আজ : শুক্রবার, ২০শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং | ৭ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আ’লীগে দ্বন্দ্ব, বিএনপির বাধা জামায়াত মধুর প্রতিশোধ নিতে চায় জাতীয় পার্টি


বিরামপুর, হাকিমপুর, নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট উপজেলা নিয়ে দিনাজপুর-৬ আসনে গত দুই দফায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। জামায়াতেরও শক্ত অবস্থান রয়েছে। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের ভোটে এ আসনে এমপি হন জামায়াতের প্রার্থী। বিএনপি কখনও এ আসনে জিততে পারেনি।

আগামী নির্বাচনে জামায়াত সরাসরি ভোট করতে পারবে না। ফলে জামায়াত প্রার্থী ধানের শীষ নিয়েই ভোটে আগ্রহী। বিদ্যমান বাস্তবতায় জামায়াত এ আসনে বিএনপিকে ছাড় দিতে রাজি নয়। ফলে বিএনপির সামনে বড় বাধা এখন জামায়াত। গত উপজেলা নির্বাচনে চারটির মধ্যে তিনটিতেই জয়লাভ করে বিএনপি প্রার্থীরা। এদিক থেকে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তাদের পথের কাঁটা এখন জামায়াত। এদিকে বিএনপি অনেকটা নীরব থাকলেও এ আসনে নির্বাচনী প্রচার জমে উঠেছে। ঝিমিয়ে পড়া রাজনৈতিক মাঠে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনোনয়ন পেতে মাঠপর্যায়ে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে লবিং করছেন ।

নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে তিনটিতে আওয়ামী লীগ এবং দুটিতে জামায়াত প্রার্থীরা জয়লাভ করেন এ আসনে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মোস্তাফিজুর রহমান ফিজু, ২০০৮ সালে ড. আজিজুল হক চৌধুরী এবং ২০১৪ সালে শিবলী সাদিক এমপি নির্বাচিত হন। শিবলী সাদিক আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী। তিনি ছাড়াও আওয়ামী লীগের আরও অন্তত আটজন মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন। এ নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব রয়েছে দলের মধ্যে। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে নবাগতদের মনোনয়ন দেয়ার পর থেকেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। বর্তমান এমপি শিবলী সাদিকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে তার চাচা দেলোয়ার হোসেনের সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়া নিয়ে অনেকটা বিব্রত শিবলী সাদিক।

১৯৮৬ সাল থেকে টানা ছয়বার মনোনয়ন চেয়ে না পাওয়ার তালিকায় রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলতাফুজ্জামান মিতা। রাজনীতি করার কারণে তিনি একাধিকবার কারাভোগ করেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী হিসেবে পরিচিত বর্ষীয়ান এই নেতা। সাবেক ছাত্রনেতা আলতাফুজ্জামান বর্তমান এমপির বিরুদ্ধাচরণ করে যুগান্তরকে বলেন, তার ভুলের শেষ নেই। এর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদের। তিনি বলেন, এলাকার মানুষ বারবার বঞ্চিত হয়েছে। ফলে দলের হাইকমান্ড পরীক্ষিত সংগঠক হিসেবে আগামী নির্বাচনে আমাকেই মনোনয়ন দেবেন। এলাকাবাসীর প্রতি আমার আস্থা ও বিশ্বাস আছে। মনোনয়ন পেলে নৌকার বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

কথা হয় অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী নবাবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। নবাবগঞ্জের ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বাণিজ্য, ইউপি নির্বাচনে দলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীদের বিজয়ী করার পেছনে তার ভূমিকা ছিল। মনোনয়ন পেলে নৌকার বিজয় নিশ্চিত।

টানা পাঁচবার মনোনয়ন চেয়ে না পাওয়ার তালিকায় রয়েছেন বিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিজানুর রহমান মণ্ডল। প্রবীণ এই রাজনীতিক ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু খুন হওয়ার পর দিনাজপুর সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে ১৯ দিন আটক থাকা অবস্থায় তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে ৯ মাস তাকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। এবারও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, দলের জন্য জীবন উজাড় করে দিলেও বারবার বঞ্চিত হয়েছি। মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমাকে মনোনয়ন দিলে এলাকার মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। বিপুল ভোটে নৌকা জয়ী হবে।

অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী বিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পারভেজ কবির নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। জানতে চাইলে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পারভেজ কবীর বলেন, নবীন হিসেবে শিবলী সাদিককে এলাকার মানুষ অনেক আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে এমপি বানিয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজ দলের নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের লোকদের পুনর্বাসিত করেছেন। তিনি বলেন, মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বিজয়ী হতে চাই।

কথা হয় ২০১৪ সালে মনোনয়নবঞ্চিত এবং ২০০৮ সালের ভোটে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত এমপি ড. আজিজুল হক চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি যুগাান্তরকে বলেন, সে সময় আসনটি আমি মনের মতো সাজিয়েছিলাম। রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো ও ঘরে ঘরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছি। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে জয়লাভের পর এলাকার উন্নয়নে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ব।

দলের মধ্যে প্রার্থীজট এবং অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে বর্তমান এমপি শিবলী সাদিক বলেন, চার উপজেলার সভাপতি ও সম্পাদক মিলে আটজনের মনমানসিকতা আলাদা। এদের মধ্যে দু-একজন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। দলের মধ্যে কোনো রকম দ্বন্দ্ব ও বিভেদ নেই। সমানভাবে চার উপজেলার উন্নয়ন হচ্ছে। আজ সর্বত্র ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। তিনি আবার নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়ে এই এলাকার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে চান। আওয়ামী লীগের অপর মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বিরামপুরের সাবেক পৌর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আক্কাস আলী, নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়পুর ইউপি চেয়ারম্যান নেতা আইনুল হক চৌধুরী এবং ঘোড়াঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মাকসুদুর রহমান চৌধুরী।

এদিকে আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন- বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও চিকিৎসক নেতা ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং দিনাজপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক লুৎফর রহমান মিন্টু। তবে নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন সুজনও বিএনপি থেকে মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন। তবে নির্বাচন নিয়ে বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে তৎপরতা এখনও সেভাবে শুরু হয়নি। নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে তার ওপর নির্ভর করছে প্রার্থী হওয়া না হওয়া।

বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক লুৎফর রহমান মিন্টু জানান, বিএনপির প্রত্যাশা অনুযায়ী যদি নির্দলীয়, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইব। জেলা বিএনপির সাবেক এ সভাপতি বলেন, দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দিনাজপুর-৩ আসন থেকে মনোনয়ন না নিলে দিনাজপুর-৬ আসনের পাশাপাশি দিনাজপুর-৩ আসনেও আমি মনোনয়ন চাইব।

জাতীয় পার্টির নেতারা বলছেন, ২০০৮ সালে আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কথা রাখেনি আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচনে এর মধুর প্রতিশোধ নিতে চায় জাতীয় পার্টি।

জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি শিবলী সাদিকের চাচা দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি একই বাড়ির বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন। জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ২০০৮ সালে মহাজোট থেকে আমাকে প্রার্থী করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। দিনাজপুর গোর-এ শহীদ ময়দানে আমাকে জোটের প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কথা রাখেননি। এবার জাতীয় পার্টির ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেয়ায় মনোনয়ন পেলে এ আসন থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করব।

জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি ও হাকিমপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আজিজুর রহমানও মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন। ১৯৯১ সালে জামায়াতের প্রার্থী আজিজুর রহমান এককভাবে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। ২০০১ সালেও চারদলীয় জোটের প্রার্থী হয়ে তিনি এমপি হন। আগামী নির্বাচনে জামায়াতের আনোয়ারুল ইসলাম নির্বাচন করতে চান। তলে তলে কাজও শুরু করে দিয়েছেন।

Top