আজ : সোমবার, ১৬ই জুলাই, ২০১৮ ইং | ১লা শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

এত অস্ত্র গেল কোথায়?


ছিল কামান, বন্দুক ও তলোয়ারসহ অসংখ্য অস্ত্রের সম্ভার। ছিল এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় এবং প্রাচীন অস্ত্রের সমাহার সেখানে। সার্বক্ষণিক সেসব অস্ত্রের পরিচর্যা চলতো। সেসব অস্ত্র দেখভাল করার জন্য বেশ কয়েকজন প্রহরী ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল। কিন্তু এখন আর সেসব অস্ত্রের কিছুই নেই। সে অস্ত্রগুলো আদৌ আছে কি না বা থাকলেও কী অবস্থায় আছে তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। তারা সন্দেহ করছেন, সেসব অস্ত্রের কিছু হয়তো চুরিও হয়ে থাকতে পারে- যেসবের বিশ্ববাজারে আনুমানিক মূল্য হবে শত কোটি টাকারও বেশি।

এই অস্ত্রের সমাহার বা প্রদর্শনী ছিল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে। জাদুঘরের ২৩ নম্বর প্যাভেলিয়নটিতে গেলে দেখা যেত শত শত বছরের পুরানো কামান, বন্দুক, ছোরা, বর্শা, বল্লমসহ নানা রকম অস্ত্র। অনেকেরই শৈশবের স্মৃতি জড়িত এই ২৩ নম্বর গ্যালারিতে, এখন আর সেসব কিছু নেই। অস্থায়ী বা সমসাময়িক সময়ের জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো ওই গ্যালারি। আর সেখানে থাকা অস্ত্রগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আরও অনেক আগেই।

দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে অস্ত্রশস্ত্র গ্যালারির প্রদর্শনী। কবে আবার চালু হতে পারে শতাব্দির অন্যতম ঐতিহ্য এই অস্ত্রশস্ত্র গ্যালারি তা জাদুঘর কর্তৃপক্ষ নিজেও জানে না।

এমনকি ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর হিসাব ও সংরক্ষণ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা নিয়েও শংকায় আছেন স্বয়ং জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যরা।

জাদুঘরের সাথে সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় জাদুঘরে হাজারেরও বেশি অস্ত্রের সংগ্রহ ছিল। এর মধ্যে ১২০টি করে পালাক্রমে প্রদর্শিত হত। ২০১৪ সালে গ্যালারি সংস্কারের কথা বলে এসব সরিয়ে নেওয়া হয়। সে সময় অল্প সময়ের মধ্যে সংস্কার শেষ হলেও অস্ত্রের প্রদর্শনী আর শুরু হয়নি। টানা এক বছর কোনো কারণ ছাড়াই গ্যালারিটি ফাঁকা পড়েছিল।

অস্ত্রশস্ত্র গ্যালারি বন্ধ আছে ২০১৪ সাল থেকে, কিন্তু ২০১৭ সালের মার্চে উদ্বোধন হওয়া জাদুঘরের ভার্চুয়াল গ্যালারিতে অস্ত্রশস্ত্র গ্যালারি দেখানো হয় এখনো। বাস্তবে এই গ্যালারির কোনো অস্তিস্ব নেই এখন জাতীয় জাদুঘরে।

জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যরা বলেছেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে নিদর্শন চুরির ঘটনা ঘটেছে। এভাবে চলতে থাকলে অতীতের মতো আবারও অপ্রীতিকর ঘটনার আশংকা প্রকাশ করেন তারা।

সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, অস্ত্রের গ্যালারিতে বড় বড় কিছু বাক্স নীল কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, এর ভেতর কিছু অস্ত্র মজুদ করে রাখা হয়েছে। আছে পুরানো প্রদর্শিত কামানও। যার মধ্যে রয়েছে ঈসা খাঁ ও শেরশাহের আমলের কামান।

অভিযোগের তীরে বিদ্ধ মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

যোগাযোগ করলে জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী দাবি করেন, যারা অস্ত্রের গ্যালারি নিয়ে কথা বলছে তারা কেউ কিছু জানে না, বোঝেও না। না বুঝে তারা আবোল-তাবোল কথা বলছে। কম জ্ঞান থাকলে যা হয়!

তিনি দাবি করেন, অস্ত্রের গ্যালারিটি তার মেয়াদকালে সরানো হয়নি। এটি ২০১১ সালের আগে সরানো হয়েছে। তিনি দায়িত্ব নিয়ে এটি খালি পেয়েছেন। খালি একটি গ্যালারি দেখতে অসুন্দর লাগে বলে এটিকে অন্য গ্যালারিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

পুরাতন অস্ত্রগুলোর প্রতি মানুষের আগ্রহের কথা তুলে ধরলে ফয়জুল লতিফ বলেন, আছে তো, কামান আছে তো। কামান তো আর ভেতরে রাখা যায় না। জাদুঘরের বাইরে কামান আছে, দেখতে পারেন।

মহাপরিচালক দাবি করেন, অস্ত্রশস্ত্র গ্যালারি দেখাশোনা করা ও সাজানোর মতো জাদুঘরের কোনো দক্ষ লোকবল নেই। তাই এটি প্রদর্শিত হচ্ছে না। কবে হবে- এ বিষয়েও কোনো সদুত্তর মেলেনি ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর কাছ থেকে।

তিনি বলেন, দক্ষ লোক না থাকলে কিভাবে এগুলো প্রদর্শিত হবে- এটা কেউ বুঝতে চায় না বলে মনে করেন এই আমলা। স্টোরে অস্ত্রশস্ত্রগুলো কিভাবে আছে সে সম্পর্কেও স্পষ্ট কিছু জানাননি জাদুঘরের মহাপরিচালক। ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে অস্ত্রশস্ত্রের প্রদর্শনী সরানো হয়নি বলেও মহাপরিচালকের দাবি।

জাদুঘরের মহাপরিচালকের বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জাদুঘর বিশেষজ্ঞ ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা।

যোগাযোগ করলে জাদুঘরের অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করা ড. ফিরোজ মাহমুদ পাল্টা প্রশ্ন রাখেন- উনি (ফয়জুল লতিফ চৌধুরী) এত বড় মিথ্যা কথা কিভাবে বললেন? তিনি নিজে এসে অস্ত্রের গ্যালারি সরিয়েছেন। এর সকল দায়দায়িত্ব বর্তমান মহাপরিচালকের।

ফিরোজ মাহমুদ অভিযোগ করেন, নিজের স্বার্থেই মহাপরিচালক অস্ত্রশস্ত্রের গ্যালারিটি সরিয়েছেন। তিনি তার মেয়াদকালে সংগৃহীত নিদর্শনের প্রদর্শনী করতে ঐতিহ্য এবং দর্শক নন্দিত অস্ত্র গ্যালারিটি নষ্ট করেছেন। নিজের স্বার্থে মহাপরিচালক অস্ত্রশস্ত্রের প্রদর্শনিটি সরিয়ে এখন মিথ্যা বলছেন বলেও ফিরোজ মাহমুদের অভিযোগ।

এই গবেষক বলেন, অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে যে সমসাময়িক জিনিসের অস্থায়ী প্রদর্শনীর নাম করে এক রকম স্থায়ী প্রদর্শনী করা হয়েছে তাতেও জাদুঘরের নিয়ম-কানুন এবং রীতি মানা হয়নি।

জানতে চাইলে দেশের অন্যতম প্রত্নতত্ত্ব বিশারদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শফি মোস্তাফিজ হতাশা প্রকাশ করে পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, জাতীয় জাদুঘর এখন আর জাদুঘর নেই। এর কোনো মানই এখন আর নেই। যাচ্ছে তাইভাবে জাদুঘর চলছে বলেও এই শিক্ষকের অভিযোগ।

শফি মোস্তাফিজ বলেন, যে অবস্থা তাতে সেখানকার মূল্যবান সামগ্রী, ভাস্কর্য, অস্ত্র খোয়া যাওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ আছে।

অন্যদিকে, জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের বেশিরভাগ সদস্যও বিরক্ত জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডে।

বোর্ড অব ট্রাস্টিজের অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্রশস্ত্র গ্যালারি বন্ধের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বর্তমানে এই গ্যালারিতে সমসাময়িক নিদর্শনের প্রদর্শনী করাটা জাদুঘরের মহাপরিচালকের স্বেচ্ছাচারিতা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, মহাপরিচালক এসব সিদ্ধান্ত একাই নেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর তিনি ট্রাস্ট্রি বোর্ডের মিটিংয়ে উত্থাপন করেন শুধু। অস্ত্র প্রদর্শনী বন্ধ আছে, এই অস্ত্রগুলো কী অবস্থায় আছে, তার কোনো হিসাব রাখা হয়েছে কি না, আমরা এসবের কিছুই জানি না। সেখান থেকে চুরি হচ্ছে কি না তা বলতে পারছি না। তবে যে পরিস্থিতি আছে তাতে অস্ত্রগুলো ঝুঁকিতে।

অতীতেও জাদুঘরে নানা সময়ে চু্রির ঘটনা ঘটেছে। এমনকি জাদুঘরের কর্মচারীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। এই বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি কোনো অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে নেয় তাহলে এর দায় কে নেবে- প্রশ্ন রাখেন নিসার হোসেন।

সুত্রঃ পরিবর্তন

Top