ইন্টারনেটের সেই ‘সোনালি যুগ’-এর শেষ অধ্যায় যেন এবার আনুষ্ঠানিকভাবেই শুরু হলো। গুগল সম্প্রতি তাদের সার্চ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে বুঝিয়ে দিল—পুরনো ইন্টারনেট আর আগের জায়গায় নেই। একসময় যেখানে সার্চ মানেই ছিল নীল রঙের লিংকে ভরা একটি তালিকা, এখন সেখানে জায়গা নিচ্ছে সরাসরি এআই-ভিত্তিক উত্তর।
গুগল নিজেই বলছে, গত ২৫ বছরের মধ্যে এটি তাদের সার্চ বক্সের সবচেয়ে বড় আপডেট। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রচলিত সার্চ মডেলকে আর ভবিষ্যতের জন্য যথেষ্ট মনে করছে না প্রতিষ্ঠানটি। এখন ব্যবহারকারীদের ওয়েবসাইটে পাঠানোর বদলে সার্চ ফলাফলের মধ্যেই উত্তর দেওয়ার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, এসইও-নির্ভর ব্যবসা, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এবং রিভিউভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলোর ওপর। কারণ নতুন এই ব্যবস্থায় মানুষ আগের মতো বিভিন্ন সাইটে ক্লিক না করে সরাসরি উত্তর পাচ্ছে গুগল থেকেই।
একসময় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানুষ ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে দেখত। কিন্তু গত এক দশকে সেই বিশ্বাসে বড় ধস নেমেছে। গ্যালাপের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৪ শতাংশ আমেরিকান এখন বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর “অনেক” বা “যথেষ্ট” আস্থা রাখেন। ২০২০ সালে যা ছিল ৩২ শতাংশ।
অন্যদিকে, পিউ রিসার্চের তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে যেখানে ৭১ শতাংশ আমেরিকান মনে করতেন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের জন্য ইতিবাচক, ২০১৯ সালে তা নেমে আসে ৫০ শতাংশে। অথচ ২০১০ সালের এক জরিপে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানের তালিকায়, ছোট ব্যবসার সমপর্যায়ে।
ব্যবহারকারীদের এই ক্লান্তি ও অসন্তোষের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোও নিজেদের বদলে ফেলছে। ইউটিউব ও টিকটকের জনপ্রিয়তা অন্য প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করেছে এমন অ্যালগরিদমভিত্তিক কনটেন্ট দেখাতে, যা ব্যবহারকারী কী দেখতে চান—তা অনুমান করে পরিবেশন করা হয়। ফলে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা এক্সে এখন আগের মতো শুধু ফলো করা অ্যাকাউন্টের পোস্ট দেখা যায় না।
ডেটিং অ্যাপগুলোর প্রতিও তরুণদের আগ্রহ কমছে। বিশেষ করে জেন জি ব্যবহারকারীদের মধ্যে “সোয়াইপ কালচার” নিয়ে এক ধরনের বিরক্তি তৈরি হয়েছে। এ কারণেই বাম্বল তাদের অ্যাপ থেকে সোয়াইপ ফিচার সরিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা আনার পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও হুইটনি উলফ হার্ড।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—যেসব প্রতিষ্ঠান একসময় ইন্টারনেটের বর্তমান রূপ তৈরি করেছিল, তারাই এখন সেটিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কারণ এআই যুগে টিকে থাকতে হলে নিজেদেরই নিজেদের পুরনো মডেল ভাঙতে হচ্ছে।
গুগল ও মেটার মতো কোম্পানিগুলো তাদের জনপ্রিয় পণ্যে দ্রুত এআই যুক্ত করছে। অথচ এই পরিবর্তনের পর ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক মডেল ঠিক কী হবে, সেটি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যত দ্রুত এআইয়ের দিকে এগোচ্ছে, সাধারণ মানুষের সংশয়ও ততটাই বাড়ছে।