আজ : শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

দুই জোটে দূরত্ব বাড়ছে


একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে চলতি নির্বাচনী বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন দুই জোটের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। উপরন্তু দুই জোটের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে চলেছে আগের চেয়ে বহুগুণে। এ অবস্থায় জাতীয় নির্বাচন আদৌ সরলরেখা মেনে অনুষ্ঠিত হবে কি না এমন প্রশ্নই উঁকি দিচ্ছে বারবার।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছরের প্রথমদিক থেকেই প্রাক-প্রস্তুতি শুরু করেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। বিশেষ করে বিএনপি তাদের নানা সাংগঠনিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কর্মীদের নির্বাচন উপযোগী করার চেষ্টা করছিল।

গত বছরের এপ্রিল-মে মাসে বিএনপি ৫১টি টিম গঠন করে সারা দেশের সাংগঠনিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং সংগঠন গোছানোর কাজ সম্পন্ন করেছিল। ওই সময় দলটি ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করে নির্বাচনের লাইনে উঠতে শুরু করে।

এর মধ্য দিয়ে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার সর্বাত্মক প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছিল দলটি। এমনকি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে একাধিক সংলাপেও অংশ নিয়েছে তারা।

বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দল হিসেব ইসির সঙ্গে বৈঠক ও দেন-দরবার নির্বাচনের পক্ষে দলটির আগ্রহপূর্ণ মনোভাবকেই প্রকাশ করেছে। যদিও বিএনপি ইসির বৈঠকগুলোতেও বারবার ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের’ দাবি জানিয়েছে।

চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতারা বলেছেন, শেখ হাসিনা এবং বর্তমান পার্লামেন্টের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। যদি যেত পাঁচ বছর আগেই যেত। কিন্তু গতবারের মতোই বিদ্যমান সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় রয়েছে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল। এ রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি যথারীতি আন্দোলনের দিকেই অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু এমন সময় দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের কারাদণ্ডের ঘটনা সব পরিকল্পনাকে ভণ্ডুল করে দিয়েছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজার রায় ও গ্রেপ্তারের পর বিএনপি কার্যত স্মরণকালের বড় সংকটে পতিত হয়েছে। তাদের দাবি, খালেদা জিয়া এবং বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে সরকার ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এই মামলার রায়ের ক্ষেত্রে আদালতকে ব্যবহার করেছে। ওই ঘটনার পর থেকে বিএনপি নির্বাচনের ব্যাপারে যে আগ্রহপূর্ণ ও ইতিবাচক মনোভাবের মধ্যে ছিল- তা থেকে ১৮০ ডিগ্রি সরে গেছে বলে মনে করছেন অনেকে।

এর মধ্য দিয়ে মূলত ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে গেছে বহুগুণ। এমনকি দুই জোটের মধ্যে আলোচনা-সংলাপ-সমঝোতার পথও দেখছেন না অনেকে।

দুই প্রধান দলের নেতাদের মুখেও কোনো ধরনের নমনীয়তা বা সমঝোতার সুর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নির্বাচনকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোনো আলো দেখতে পাচ্ছেন না।

এদিকে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপিকে বড় ধরনের কোনো সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না সরকার। সহিংসতার আশঙ্কা, নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে প্রকাশ্যে ছোট-বড় কোনো জমায়েতই করতে দেওয়া হচ্ছে না দলটিকে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এরই মধ্যে বিএনপিকে নসিহত করেছেন, ঘরের ভেতরেই সব সভা-সমাবেশ করার জন্য। অবশ্য এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচিত হয়েছেন তিনি। বিএনপির সভা-সমাবেশ অনুমতি না দেওয়া, অনুমতি দিলেও সেখানে অনাবশ্যক পুলিশি হামলা, গ্রেপ্তার, নির্বিঘ্নে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি করতে না দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন বিদেশি ক‚টনীতিকও সরকারের বিভিন্ন মহলে এবং গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

সরকার অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়- বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা তোফায়েল আহমেদের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বৃহস্পতিবার বলেছেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের শর্তগুলো কেবল ভোটের দিন পালন করলে হয় না। এটা সবসময় কার্যকর থাকতে হয়। সবাই যেন সভা-সমাবেশ করতে পারে, নির্বিঘ্নে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে সেটাও নিশ্চিত করতে হয় সব সময়।

বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমাদের বিরুদ্ধে এখন ৭৮ হাজারের মতো মামলা রয়েছে। এক মাস আগে পর্যন্ত হিসাব নিয়েছি ১৮ লাখের উপরে বিএনপি নেতাকর্মী জেলে আছেন। কারাগারগুলো ভরে গেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের ভিড়ে। তারা যদি বাইরে থাকে, মাঠে থাকে, জনগণের সঙ্গে থাকে তাহলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো আশা নেই।

তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে ‘যেনতেনভাবে জোর করে ক্ষমতা দখলের’ জন্য বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

এদিকে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঠিকানা জেলই হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। কয়েকটি তথ্য উল্লেখ করে গত শুক্রবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) জয় তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে বলেছেন, ‘বিএনপি শুধুই একটি অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের দল। হত্যার রাজনীতিতেই তাদের বিশ্বাস। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেই তারা হামলা চালায় সংখ্যালঘুদের ওপর। ক্ষমতায় থাকাকালীন তারা আমাদের সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, সাবেক মন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ অসংখ্য নেতাকর্মীদের হত্যা করে। তারা আমার মাকে ২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা করে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাদের অগ্নিসন্ত্রাসের আগুনে পুড়ে মারা যান শত শত নিরীহ জনসাধারণ ও আহত হন আরও হাজার হাজার মানুষ। আর আমাকেও যুক্তরাষ্ট্রে হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়। এই ঘটনাগুলো অন্য যেকোনো দেশে ঘটলে এতদিনে অবশ্যই সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তারা নিষিদ্ধ হতেন। জেলই তাদের সবার ঠিকানা হওয়া উচিত।’

একদিকে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে। সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার শরিকরা। অপরদিকে খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচনী মাঠে নামতেই পারছে না বিএনপি। কারণ ইতোমধ্যে তারা পষ্ট বলে দিয়েছে খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না।

এরই মধ্যে জাতিসংঘ, ইইউ, ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নরওয়ে, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ আগামী নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক’ দেখতে চায় বলে জানিয়েছে। আওয়ামী লীগের তরফ থেকেও বারবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হচ্ছে। সাংবিধানিক নিয়মে যথাসময়ে নির্বাচন হবে এবং সে নির্বাচনে যদি কোনো দল অংশ না নেয়, তার দায় সরকার নেবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দু-দল বা জোটের মধ্যে এ দূরত্ব বিদ্যমান থাকলে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে পরিবেশ কোন দিকে মোড় নেবে- সেটা অনেকটা আঁচ করা যাচ্ছে। দুই বড় রাজনৈতিক জোটের মধ্যে সমঝোতা না হলে আগামী নির্বাচনও গত ২০১৪-এর নির্বাচনের মতো একতরফা ও বিতর্কিত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই বলে মনে করছেন সবাই।

Top