আজ : মঙ্গলবার, ১৪ই আগস্ট, ২০১৮ ইং | ৩০শে শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কয়লা লুট কেলেঙ্কারি: শুধু কি কর্মকর্তারাই দায়ী?


বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা সোনার মান বদলের কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছে গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে। এ নিয়ে যখন গণমাধ্যমের খবরে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড়, তখনই ফাঁস হলো বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির প্রায় দেড় লাখ টন কয়লা গায়েব কেলেঙ্কারি। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০৮ কোটি টাকা লুট হয়েছিল। এ ছাড়া সোনালী, বেসিক, জনতা, কৃষি ও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর লাখ লাখ কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির আড়ালে লুট হয়েছে। এবার সেই লুটের তালিকায় যুক্ত হয়েছে কয়লা। তবে কয়লা লুটের কারণে প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। কয়লা সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে বড়পুকুরিয়ায় দেশের একমাত্র তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। এতে দিনাজপুরসহ রংপুরের ৮ জেলায় ঘন ঘন লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। বিদ্যুতের ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জাতীয় গ্রিডেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র বলছে, দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কোল ইয়ার্ড থেকে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন কয়লা পাচার হয়েছে। তবে খনি থেকে ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা লুট কেলেঙ্কারির তথ্য স্বীকার করছে পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষ। দুদকের প্রাথমিক তদন্তেও কয়লা লুটের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। খনির কর্মকর্তারাও কয়লা গায়েবের কথা স্বীকার করেছেন। যদিও দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হওয়া কয়লা খনি এমডির দাবি, ‘কয়লা বাতাসে উড়ে ও বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে গেছে’। সদ্য সাবেক এমডির এ বক্তব্যের সাথে কেউ-ই একমত নন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেড় থেকে তিন লাখ মেট্রিক টন কয়লা বাতাসে উড়ে বা পানিতে ধুয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এমডির এ বক্তব্যেই দুর্নীতির প্রমাণ মিলে। এদিকে, কয়লা কেলেঙ্কারির ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে পেট্রোবাংলার গঠিত তদন্ত কমিটি- খনির সাবেক চারজন এমডিকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি তদন্ত শুরু করেছে। দুদকের গঠিত তদন্ত কমিটিও মাঠে নেমেছে। সেই সাথে দুর্নীতি আইনে কয়লা খনির ১৯ জন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই ১৯ জনসহ ২১ জন কর্মকর্তাকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দুদক। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সব তদন্তে প্রাথমিকভাবে খনির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়েছে। তবে কয়লা কেলেঙ্কারিতে শুধু কি কর্মকর্তারাই দায়ী? নাকি এর সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে? সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, শুধু কর্মকর্তারা কয়লা পাচার বা গায়েব করতে পারেননি। তাদের পক্ষে এটা সম্ভবও নয়। কারণ, কয়লা পকেটে করে পাচার করা যায় না। আর কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে কয়লা বাহিরে নিয়ে খেয়ে ফেলারও বিষয় নয়। এর সঙ্গে মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট জড়িত।

সূত্রমতে, প্রায় তিন লাখ টন কয়লা পাচারে স্থানীয় একজন প্রভাবশালী এমপি ও তার পরিবারের সদস্যরা সরাসরি জড়িত, যা একাধিক জাতীয় দৈনিকে এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি শুধু এমপি নন, মন্ত্রীও। দিনাজপুরের সব কিছুই ওই মন্ত্রী পরিবারের নিয়ন্ত্রণে চলে। বিপুল পরিমাণের কয়লা পাচারও হয়েছে তাদের মাধ্যমে। বিষয়টি দিনাজপুরজুড়ে সবার জানা। কিন্তু ভয়ে কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। তারা আশা করছেন, দুদক ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্তে কয়লা পাচারের সঙ্গে জড়িত সবার মুখোশ উম্মোচন হবে। পাশাপাশি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাসহ কয়লা লুটে জড়িত রাজনৈতিক গডফাদার ও ব্যবসায়ী নামের লুটেরাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন দিনাজপুরবাসীসহ দেশের সচেতন সমাজ।
যেভাবে ফাঁস হলো কয়লা কেলেঙ্কারি

১৭ জুলাই, মঙ্গলবার। নিজের মেয়েকে রিসিভ করতে শাহজালাল বিমানবন্দরে যান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. খালিদ মাহমুদ। সেখানে তার কাছে মোবাইলে একটি কল আসে। কলটি করেন পিডিবির সদস্য (জেনারেশন)। চেয়ারম্যানকে তিনি জানান, বড় পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কারণ, কয়লা সংকট। বাকি যে দু’টি ইউনিট আছে তাও ২৫ জুলাই বন্ধ হয়ে যাবে। এ কথা শুনে আকাশ থেকে পড়েন পিডিবি চেয়ারম্যান। অথচ খনি কর্তৃপক্ষই সম্প্রতি নিশ্চিত করে জানিয়েছিল খনিতে যে পরিমাণ কয়লা মজুদ আছে, তা দিয়ে ২০২০ সাল পর্যন্ত চলবে। এর মধ্যে কয়লার কোনো সংকট হবে না। কিন্তু হঠাৎ এখন জানানো হলো, মজুদ যা আছে তাতে দুটো ইউনিট মাত্র এক সপ্তাহ চলবে। এর পরই কয়লা কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হয়।

বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মে মাসে খনি শ্রমিকরা ধর্মঘটে গেলে বেকায়দায় পড়ে খনির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। কারণ, এতে খনি থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে চলে নানা তৎপরতা। ভেতরে ভেতরে চলে মিটিংয়ের পর মিটিং। কিন্তু উপর লেভেলে কিছুই জানানো হয়নি এ সময়ে। কয়লা পাচারে জড়িত স্থানীয় মন্ত্রী এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন খনির কর্মকর্তারা। কিন্তু পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে এ সময় কয়লা খনির কাছেও আসেননি সুবিধাভোগী প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। আর যে মন্ত্রীর পরিবারের নেতৃত্বে কয়লা পাচার হয়েছে তাদেরকেও বিপদের সময়ে পাশে পাননি কর্মকর্তারা। বিপদের সময়ে সুযোগ বুঝে তারা সম্পর্ক ছিন্ন করেন খনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে। এরই মধ্যে কেটে যায় মে মাস।

এ সময় নিজেদের দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, যন্ত্রপাতি স্থানান্তর করতে জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে খনির উৎপাদন কিছুদিন বন্ধ থাকবে। তবে যথেষ্ট মজুদ আছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত কয়লা সরবরাহে কোনো ঘাটতি হবে না। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মতো কয়লা সরবরাহ করতে না পারায় জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ করে দিতে হয়। এর পরই পিডিবি চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছে আসল তথ্য।

সূত্র বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের তথ্যের ভিত্তিতে কয়লার মজুদ তদন্ত করা হয় জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। তখনই কর্তৃপক্ষ টের পান কয়লার প্রয়োজনীয় মজুদ দুর্নীতির মাধ্যমে গায়েব করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করা বিতর্কিত সেই তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, ২০০৫ সাল থেকে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উৎপাদন এবং সরবরাহের হিসাবের মধ্যে বিস্তর ফারাক। কাগজে কলমে এই ফারাক ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ টন। ১৩ বছর ধরে খনি থেকে এই কয়লা পাচার হয়েছে। যা এক ধরনের আজগুবি গল্প ছাড়া কিছুই নয়। ১৩ বছর ধরে কয়লা পাচার হচ্ছে, আর ধরা পড়ল ১৩ বছর পর এটা আদৌ সম্ভব? এর মধ্যে অনেক অফিসার আসছেন-গেছেন। কারো চোখেই ধরা পড়লো না- এই পাচারের ঘটনা? নিয়ম অনুযায়ী খনির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কয়লা মজুদের ব্যাপারে নিয়মিত পাকাপাকিভাবে রেজিস্ট্রার মেইনটেইন করেন। কত কয়লা উৎপাদিত হচ্ছে, কতটা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ হচ্ছে, কতটুকু বেসরকারি পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে- এর পুক্সক্ষানুপুঙ্খ হিসাব রাখা হয় খাতায়। ইতিপূর্বে যারা কর্মরত ছিলেন তাদের কাছ থেকে পরের কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেয়ার সময় বাস্তব মজুদের সঙ্গে খাতাপত্রের এসব হিসাব-নিকাশ পুক্সক্ষানুপুঙ্খভাবে মিলিয়ে নেননিÑ এটা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? বস্তুত, কয়লা পাচার ও লুটপাটের ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য তদন্তের নামে এসব কল্পকাহিনী তৈরি করা হয়েছেÑ মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি মাঠে

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কোল ইয়ার্ড থেকে প্রায় ২৩০ কোটি টাকার কয়লা কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় হয় সরকারের উচ্চ মহলে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত হয় উচ্চ পর্যায়ের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। তাদের কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন-ডিজি) খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- যুগ্ম সচিব (জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ) নাজমুল হক ও পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) মোঃ কামরুজ্জামান।

গত ২ আগস্ট দুপুরে তারা খনি এলাকা পরিদর্শনে যান। তদন্ত কমিটির সদস্যরা রাতে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে অবস্থান করেন। পরের দিন ফেরেন ঢাকায়। তবে এ নিয়ে তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

এর আগে গত ১৯ জুলাই পেট্রোবাংলা কর্তৃক পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) মো. কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি গত ২৫ জুলাই খনির সাবেক চার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন জমা দেন। অভিযুক্তরা হলেন- যথাক্রমে মোঃ কামরুজ্জামান, মোঃ আমিনুজ্জামান, এসএম নুরুল আওরঙ্গজেব ও সদ্য সাবেক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমদ। এর পরের দিন ২৬ জুলাই রাতে কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাবিব উদ্দিন আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘খনির বর্তমান (বরখাস্ত হওয়া এমডি) ও সাবেক সব ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।’ এর আগে গত ১৯ জুলাই হাবিব উদ্দিন আহমেদকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পেট্রোবাংলায় সংযুক্ত করা হয়েছিল।
এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঢাকা’র উপপরিচালক শামসুল আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও বিষয়টি তদন্ত করছে এবং তারা খনি এলাকাকে সার্বক্ষণিক নজরদারীতে রেখেছেন বলে খবর প্রকাশ হয়েছে।

মামলা ও কর্মকর্তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

গত ২৪ জুলাই রাতে খনির সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদসহ ১৯ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পার্বতীপুর মডেল থানায় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আনিছুর রহমান বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের ৫(২) এবং ৪০৯ ধারায় এ মামলা হয়। পার্বতীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে- ২০০৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন কয়লা ঘাটতি বা চুরি হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ২৩০ কোটি টাকা। যেহেতু মামলাটি দুদকের তফশীলভুক্ত। তাই পুলিশ মামলার নথিপত্র দুদকের কাছে হস্তান্তর করেছে। মামলাটির তদন্ত চলছে। যার প্রেক্ষিতে খনির সাবেক দুই ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুজ্জামান ও আমিনুজ্জামান এবং মামলায় অভিযুক্ত ১৯ কর্মকর্তাসহ ২১ কর্মকর্তাকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দুদক।

মামলার সদ্য বিদায়ী এমডি হাবিব উদ্দিন আহমেদসহ ১৯ আসামি হলেন, সাময়িক বরখাস্তকৃত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুর-উজ-জামান চৌধুরী, উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) একেএম খালেদুল ইসলাম, সদ্যবিদায়ী কোম্পানি সচিব ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবুল কাশেম প্রধানীয়া, ব্যবস্থাপক (এক্সপ্লোরেশন) মোশাররফ হোসেন সরকার, ব্যবস্থাপক (জেনারেল সার্ভিসেস) মাসুদুর রহমান হাওলাদার, ব্যবস্থাপক (প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট) অশোক কুমার হালদার, ব্যবস্থাপক (মেইনটেনেন্স অ্যান্ড অপারেশন) আরিফুর রহমান, ব্যবস্থাপক (ডিজাইন, কন্সট্রাকশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) জাহিদুল ইসলাম, উপ-ব্যবস্থাপক (সেফটি ম্যানেজমেন্ট) একরামুল হক, উপ-ব্যবস্থাপক (কোল হ্যান্ডলিং ম্যানেজমেন্ট) মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, উপ-ব্যবস্থাপক (মেইনটেনেন্স অ্যান্ড অপারেশন) মোর্শেদুজ্জামান, উপ-ব্যবস্থাপক (প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট) হাবিবুর রহমান, উপ-ব্যবস্থাপক (মাইন ডেভেলপমেন্ট) জাহেদুর রহমান, সহকারী ব্যবস্থাপক (ভেল্টিলেশন ম্যানেজমেন্ট) সত্যেন্দ্রনাথ বর্মন, ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) সৈয়দ ইমাম হাসান, উপ-মহাব্যবস্থাপক (মাইন প্লানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) জোবায়ের আলী, প্রাক্তন মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) আব্দুল মান্নান পাটোয়ারী ও মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) গোপাল চন্দ্র সাহা।

তবে খনি দুর্নীতি তদন্তে নাম আসা কয়লা খনির সাবেক এমডি ও বর্তমানে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আওরঙ্গজেবকে ৪২ দিনের হজের ছুটি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলা গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বড়পুকুরিয়ায় কয়লা দুর্নীতিতে প্রতিষ্ঠানটির যে চার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণের কথা উঠে এসেছে- এর মধ্যে আওরঙ্গজেব অন্যতম। খনি দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার একদিন পর তাকে এই ছুটি দেয় পেট্রোবাংলা, যা ব্যাপকভাবে এখন আলোচিত।

পাচার হওয়া কয়লার পরিমাণ ৩ লাখ টন!

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি পরিদর্শনের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ টন কয়লা গায়েব হয়েছে। তবে স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, কয়লা চুরি নয়, পাচার হয়েছে। আর শুধু এই ১ লাখ ৪৪ হাজার টনই নয়, পাচার হওয়া কয়লার পরিমাণ আরও অনেক বেশি। তাদের মতে, এখানে চীনা টেকনিশিয়ানদের উৎপাদিত কয়লারই শুধু হিসাব রাখা হয়। এর বাইরে ডাস্ট কয়লা হিসেবে যে ক্ষুদ্রাকৃতির কয়লা পানি নিষ্কাশন করে তোলা ও মজুত করা হয়- সেগুলোর কোনো হিসাব রাখা হয় না। অথচ সেগুলোও বিক্রি করা হয়। কিন্তু টাকার কোনো হদিস নথিতে থাকে না। মোটামুটি হিসাব ধরা হলেও গায়েব হওয়া কয়লার পরিমাণ ৩ লাখ টনের কম হবে না। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কিছু খুচরা ব্যবসায়ী, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের ঠিকাদার ও স্থানীয় ডাস্ট ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, প্রতি বছর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে ১৬ থেকে ২০ হাজার টন কয়লা উত্তোলিত হয়। গত ৭/৮ বছর ধরে এই কয়লা স্থানীয় ঠিকাদারের মাধ্যমে সংগ্রহ করছে কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ। গোপনে এসব কয়লাও বিক্রি করে দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরীহ ব্যবসায়ীরা বলেছেন, খনির কোল ইয়ার্ড থেকে যে কয়লা পাচার হয়েছে- এর পরিমাণ কমপক্ষে ৩ লাখ টন, যার বাজার মূল্য কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা।

কয়লা কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি নষ্টের চেষ্টা

কয়লা পাচার ও লুটের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি নষ্টের চেষ্টা ছিল খনির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বিষয়টি আগেই টের পান। ফলে পুরো প্ল্যান ভেস্তে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খনির গভীর থেকে কয়লা কনভেয়ার বেল্টের মাধ্যমে চলে যায় বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। সেখানে খনিজ কয়লা জ্বালানি হিসেবে পুড়িয়ে, তিনটি ইউনিটে উৎপাদন হয় ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। খনি থেকে বিদ্যুৎ ইউনিটে যাওয়া কয়লা শতভাগ শুদ্ধ বা পরিশোধিত নয়। সাথে থাকে কিছু ভূগর্ভস্থ আবর্জনা। অভিযোগ আছে, এই সুযোগ নিয়ে খনি থেকে অপ্রত্যাশিত আবর্জনা কনভেয়ার বেল্টের মাধ্যমে ঠেলে দেয়া হয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বিষয়টি আগেভাগে ধরে ফেলায় বিপুল পরিমাণ পাথর ও আবর্জনা বাছাই করে প্রকল্প এলাকায় জমা রাখা হয়। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “কী উদ্দেশ্যে আবর্জনা ও পাথর বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়েছিল- তা পরিষ্কার।”

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, কয়লার সাথে আবর্জনা ও পাথর ঠেলে দেয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি নষ্ট করা। বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হলেই কয়লার ঘাটতির বিষয়টি ফাঁস হতো না। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সতর্কতার কারণে তাদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
গভীর রাত পর্যন্ত পাচার হয় কয়লা

আইন অনুযায়ী, বিকেল ৫টার মধ্যে খনি এলাকার কার্যক্রম শেষ করার কথা। এরপর শ্রমিক-বহিরাগতদের প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। অথচ কয়লা খনির ইয়ার্ডে বিকেল ৫টার পরও ট্রাক প্রবেশ ছিল নিয়মিত ঘটনা। প্রতিদিন ১০০-১৫০ ট্রাক এখান থেকে কয়লা নিয়ে যেত। প্রতিটি ট্রাকে কয়লা থাকত ১০ থেকে ১৫ টন পর্যন্ত। যদিও দাফতরিকভাবে কয়লার হিসাব রাখা হতো প্রতি ট্রাকে পাঁচ-ছয় টনের। অবশিষ্ট কয়লা বিক্রির নামে পাচার হয়েছে। কয়লার এ অবৈধ কারবার চলেছে সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত।

জানা গেছে, বড়পুকুরিয়ার কয়লা পরিবহনে নিয়মিত যারা ট্রাক ভাড়া দেন তাদেরই একজন মো. মতিহার। তার ভাষায়, “কয়লার কি পাখা আছে যে, উড়াল দিয়ে চলে যাবে?” তিনি বলেছেন, “বরাদ্দের চেয়ে বেশি কয়লা পাচার করে বিক্রি করা হয়েছে। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত চলেছে এ কারবার।” বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা রাখার পর অতিরিক্ত কয়লা বাইরে বিক্রির অনুমতি ছিল বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির। সেই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়েছে পাচারকারীরা।

বৈধ দরপত্রের আড়ালে অবৈধ পাচার : বর্ষা মৌসুমে ইটভাটায় কয়লার চাহিদা কমে যায়। তখন খনি থেকে উৎপাদিত কয়লা কোল ইয়ার্ডে জমিয়ে রাখে কর্তৃপক্ষ। পরে চাহিদা বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা রেখে বাকিটা দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করার কথা। প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে ১০০ টন করে কয়লা দেয়ার বিধান রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা ও শ্রমিক জানান, বাস্তবে একেকজন ঠিকাদারের কাছে হাজার হাজার টন কয়লা বিক্রি করা হয়েছে। বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে না গিয়ে ভাগা-ভাগি হতো রাজনৈতিক গডফাদার ও কর্মকর্তাদের মধ্যে। মনিরুল ইসলাম নামে একজন লোড-আনলোড শ্রমিক বলেন, প্রতিদিন কাগজে-কলমে যে পরিমাণ কয়লা বিক্রি হতো, বাস্তবে তার পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতিটি ট্রাক তার সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতায় কয়লা বোঝাই করে বের হতো। ফলে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার যতটুকু কয়লা পেয়েছেন, নিয়ে গেছেন তার দ্বিগুণ বা তারও বেশি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, খনিতে উৎপাদন বন্ধের পরও বেসরকারি খাতে কয়লা বিক্রি হয়েছে। তবে এসময় ট্রাকের সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। কয়লার ইয়ার্ডে নিয়মিত ট্রাকের আসা-যাওয়া দেখেছেন শাহা গ্রামের বাসিন্দা ও খনি শ্রমিক ওবায়েদুল ইসলাম। কয়লা নিতে আসা ট্রাক লোড-আনলোডও করেছেন তিনি। এ খনি শ্রমিক জানান, খনিতে উৎপাদন বন্ধের পরও ইয়ার্ড থেকে কয়লা বিক্রি হয়েছে। এমনকি গত ঈদের পরও যে কয়লা বিক্রি হয়েছে, তা তিনি শ্রমিক হিসেবে লোড করেছেন। যদিও বিপিডিবির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, জ্বালানি হিসেবে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুতের জন্য তিন মাসের কয়লা মজুদ রাখার দায়িত্ব খনি কর্তৃপক্ষের। গত ১৩ মে থেকে খনিতে কয়লা উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। নতুন কূপ খনন ও উত্তোলন শুরু হতে সাধারণত তিন মাস সময় লাগে। সে হিসাবে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত কয়লা মজুদ রাখার কথা ছিল। শুধু এই আগস্ট পর্যন্তই নয়, খনি কর্তৃপক্ষ পিউবিকে এই মর্মে নিশ্চিত করেছিল যে, ২০২০ সাল পর্যন্ত কয়লার সংকট হবে না।

ব্যবসায়ীদের গুদামে কয়লা : ১৭ একর জায়গাজুড়ে পুরো ইয়ার্ডটি শূন্য পড়ে আছে এখন। অথচ দুই মাস আগেও খনির পাশ দিয়ে যাওয়া চৌহাটি রাস্তা থেকে উঁচু দেয়ালের ওপাশে কয়লার বিশাল স্তূপ দেখা যেত। বলছিলেন চৌহাটি গ্রামের বাসিন্দা দুলু মিয়া। তার ভাষায়, “রোজার মধ্যেও রাস্তায় দাঁড়ালে কয়লার স্তূপ দেখা যেত। এখন পুরো খনি খালি।” খনি এলাকা শূন্য হলেও কয়লার মজুদ দেখা যায় আশপাশের ব্যবসায়ীদের গুদামে। ইয়ার্ডের কয়েক গুণ কয়লা রয়েছে এসব গুদামে। নানা নামে কয়লা নিয়ে মজুদ করে রেখেছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে শ্যামলী আবাসিক হোটেল ও হ্যাচারির নামে বিপুল পরিমাণ কয়লা নিয়ে মজুদ করেন একজন। পাশেই রয়েছে সুমাইয়া ট্রেডার্স নামে অন্য এক ব্যবসায়ীর দুটি বিশালাকৃতির গুদাম। এর বাইরে বাউন্ডারিঘেরা কয়লার ছোট ছোট স্তূপ তো রয়েছেই।

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ঈদের ছুটি বাতিল

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঈদ-উল-আযহার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। গত ২৭ জুলাই বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানসহ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল ছুটি বাতিলের এ নির্দেশ দেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন- পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ, পিডিবি চেয়াম্যান খালিদ মাহমুদ, বিদ্যুৎ সচিব আহমেদ কায়কাউম, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।

কয়লা লুটে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ। একই সঙ্গে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই কয়লা উত্তোলন শুরু হবে বলে তিনি জানান। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেছেন, “অবশ্যই অভিযুক্ত যারা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এটাকে হালকাভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। আমরা চাচ্ছি, যত তাড়াতাড়ি কয়লা উৎপাদনে যেতে পারি। চাইনিজ কন্ট্রাক্টর যারা, তাদেরকে বলেছি, সময়টাকে কমিয়ে আনতে। তারা আমাদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। আমরা বিশেষ করে আমাদের এখানে লোকাল যারা শ্রমিক আছে, তাদের কাছেও কৃতজ্ঞ। যারা ছুটিতে ছিলো, এখানে আমার সঙ্গে শ্রমিক নেতাদেরও কথা হয়েছে। তারা সবাই এখন কাজ করছেন। তারা ছুটিও নিচ্ছেন না। আমরা আশা করছি, সেপ্টেম্বরের দুই/তিন তারিখের মধ্যেই কয়লা উৎপাদনে যেতে পারব।” এ সময় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেছেন, “কয়লার যে স্টকটা থাকার কথা ছিল, সেটা নেই। লোপাট হয়েছে। আমরা থানায় মামলা করেছি। আমরা মনে করি, এটা একটা সিকিউরড এনভাইরনমেন্ট। এখানে বাইরের লোক ঢুকতে পারে না। যদি কিছু নাই থেকে থাকে, তাহলে এর দায়দায়িত্ব কোল মাইনে যারা আছে, অবশ্যই তাদের।”

এদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির সবাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, “যখন কেউই কয়লার হিসাব রাখেনি, তখন সবাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।”

নীতিমালা ছাড়াই ভারত থেকে কয়লা আমদানির উদ্যোগ

দেশের পাঁচটি খনিতে কয়লা মজুদ আছে ৭৯৫ কোটি মেট্রিক টন। এ কয়লা মজুদ রেখেই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার জন্য ভারত থেকে কয়লা আমদানির কথা ভাবছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কারণ, বড়পুকুরিয়া কয়লা দুর্নীতি জ্বালানি নিরাপত্তাকে চরম হুমকিতে ফেলেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত থেকে কয়লা আমদানির পথে হাটছে কর্তৃপক্ষ। যদিও কয়লা উৎপাদন, ব্যবহার ও আমদানির কোনো নীতিমালাই এখন পর্যন্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ভারতীয় কয়লা ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি বিদ্যুৎ বিভাগও বলে আসছে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির কয়লা চুরির ঘটনায় সৃষ্ট সংকটে এখন সেই কয়লাই আমদানির কথা ভাবছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আমদানির বিষয়টি পর্যালোচনায় ১২ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের দাবি, কয়লার স্পেসিফিকেশন ও দ্রুত আমদানি- এ দুই বিষয় যাচাই করে দেখতে কমিটি করা হয়েছে। ভারতীয় কয়লায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঝুঁকির বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, “কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণই করা হয় কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু ও অ্যাশ কনটেন্ট বিবেচনায় নিয়ে। সাময়িক বিভ্রাটের জন্য নিম্নমানের কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালালে সেটাও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্ষতিকর। যেটা আমরা কখনো করতে পারি না। অন্যদিকে খনি কর্তৃপক্ষ নতুন কয়লা উৎপাদন শুরু করতে যদি বেশি সময় নেয়, সেক্ষেত্রে চাহিদা মেটাতে কয়লা আমদানি করতে হবে।”

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলিত কয়লায় ক্যালোরিফিক ভ্যালু প্রতি কেজিতে ২৫ দশমিক ৬৮ মিলিজুলস বা ৬ হাজার ৭২ কেসিএএল। এতে অ্যাশের পরিমাণ ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। এছাড়া আর্দ্রতা থাকে ১০ ও ফিক্সড কার্বন ৪৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ থাকে ভোলাটাইল ম্যাটার ও দশমিক ৫৩ শতাংশ সালফার। অন্যদিকে ভারতীয় প্রতি কেজি কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু ৪ হাজার ৯৪০ থেকে ৬ হাজার ২০০ কেসিএএল। এ কয়লায় আর্দ্রতার পরিমাণ ১৫-৩৫ শতাংশ। এসব কারণে বড়পুকুরিয়ার ৫২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন যেখানে চার থেকে সাড়ে চার হাজার টন কয়লা পোড়াতে হয়। ভারতের কয়লা ব্যবহার করলে লাগবে এর দেড় থেকে দুই গুণ। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম. তামিম বলেছেন, “ভারতের কয়লায় সালফারের পরিমাণ অতিমাত্রায় বেশি। ওই কয়লা বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হলে বয়লার ও টিউব নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।”

এদিকে, দেশে কয়লার উত্তোলন ও ব্যবহার হলেও এ-সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। কয়লার উৎপাদন, বিপণন, আমদানি ও ব্যবহারে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ২০০৪ সালে। উন্মুক্ত পদ্ধতি, নাকি ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে, সেটিও উল্লেখ থাকার কথা ওই নীতিমালায়। কিন্তু গত ১৩ বছরে ওই নীতিমালা আলোর মুখ দেখেনি।

কয়লা পাচারে কি শুধু কর্মকর্তারাই দায়ী?

‘খনির সবাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত’ বলে শুধু কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে পর্দার অন্তরালের বড় দুর্নীতিবাজ তথা রাঘববোয়াল ও গডফাদারদের রক্ষার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এত বড় ঘটনায় শুধু খনি কর্মকর্তারাই জড়িত নন। যেখানে ব্যাংক লুটসহ বিভিন্ন দুর্নীতিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে, সেখানে কয়লার ক্ষেত্রে শুধু কর্মকর্তারাই দায়ী নয়। এখানেও রাজনৈতিক নেতারা জড়িত। ইতিপূর্বে দিনাজপুর এলাকার ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত, একজন রাজনৈতিক নেতা এবং তার পরিবার কয়লা খনির নানা দুর্নীতিতে জড়িত থাকার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকে। যিনি সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীও। শুধু মন্ত্রী একাই নন, এর সঙ্গে জড়িত তার মেয়ের জামাই, মন্ত্রীর স্ত্রী, ভাইসহ ওই পরিবারের সদস্যরা। ওই পরিবারের লোকজন মূলত দিনাজপুরকে কব্জা করে রেখেছেন। ওই মন্ত্রীর মেয়ে জামাই কয়লা খনিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক নিয়োগে জড়িত থাকার বিষয়টিও সুনির্দিষ্টভাবে একাধিক জাতীয় পত্রিকায় ইতিপূর্বে ছাপা হয়েছে। ওই জামাইয়ের নেতেৃত্বেই বড়পুকুরিয়া খনি থেকে আড়াই লাখ টন কয়লা পাচার হয়েছে। এটা একদিনে হয়নি। দিনের পর দিন এই পাচার কার্যক্রম চলেছে প্রকাশ্যেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা বলছেন, গায়েব হওয়া কয়লার উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতে পাচার হয়ে গেছে। যা হয়েছে দিনাজপুরের গডফাদার হিসেবে পরিচিত ওই মন্ত্রীর মেয়ে জামাইয়ের মাধ্যমে। এই সুযোগে খনি কর্মকর্তারা নিজেকের পকেট ভারী করতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজোশ করে কালোবাজারেও বিক্রি করেছেন কয়লা। সব মিলিয়ে অন্তত তিন লাখ টন কয়লা পাচার হয়েছে খনি থেকে।

পাচারের তথ্যের খোঁজে দুদক

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দিনাজপুরের উপপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘‘এটা স্পষ্ট যে, ১ লাখ ৪৪ হাজার টনের বেশি কয়লা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অবাক ব্যাপার হলো, কয়লা রাখা হতো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) অফিসের পাশেই। আমরা ২৩ জুলাই সরেজমিন গিয়ে দেখেছি, কোল ইয়ার্ডে মাত্র এক-দেড় হাজার মেট্রিক টন কয়লা আছে। কিন্তু থাকার কথা ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক। অর্থাৎ ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লার কোনো হদিস নেই।” গত ১৩ মে থেকে ২৪ দিন খনি শ্রমিকরা ধর্মঘটে থাকায় কয়লা উৎপাদন বন্ধ থাকে। আর তখনই দুর্নীতি ধরা পড়ে। কারণ, প্রতিদিনের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়লার ঘাটতি দেখা দেয়। দুদক কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘‘কাগজপত্র জব্দ করেছি। কাগজে ঠিক থাকলেও বাস্তবে কোল ইয়ার্ডে কয়লা নাই।” খনি কর্মকর্তারা কয়লা না থাকার জন্য সিস্টেম লসের কথা বলছে উল্লেখ করে দুদক কর্মকর্তা বলেন, ‘‘সিস্টেম লসের দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সিস্টেম লসের কারণে ১-২ হাজার টন কয়লার ঘাটতি পড়তে পারে। আমরা এখন কাগজপত্র খতিয়ে দেখছি। দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছি। এখন আমরা বের করার চেষ্টা করব- কীভাবে এই কয়লা পাচার হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত।”

‘দুর্নীতি এখন প্রকাশ্যেই হয়, তাই কয়লা গায়েব’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতি এখন প্রকাশ্যেই হচ্ছে, তাই লাখ লাখ টন কয়লাও হওয়া হয়ে যায়। কয়লাতো পকেটে করে নেয়ার বিষয় নয়, এটা প্রকাশ্যে ট্রাকে করে নিতে হয়েছে। তাও দু-চার ট্রাক নয়, দেড় লাখ টন কয়লা গয়েব করতে হাজার হাজার ট্রাক ব্যবহার হয়েছে। মাসের পর মাস চলেছে এই লুটপাট কা-। তাই প্রশ্ন উঠছে, দুর্নীতি কতটা অপ্রতিরোধ্য হলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে?

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন খান বলেছেন, ‘‘কয়লা কি পকেটে করে নেয়া যায়? এটাতো ট্রাকে করে দিনের পর দিন বাইরে নিতে হয়েছে। সেটা কেউ দেখল না, এটা কি বিশ্বাস করা যায়? আসলে দুর্নীতি এখন প্রকাশ্য বিষয় হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।” তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংকের টাকা লুট হয়, কোনো বিচার হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের সোনার মান বদলে যায় (২২ ক্যারেট থেকে ১৮ ক্যারেট), তার তদন্ত হয় না। কোনো বড় দুর্নীতিবাজ শাস্তি পায় না। কিছু চুনোপুটি ধরা পড়ে মাঝে মধ্যে। এই যদি পরিস্থিতি হয়, তাহলেতো দুর্নীতি অপ্রতিরোধ্য হবেই।”

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘‘এটাই এখন আমাদের দেশে দুর্নীতির স্বাভাবিক চিত্র হয়ে গেছে। এটা ঠিকমত তদন্ত হলে দেখা যাবে, এর সঙ্গে শুধু কর্মকর্তারাই নয়, অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। কারণ এটা প্রকাশ্যে করা হয়েছে এবং বেশ কিছুদিন ধরে করা হয়েছে। মানে দুর্নীতি এখন প্রকাশ্যেই হয়।” টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “দুর্নীতির শাস্তি হয় না। মূল হোতারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকেন। তাই দুর্নীতি কমছে না। দেখা যাবে এই কয়লা দুর্নীতির ঘটনাও কিছুদিন পর হয়তো ধামাচাপা পড়ে যাবে। আর শাস্তি হলেও নিচের দিকের দু’একজনের হবে। তাহলে দুর্নীতি বন্ধ হবে কীভাবে?”

‘ক্ষমতাসীনদের সিগন্যালেই লাখ লাখ টন কয়লা অদৃশ্য’

ক্ষমতাসীন মহলের গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া লাখ লাখ টন কয়লা অদৃশ্য হয়ে যায়নি বলে মনে করে বিএনপি। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, “ক্ষমতাসীনদের মুখে উন্নয়নের জোয়ার আর কাজে দুর্নীতির পাহাড়। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে এত বিশাল পরিমাণ কয়লা লুটপাটের পর দুদক তদন্ত শুরু করেছে। ‘যেন রোগী মরিবার পর ডাক্তার আসিলেন’।” দুদককে ‘সরকারের দুর্নীতি ধোয়ার মেশিন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আর বিরোধী দলের জন্য দুদক টর্চারিং মেশি

Top