আজ : শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং | ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

এবার আর কাঁদতে বা কাঁদাতেও রাজি না টাইগাররা


ত্রিদেশীয় সিরিজ। শনিবার তার ফাইনাল। মিরপুরে দুপুর ১২টায় শুরু শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। মঞ্চ তৈরি, তৈরি দুই দল- বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। দুই দলের জন্যই ট্রফি জেতার মহারণ। যেখানে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের শেষ বছরের শাপমোচনের চ্যালেঞ্জ। স্বাগতিকদের ধারাবাহিক ব্র্যান্ড ক্রিকেট খেলে যাওয়ার পর প্রাপ্য শিরোপায় চুমু খাওয়ার অপেক্ষা। চ্যালেঞ্জ দুই দলেরই সমান প্রায়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি তিন তিনটি শোকের সাগরে ভাসার গল্প-কষ্ট-দুঃখ ভুলবার মঞ্চও কি নয়?

কতো কতো জয়, উল্লাসে মাতার আনন্দ, চিরদিন গৌরব করার সাফল্যই তো গেল ক’বছরে ধরা দিল বাংলাদেশের ক্রিকেটে। উন্নতির সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে যা এখন শক্ত-মজবুত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দিতে চলেছে লাল-সবুজের দেশকে। তারপরও তো ভুলতে না পারার মতো মতো আক্ষেপ, বেদনার ছোপ ছোপ ক্ষত দাগ কেটে আছে টাইগার ভক্ত-সমর্থকদের মনের গহীন গভীরে। ঘরের মাঠে তিন-তিনটা বড় আসরে শিরোপার মঞ্চ থেকে খালি হাতে ফেরার বিয়োগ-ব্যথা যে কি তা খেলোয়াড় ও ভক্ত মাত্রই জানেন। সময় যখন আরেকটা ফাইনালের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে টাইগারদের, ঠিক তখন সেই ক্ষতের গভীরতার ইতিহাস কি জানি কেন যেন ফিরে ফিরে আসছে বারবার। এই সময়ে। ঠিক শেষ লড়াইটার আগেই। সেটা কষ্ট বাড়ানোর জিঘাংসা নিয়ে নয়, হারানোর বেদনা ও জ্বালা নিবারণের আশার আলো জ্বেলে।

এক…হন্তারক মুরালি

অনেক অনেক ইতিহাসের সাক্ষী মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। হোম অব ক্রিকেটে এই ক’দিন আগে টেস্টে নাস্তানাবুদ হয়ে গেছে স্টিভ স্মিথের অস্ট্রেলিয়া। টেস্ট ঐতিহ্যের ধারক সাদা পোষাকে নতজানু হয়েছে টাইগারদের পদতলে। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ভেুন্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা করা এই স্টেডিয়াম তাই টাইগারদের পয়মন্ত এক ভেন্যু। টাইম মেশিনে চড়ে পিছু পাড়ি জমালে যা একটা ত্রিদেশীয় সিরিজকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ধারাবাহিক উন্নতির বীজ বপন করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটে। ২০০৯ সালের ত্রিদেশীয় সিরিজ। এখনকার মতোই যেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ে।

জিম্বাবুয়ের এই দলটা আর তখনকার দলটার শক্তিতে খুব পার্থক্য ছিল না। কিন্তু সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা শক্তি। কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, মুত্তিয়া মুরালিধরনরা সেই দলে। যে দলটাকেই লিগ ম্যাচে একবার হারিয়ে ফাইনালে উঠে গেল বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হেরে ফাইনালে ওঠাটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল স্বাগতিকদের। ঠিক সেই সময় মোহাম্মদ আশরাফুলের দলটা সমীহ জাগানিয়া দলে পরিণত হয়ে গেল। সেই দলই শিরোপার খুব কাছে চলে যায় ১৬ জানুয়ারির দিনটিতে।

আগের দেখাতেই শ্রীলঙ্কাকে হারানো গেছে। তাই শিরোপা লড়াইয়ের ম্যাচ শুরুর আগে আরেকটা জয়ের আশা বাংলার মানুষের মনে যে ধরা দেয়নি তা নয়। কিন্তু আগে ব্যাট করে ৪৯.৪ ওভারে ১৫২ রানে অল আউট হয় বাংলাদেশ। সনাথ জয়াসুরিয়া, সাঙ্গাকারা, জয়াবর্ধনেকে নিয়ে লঙ্কান টপ অর্ডার। কিন্তু সেই শীর্ষ নেতারাই বাংলাদেশের বোলিংয়ের সামনে ধসে পড়ে। মাত্র ৬ রানে হারিয়ে বসে ৫ উইকেট। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এখনো সুখ-স্বপ্নই মনে হয় অনেকের। তারপরও সেই ম্যাচটা হেরে যায় বাংলাদেশ! আহা! কিংবদন্তি সাঙ্গাকার ৫৯ রানের কাছেই কি সেই হার? পুরোটা না। ম্যাচ না দেখে শুরু স্কোর বোর্ডে চোখ রাখলে হয়তো সেটিই বলবে। আসলে ম্যাচটা বাংলাদেশ হেরে যায় ব্যাটসম্যান মুরালিধরনের কাছে।

ব্যাট হাতে কখনোই যিনি সাবলীল নয়। কোর্টনি ওয়ালশের ব্যাটিংয়ের মতো উপভোগ! ভিন্ন অর্থে। সেই মুরালিধরনই কি না বাংলাদেশের স্বপ্নের হন্তারক! খেলে ফেললেন অপরাজিত ৩৩ রানের ইনিংস। সাঙ্গাকারা ফিরলেও ফারভিজ মাহারুফ (অপরাজিত ৩৮) লড়ছিলেন। শেষে তাকে ছাপিয়ে নায়ক বনে যান মুরালি। ভিলেন রুবেল হোসেন। ১৬ বলে ৩৩ রানের ইনিংসটি খেলেন ২ ছক্কা ও ৪ চারে। ৪৮তম ওভারের শেষ দুই বলে রুবেলকে একটি করে ছক্কা ও চার হাঁকিয়ে ম্যাচ শেষ করে দেন মুরালি। আসলে চির-আক্ষেপে ডুবান টাইগারপ্রেমীদের। যা ভুলবার নয়।

দুই…অশ্রুজলে ভেজা পোস্টার

২০০৯ সাল খুব কাছে গিয়েও স্বপ্নভঙ্গ। এরপর এমন কোনো প্রথম টুর্নামেন্ট শিরোপা জয়ের প্রথম আনন্দে মাতার আরেকটা সুযোগ ধরা দেয় ২০১২ সালে। ২০০৯ এর ত্রিদেশীয় সিরিজে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ছিল টাইগার দর্শকদের। খুব কাছে গিয়ে সব শেষ। কিন্তু ১২’র এশিয়া কাপের এই আসরে আগাম উৎসবই যেন শুরু হয়ে যায় পুরো দেশে। ভারত-শ্রীলঙ্কার মতো দলকে বিদায় করে ফাইনালে পাকিস্তানের সঙ্গী হওয়া মুশফিকুর রহীমের দলের সামর্থ্য নিয়ে যে সন্দিহান ছিল না কট্টর বিরোধীও! যে বাংলাদেশের কাছে শচীন টেন্ডুলকারের শততম সেঞ্চুরি ম্লান হয়ে যায়, পাত্তা পায় না শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানও প্রথম দেখায় জেতে মাত্র ২১ রানে, সেই দল তো শিরোপার দাবি রাখেই।

কিন্তু কে জানতো ২২ মার্চের রাতটি শুধুই অশ্রু বিসর্জনের। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বেদনা ও না পাওয়ার গল্পের! চির বঞ্চনার! আগে ব্যাট করে বাংলাদেশকে ২৩৭ রানের লক্ষ্য দিতে পেরেছিল পাকিস্তান। টেনেটুনে। যে লক্ষ্য তাড়ায় ট্রফিটাকে তো ছুঁয়েই ফেলেছিল টাইগাররা। কিন্তু মাত্র ২ রান। ওই ব্যবধানের দুরত্বে থেকে শেষ করতে হয় বাংলাদেশকে। ৮ উইকেটে ২৩৪ রানে থেমে গেল আগাম উৎসবের সব আয়োজন। জলে ভেজা বাংলাদেশ, দেশের ক্রিকেট। এমনও হয়! আইজাজ চিমার শেষ ওভারে ৯ রানের হিসেব মিলাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ, আব্দুর রাজ্জাক ও শাহাদত হোসেন। রাজ্জাক পঞ্চম বলে বোল্ড হয়ে ফিরলেন। শেষ বলে শাহাদত ব্যাটের অপ্রত্যাশিত খোঁচায় একটা চার উপহার দিলে আনন্দপুরীতে পরিণত হতো দেশ। কিন্তু উল্টো মিরপুরে কবরের নিস্তব্ধতা নেমে আসে পরক্ষণে। স্তব্ধ সমগ্র দেশ। ক্রিকেট বড় বেশি গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা!

অঝোরে সেদিন প্রকাশ্যে মাঠে একে অন্যকে জড়িয়ে কেঁদেছেন টাইগাররা। কাঁদছেন মুশফিকুর রহীম। সাকিব আল হাসান তাকে সান্তনা দেবেন কি? অশ্রু যে তারও থামে না কিছুতে! নাসির হোসেন কাঁদছেন, এনামুল হক বিজয়, কাঁদছে পুরো গ্যালারি। যে সাকিবকে নাকি আবেগ তেম একটা স্পর্শ করে না সেদিনের সেই ছবিটা ইতিহাসের পাতায় এখন অমর অক্ষয়, অব্যয়। সাথে মুশফিক। ওখানেই বহু পরের প্রজন্মও খুব জেনে যাবে সেদিনের উঠতি টাইগারদের সব হারানোর বেদনা।

তিন…বৃষ্টি কাঁদায়

১+১= ২। ৩ এ তো সাফল্য আসেই। প্রবাদ কি আর মিথ্যে হয়? দুইয়ের সেই জ্বালা তিনে জুড়ানোর সুযোগ আসে আরেকটা এশিয়া কাপের মঞ্চে। এই তো সেদিন। ২০১৬ সালের এশিয়া কাপটা হয়ে গেল টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটে। সেবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্ব আসরের ড্রেস রিহার্সেল হিসেবে। এই ঢাকাতেই। যেখানে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে দর্শক করে ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামে বাংলাদেশ। কিন্তু ৬ মার্চের রাতটি চার বছর আগের আরেকটি মার্চের দুঃস্বপ্নের রাতের ক্ষত কিংবা তারও আগের বেদনায় প্রলেপ দেওয়ার মতো কিছু উপহার দিল না যে! এবারও অভাগা বাংলাদেশ, নিজ মাটিতেই। বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচ ৮ উইকেটে জিতে নেয় ভারত। ১৫ ওভারে নেমে আসা ম্যাচ আগে ব্যাট করে ৫ উইকেটে ১২০ রান করে মাশরাফি বিন মুর্তজার বাংলাদেশ। ভারত তা পেরিয়ে যায় ৭ বল হাতে রেখেই। বৃষ্টি কাঁদিয়ে গেল এবার।

চার…?!?!?!

তিনটি তিনটা ক্ষত। এই ক্ষতগুলোর জ্বালা জুড়ানোর নয় কখানোই। কোনোভাবেই না। থাকতে পারে উপষম। আবার উল্টো পিঠে দেখলে টাইগারদের উন্নতির চিহ্নও সেগুলো। কিন্তু সেই চিহ্নগুলোই ক্ষতের নয়, যদি হয় অহংকারের। শিরোপায় চুমু খেয়ে দেশকে উৎসবে মাতানোই যার একমাত্র উপায়। দুই বছর আগের সেই রাতের মতো কে বা চায় আরেকবার তেমন আক্ষেপে পুড়তে? এখন তো বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ের হিসেবে শ্রীলঙ্কার চেয়েও সেরা মাশরাফির বাংলাদেশ। বাংলাদেশর ক্রিকেটের বিগ ফাইভ বলা হয় যাদের সেই তারা- মাশরাফি বিন মুর্তজা, তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহীম, মাহমুদউল্লাহরা সাক্ষী আগের তিন ক্ষতেই। এবার তারা তাতে প্রলেপ দিতে তো চাইবেনই। তাদের নিজেদের জন্য শুধু নয়, এই দেশের ক্রিকেটকে যারা ভালোবাসেন তাদের সবার জন্যই।

যদিও মাশরাফি ফাইনালের আগের দিন শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে সেই তিন বেদনার গল্পের কথা মনে করিয়ে দিতেই কথা বললেন এভাবে, ‘এইটা আসলে আমার মাথায় ছিল না। মনে না করাইলেই পারতেন।…. কালকে সম্পূর্ণ নতুন একটা ম্যাচ। তো আগের ম্যাচগুলো নিয়ে ভাবার দরকার মনে করছি না। তবে হারজিত তো থাকবেই, একদল জিতবে আর একদল হারবে। এটা নিয়ে না ভেবে আমার মনে হয় ইতিবাচক ক্রিকেট খেলা আর প্রথম তিনটা ম্যাচ যেভাবে খেলেছি, গত কালকের ম্যাচেও যে মাইন্ড সেট আপ নিয়ে খেলেছি সেই মাইন্ড সেট আপটুকু থাকুক। হয়তো যেটা প্রত্যাশা ছিল, সেটা হয়তো মাঠে ডেলিভার করতে পারিনি। ওইটা আবার না হলেই হয়।’

বাংলাদেশের ক্রিকেটকে যারা ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন, মাথায় তুলে রাখতে চান, তাদের চাওয়াটাও তো মিলেমিশে একাকার মাশরাফির কথার সাথেই। একই চাওয়া। সর্বশেষ ম্যাচে পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা বাংলাদেশ নয়। প্রথম তিন ম্যাচের দুর্দান্ত বাংলাদেশকে চান ভক্ত-সমর্থকরা। সেই ক্ষমতা ও সামর্থ্য মাশরাফির দলের যে কতোটা আছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার উপায় নেই এতটুকু। তাহলে কি উৎসব? নাহ। এটা ক্রিকেট। উৎসবের অপেক্ষা থাকুক বুকে দুই ফলেরই ভাবনা রেখে। নিজেদের সেরাটা খেলুক টাইগাররা। ওটা পারলেই যে শিরোপাটার উপর টাইগারদের হাত সেটি জয়ের উৎসবে উন্মাতাল হবেই এই সবুজ লোকালয়।

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ...
Top