনকে গ্রেফতার করেন। এ সবের প্রতিবাদে সে সময় পূর্ব বাংলা জাগ্রত ছাত্র ও যুব সমাজ প্রতিনিয়ত মিছিল-মিটিং ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মাধ্যমে এক প্রবল-পরাক্রান্ত সরকারকে অসহায় করে তোলে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিরুপায় হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৪৭-সালে ১৫-ই মার্চ বাংলা ভাষাকে পূর্ব বাংলার সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার সুপারিশ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে ৮-দফা ভিত্তিক ১-চুক্তিনামা স্বাক্ষর করেন। সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন কামরুদ্দিন আহমদ। এদিকে পূর্ব বাংলার এই অশান্ত ও উত্তপ্ত পরিবেশের মধ্যে ১৯৪৮- সালের ১৯-শে মার্চ, পাকিস্তানের স্থপতি ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলা সফরে আসেন, পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে পূর্ব বাংলার জনগন সেদিন তার কাছে আশা করেছিল, ভাষা সমস্যার একটা সর্বজন গ্রহন যোগ্য সমাধান। কিন্তু তা না হয়ে বাস্তবে ১৯৪৮-সালে ২১-শে মার্চ ঢাকা রের্সকোর্চ ময়দানে (এখন যার নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্দ্যান) উৎফুল্ল জনতার জনসভায় এবং ২৪-শে মার্চ কার্জন হলে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষনা করেন যে “আমি আপনাদের স্পষ্ট করে বলে দিতে চায় যে, অন্য কোন ভাষা নয়, উর্দূ-একমাত্র উর্দু’ই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা”। সেদিন জিন্নাহ’র উভয় বক্তৃতার মাঝেই পূর্ব বাংলার নির্ভীক ছাত্র- জনতা না না বলে তীব্র ভাবে প্রতিবাদ করে। পূর্ব বাংলার ছাত্র জনতার তীব্র প্রতিবাদের মুখে সেদিন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে যান। এর পর জিন্নাহ সাহেব খুব বেশি দিন জীবিত ছিলেন না। ১৯৪৮-সালে ১১-ই সেপ্টেম্বর তিনি মারা গেলে নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের হর্তাকর্তা হয়ে উঠেন। কিন্তু বাংলা ভাষা বিরোধী চক্রান্ত থেমে থাকে না। ১৯৪৮-সালে ২৭-শে ডিসেম্বর নিখিল পাকিস্তান শিক্ষক সম্মেলনে শিক্ষা মন্ত্রী ফজলুর রহমান বাংলা ভাষায় আরবী হরফ প্রবর্তনের পক্ষে যুক্তি পেশ করেন। এর প্রতিবাদে সারাদেশের সর্বত্র স্বাক্ষর অভিযান, প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। এর পরেও পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী লিয়াকত আলী খান উক্ত চিন্তা চেতনায় অটল থেকে গণ পরিষদে উক্ত রিপোর্ট প্রদান করেন। এতে সারা পূর্ব বাংলা মিছিল, মিটিং-এ উত্তাল হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৫০- সালে ২৮-শে সেপ্টেম্বরে গণ পরিষদে ঐ রিপোটের উপর আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়।
রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ৪৮-সাল থেকে সারা পূর্ব বাংলায় ১১-ই মার্চ রাষ্টভাষা দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে। ৫১-সালেও ১১Ñই মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসাবে পালিত হয়। কিন্তু এইদিনে পূর্ববর্তি রাষ্টভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় য়ারা পরবর্তিতে ভাষা আন্দোলনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৯৫১সালের ১৬-ই অক্টোবর লিয়াকত আলী খান পশ্চিম পাকিস্তানের এক জনসভায় বক্তৃতা দান কালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন এবং খাজা নাজিম উদ্দীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। এই সময় পূর্ববাংলার আপামর জনগন সকলেই তার নিকট আশা করেছিল যে,তিনি বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের চেষ্টা করবেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে তিনি ৫২-সালের ২৭-শে জানুয়ারী ঢাকার পল্টন ময়দানে মুসলিম লীগের এক জনসভায় পূর্বসূরীদের ন্যায় আরও জোরেসোরে ঘোষনা করেন যে, উর্দূই হবে পাকিন্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। নাজিম উদ্দীনের বাংলাভাষা বিরোধী এই ঘোষনায় পূর্ব বাংলার ছাত্র, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবি মহলে সেদিন দারুন হতাশা ও ক্ষোভের সঞ্চার করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ডাকে ৩০-শে জানুয়ারী ঢাকায় সফল ধর্মঘট পালিত হয়।
এদিকে ভাষার দাবীতে রাজনৈতিক দলগুলি আর বসে থাকে না। দেরিতে হলেও তারা বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য ”৫২-র ৩১-শে জানুয়ারী ঢাকার বার লাইব্রেরীতে আতাউর রহমান খান এর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় কাজী গোলাম মাহবুবকে আহŸায়ক করে ৪০-সদস্য বিশিষ্ট একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এদের মধ্যে অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলেন মওলানা ভাসানী সহ অন্যান্যরা হলেন আবুল হাশিম, সামসুল হক,আব্দুল গফুর, অধ্যাপক আবুল কাশেম , আতাউর রহমান খান, কমরুউদ্দীন আহমদ, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, আলমাস আলী, আব্দুল আওয়াল, সৈায়দ আব্দুর রহিম,মোঃ তোয়াহা, অলি আহাদ, খালেক নওয়াজ খান, মির্জা গোলাম হাফিজ, গোলাম মওলা প্রমুখ।
এই কমিটি গঠনের পর ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। এই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সমর্থনে ও বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহŸানে ৪-ঠা ফেব্রæয়ারীতে ঢাকা নগরীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সফল ধর্মঘট পালিত হয়। ঐদিন বিকেলে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকায় এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জনসভায় মওলানা ভাসানী,আবুল হাশিম ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্র নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগ সরকারের তীব্র নিন্দা করেন এবং বাংলাভাষার দাবি সুপ্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত ঘোষনা করেন। উক্ত জনসভা থেকেই নেতৃবর্গ ৫২- সালের ২১-শে ফেব্রæয়ারী সারা পূর্ব বাংলায় সাধারন ধর্মঘটের আহŸান জানানো হয়। এই কর্মসূচিকে সফল করার জন্য ১১ও১৩-ই ফেব্রæয়ারী সারা দেশে পতাকা দিবস পালিত হয়। ১৬-ই ফেব্রæয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও বন্দী মুক্তির দাবীতে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দীন আহমদ কারাগারে আমরন অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। এই সময় পূর্ব পাকিস্তানের তদানীন্তন নুরুল আমিন সরকার ২০-শে ফেব্রæয়ারী থেকে ১-মাসের জন্য ধর্মঘট-মিছিল ও সভা সমাবেশ অনুষ্ঠানের প্রতি নিষেধাজ্ঞা ঘোষনা করেন এবং ১৪৪-ধারা জারী করেন ।
১৪৪-ধারা ভঙ্গ করা হবে কি হবেনা-, এই নিয়ে আলোচনার জন্য ২০-শে ফেব্রæয়ারী রাতে সর্বদলীয় রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক জরুরী বৈঠকে মিলিত হন।
মওলানা ভাসানীর অনুপ¯িথতিতে তুমুল বাকবিতন্ডার পর, উক্ত বৈঠকে অলি আহাদ,আব্দুল মতিন ,সামসুল হক ও সংগ্রামী ছাত্রসমাজ ১৪৪-ধারা ভঙ্গের চূড়ান্ত ্ সিদ্ধাš,Í সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে জানিয়ে দেন। পরদিন ২১-শে ফেব্রæয়ারী রচিত হলো এ দেশের সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
সংগ্রামী ছাত্র সমাজ সকাল থেকেই ১৪৪-ধারা ভঙ্গ করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে খন্ড- খন্ড মিছিল বের করে । পুলিশ ছাত্রদের মিছিলে লাঠি চার্জ ,কাঁদুনে গ্যাস ব্যাবহার করে এবং দশ হাজারের বেশি ছাত্র- ছাত্রী গ্রেফতারের মাধ্যমে ছাত্রদের মিছিল ভঙ্গের চেষ্টা করেন। কিন্তু সংগ্রামী ছাত্র সমাজ তাতে অবদমিত না হয়ে বিকেল ৩-টার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন থেকে এক বিরাট জঙ্গী মিছিল বের করেন। মিছিলটি মেডিকেল কলেজের প্রাঙ্গনে পেীছালে পুলিশ নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করেন। তাৎক্ষনিক ভাবে রফিক, জব্বার,বরকত,সালাম সহ আরও অনেক নাম না জানা ছাত্র নিহত হয়। আহত হয় প্রচুর সংখ্যক ছাত্র। এই মর্মান্তিক ও বর্বরোচিত হত্যার প্রতিবাদে সেদিন বুড়িগঙ্গার পানি সহ পূর্ব বাংলার আপামর জন সাধারন প্রচন্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং আন্দোলনের তীব্রতা সারা পূর্ব বাংলায় আগুনের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়াই পূর্ব বাংলা ব্যাবস্থাপক পরিষদ সদস্য মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিস ও আবুল কালাম সামসুদ্দীন ছাত্রদের প্রতি গুলি চালনা ও হত্যার প্রতিবাদে সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করে বিক্ষোভ মিছিলে শরিক হন।
২২-শে ফেব্রæয়ারী, লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে মেডিকেল কলেজ- হোষ্টেল প্রাঙনে মওলানা ভাষানীর পরিচালনায় ও নেতৃত্বে গায়েবী জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং মোনাজাত পরিচালিত হয়। তারপর হরতাল পালন ও শোভাযাত্রা সহ ১৪৪-ধারা ভঙ্গ করা হয়। অবস্থার আরও অবনতি দেখে পাকিস্তান সরকার ভীত হয়ে বাংলা ভাষার দাবীর নিকট মাথানত করতে বাধ্য হয় এবং বাস্তব পরিণতিতে ১৯৫৬-সালের সংবিধানের ২১৪- ধারায় উল্লেখ করা হয় য়ে, উর্দুর সাথে বাংলাও হবে পাকিষÍানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা।
এই ২১-শের চিন্তা- চেতনায় পরবর্তিতে পূর্ব বাংলার জনগনকে ধীরে ধীরে স্বাধীনতা আন্দোলণে উদ্বুদ্ধু করে। যেমন ৫৪-সালের সাধারন নির্বাচন ও ২১-দফা প্রনয়ন,৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-র ৬- দফা আন্দোলন ও ৬৯-এর ৪-ঠা জানুয়ারী , ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১- দফা কর্মসূচি প্রনয়ন, ঐতিহাসিক গণ- আন্দোলন ,৭০-এর সাধারণ নির্বাচন ,বাংলা-বাঙালীর অভূতপূর্ব বিজয়, ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা ও ষড়যন্ত্র -চক্রান্ত, ২৫-শে মার্চের কালো রাতের নির্দয় ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ, সবশেষে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সহ সকল কিছুর মূলেই ২১-শের চিন্তা- চেতনা, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণা-শক্তি-সাহস জুগিয়েছে। আর এই সকল বিষয়ে অণুপ্রানিত হয়েই বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ সেদিন দীর্ঘ ৯-মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ৭১- সালের ১৬-ই ডিসেম্বর বর্বর পাকিস্তানীদের পরাজিত করে-,আত্মসমর্পনে বাধ্য করে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনে পৃথিবীর মান চিত্রে প্রতিষ্ঠিত করে “লাল-নীল-সবুজের দেশ”- বাংলাদেশ ।
তো, দেশ স্বাধীন হবার পূর্ব পর্যন্ত ব্াঙালীরা ২১-শে ফেব্রæয়ারী পালন করতো শোক দিবস হিসাবে-,প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ দিবস হিসাবে। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলা ভাষা জাতীয় ভাষার মান-মর্যাদা লাভ করে এবং ২১-শে ফেব্রæয়ারী জাতীয় দিবস হিসাবে স¦ীকৃতি লাভ করে।
সেই ৫২-র রক্তে রঞ্জিত মহান ২১-শে ফেব্রæয়ারী ,আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ায় আমরা বাংলাদেশের ১৭- কোটি মানুষ আনন্দে আনন্দিত, গর্বে গর্বিত,উদ্দীপনায় উদ্বেলিত।
আজ ২১-শে ফেব্রæয়ারীর এই আনন্দ- ঘন দিবসে আমরা দেশ গড়ার দৃঢ় শপথ গ্রহন করি-, সাথে-সাথে সকল প্রকার শাসন- শোষন,অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-বঞ্চনা ও চোখ রাঙানি সহ সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করি।

আব্দুর রশিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, গাংনী সরকারী ডিগ্রী কলেজ

সংগ্রহ:মাহবুব হাসান টুটুল

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ...
Top