আজ : শনিবার, ১৬ই ডিসেম্বর ২০১৭ ইং | ২রা পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সৈয়দপুরে যেভাবে পালিত হয় পবিত্র আশুরা


সকল নিউজ আপডেট পেতে পেইজে লাইক দিন

নীলফামারীর সৈয়দপুর অবাঙ্গালি অধ্যুষিত জনপদ হওয়ায় প্রতি বছর অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে এখানে পালিত হয়ে থাকে পবিত্র আশুরার সকল আনুষ্ঠানিকতা। পবিত্র আশুরার দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে শোক ও ত্যাগের দিন হিসাবে পরিচিত হলেও সৈয়দপুরে আশুরা পালনে শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের একটি অংশ আলাদা আলাদাভাবে ভিন্ন আঙ্গিকে তাদের তরিকানুযায়ী পালন করে থাকেন পবিত্র আশুরা।

মহরম মাসের চাঁদ দেখার সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় এর আনুষ্ঠানিকতা। শহরে ৬৪ টির অধিক ইমামবাড়া থাকায় অনেকটা তাজিয়ার শহরে রূপান্তরিত হয় সৈয়দপুর। শহরের মুন্সিপাড়ায় ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে বড় বড় তোরণ। রঙ্গিন কাপড়ে বানানো তোরণের গায়ে জ্বলছে হরেক রং এর বাতি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আলাদাভাবে মহল্লার প্রতিটি ইমামবাড়ায় তাজিয়া বানানো হচ্ছে। রয়েছে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা। একসাথে তালে তালে বাজানো হচ্ছে ঢোল। আর ঢোলের শব্দে রাতের সৈয়দপুরে বিরাজ করছে এক নির্ঘুম আবহ। সুন্নি সম্প্রদায়ের একটি অংশ এভাবে শহরের বিভিন্নস্থানে নির্মাণ করেছে বড় বড় তোরণ। ঈমামবাড়াগুলোতে ইমাম হোসেনের মাজারকে স্মরণ করে তৈরি করা হয়েছে তাজিয়া। সেখানে মানতের পাশাপাশি চলছে ফাতেহা পাঠ।

শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় চলে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা, তলোয়ার ও আগুনের বিভিন্ন ধরনের খেলা। একই সঙ্গে মুখে উচ্চারিত হয় ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন’। কেউবা অঝোর নয়নে কাঁদেন আর ইমাম হোসেনের মৃত্যুর স্মরণে মাতম গীত গাইতে থাকেন। প্রতি ইমামবাড়ায় সারারাত ঢোল বাজনা, তাজিয়া মিছিল, লাঠি খেলা, ইমাম হোসেনের ঘোড়ার প্রতিকৃতি হিসাবে মানত করে পাইক বাধা, ইমামবাড়ায় ফাতেহা পাঠ, নিশান চড়ানো হয়ে থাকে। আরবি ৭ তারিখের রাত ১১ টার দিকে ইমামবাড়ায় বসানো হয় তাজিয়া এবং মহরম মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত দলবেঁধে প্রত্যেক ইমামবাড়ায় ইয়া হোসাইন ইয়া হোসাইন বলে কাসিদা পাঠ করেন।

সৈয়দপুর হাতিখানায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় প্রতীকী কারবালার আয়োজক কমিটির সদস্য জাভেদ জানান, মহরমের ৭ তারিখে কারবালা থেকে কিছু মাটি শহরের প্রতিটি ইমামবাড়ায় নিয়ে যান সেখানকার খলিফারা। বিশেষ নিয়ম অনুযায়ী সে মাটি একটি পাত্রে করে তাজিয়ার নিচে সংরক্ষিত রাখা হয়। এরপর তাজিয়াকে কেন্দ্র করে চলে অন্যান্য রীতিনীতি পালন।
তিনি আরও জানান, শহর জুড়েই দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। তারা দেখতে আসেন, দোয়া পড়েন, ভক্তি করেন। মহরমের ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরার দিন মাটি যেখান থেকে আনা হয়েছিল সেখানেই রেখে আসা হয়। সে মাটি রাখার জন্যও যেতে হয় শোকাবহ মিছিল সহকারে। কারও কারও শরীর রঙিন রশি, জরির ফিতা এবং ছোট ছোট ঘুণ্টির মালা দিয়ে পেঁচানো। প্রত্যেকের মাথা সাদা ও সবুজ কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঢাকা। হাতে লাল সবুজ আর সাদা রংয়ের পতাকা। হাজার হাজার লোকের মিছিলে সৈয়দপুর শহরে তিল ধরনের জায়গা থাকে না। পরে মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হয় সুন্নি সম্প্রদায়ের একটি অংশের এ আনুষ্ঠানিকতা।
আশুরা উপলক্ষে এদিকে শিয়া সম্প্রদায় সৈয়দপুরে তাদের মার্কাজ পার্বতীপুর রোডে অবস্থিত শিয়া মসজিদ থেকে বের করে থাকে শোক শোভাযাত্রা। মাতম করে হায় হুসাইন হায় হুসাইন বলে তাদের এই শোক মিছিলে অংশগ্রহণ করেন সৈয়দপুরের বিভিন্ন শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজ সহ নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুরের শিয়া সম্প্রদায় লোকেরা। শোক মিছিলে নওহা, কাসিদা, মর্সিয়া, শোকগাথা ও ইমাম হোসাইনের জীবনী পাঠসহ এসময় কালেমা খচিত বিভিন্ন পতাকা বহন করে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা।

Top